• 04 Feb, 2026

নড়াইল-২ আসনে বিদ্রোহ ঠেকাতে গিয়ে বিএনপির ভিত নড়ছে?

নড়াইল-২ আসনে বিদ্রোহ ঠেকাতে গিয়ে বিএনপির ভিত নড়ছে?

নড়াইলকণ্ঠ নিজস্ব প্রতিবেদক: দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী ও তার সমর্থকদের বহিষ্কার- নির্বাচনী রাজনীতিতে এটিই কি দলের ভিত্তি দুর্বল করার সূত্রপাত?

৯৪ নড়াইল-২ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৬ (ছয়) শীর্ষ স্থানীয় নেতা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সম্প্রতি বহিষ্কৃত হয়েছেন। তাঁদের “অপরাধ” ছিল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মনিরুল ইসলামকে সমর্থন দেওয়া। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকালে ঐতিহ্যবাহী লোহাগড়া মোল্যার মাঠে ওই স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বহিষ্কৃত নেতৃবৃন্দ এক গণসমাবেশ ও মিছিলের আয়োজন করেন। সমাবেশে বক্তারা ঘোষণা দেন, দল থেকে বহিষ্কার করার জবাব তারা ব্যালটের মাধ্যমে দেবেন- মনিরুল ইসলামের প্রতীক “কলস” মার্কায় বিজয়ী হয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাবেন। বিশাল মিছিলসহ এই প্রদর্শন শক্তি ইঙ্গিত দেয় যে স্থানীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী-সমর্থক এখন কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন।

স্থানীয় দ্বন্দ্বে সংগঠনে ভাঙন
নড়াইলের এই ঘটনায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে উপজেলা ও পৌর শাখার সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বহিষ্কৃত হওয়ায় এলাকার বিএনপি সংগঠনটি কার্যত দ্বিখন্ডি। যাঁরা তৃণমূলে দলের জন্য কাজ করতেন, সেই নেতারাই এখন দলের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে স্বতন্ত্র প্রচারণায় নেমেছেন। এর ফলে দলের আদর্শিক সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভ্রান্তি এবং দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। দীর্ঘদিনের পরিচিত জনপ্রিয় স্থানীয় নেতারা একপাশে আর দলের আনুগত্যের প্রশ্ন অন্যপাশে - এই টানাপড়েনে তৃণমূল কর্মীদের আস্থা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, দলের সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থেকে যারা নির্বাচনী মাঠে থাকতে চান, তাদের উৎসাহও এ পরিস্থিতিতে হ্রাস পেতে পারে। বিপরীতে বহিষ্কৃত নেতারা তাঁদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও গ্রুপিং কাজে লাগিয়ে আলাদা একটি শক্তি প্রদর্শন করছেন, যা মূল দলের ভিত্তিকে সরাসরিভাবে দুর্বল করছে। ফলস্বরূপ, ভোটের মাঠে বিএনপির সাংগঠনিক মেশিনারি ওই এলাকায় কার্যকর থাকছে না, যা প্রতিপক্ষের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করে।

দলীয় শৃঙ্খলা বনাম তৃণমূলের অনুগতি
বিএনপি কেন্দ্র থেকে কড়া বার্তা দিয়েছে- যে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষ নেবে, তাকেও দল থেকে বের করে দেওয়া হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দলটি এ নীতি কার্যকর করে দেশের বিভিন্ন আসনে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে। দলের সূত্র মতে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭২ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে। শাস্তিমূলক এই ব্যবস্থাগুলো দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়ে যাচ্ছে। যাঁরা বহিষ্কৃত হলেন, তাঁরা শুধু কাগজে-কলমে দলছুট নন; তাঁদের সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য কর্মী-সমর্থকের মনেও দলের প্রতি বিমুখতা জন্ম নিচ্ছে। কেন্দ্র ঘোষিত প্রার্থীর পরিবর্তে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার জন্য এতগুলো নেতার একযোগে শাস্তি পাওয়া দেখলে অনেক সাধারণ কর্মীর মধ্যেও দলীয সিদ্ধান্তের ন্যায়নীতি নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে।

অন্যদিকে, দলের নেতৃবৃন্দ মনে করেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তাঁদের মতে, বিদ্রোহীদের প্রতি শাস্তি না দেখালে দলের ঐক্য এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই শাস্তির বিধান সত্ত্বেও বহু বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত মাঠে রয়ে গেছেন এবং নিজ নিজ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক নিয়ে তারা প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। এতে ঐসব আসনে দলের মনোনীত প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। ৯৪ নড়াইল-২ আসন তার একটি উদাহরণ মাত্র, যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুল ইসলামের নিজস্ব জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক তাকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে।

পার্টির রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফলাফল
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় দুই দলের অন্তর্কলহ নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতি নির্বাচইেন দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত বা অসন্তুষ্ট নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়েন কিংবা ভিন্ন মঞ্চে চলে যান, আর দল তখন শৃঙ্খলা রক্ষায় বহিষ্কারসহ কঠোর পদক্ষেপ নেয়। এই দলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে তোয়াক্কা করার অবকাশ সামান্যই থাকে। কিন্তু এর ফলে বহু ক্ষেত্রে দলের তৃণমূল কাঠামোতে ভাঙন দেখা দেয়।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, দলীয় আনুগত্য নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো যে ব্যবস্থা নেয়, তা শেষ পর্যন্ত তাদেরই ক্ষতি করে দেয়। বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদেরকে “বিষফোঁড়া” আকারে দেখতে শুরু করেছে বিএনপি নেতৃত্ব। কারণ যে আসনে এমন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে দলের ভিতরে অন্তর্ঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং সেই সুযোগে বিরোধীপক্ষ ফায়দা তোলে। নড়াইল-২ আসনের পরিস্থিতিও তা-ই নির্দেশ করছে - বহিষ্কার হওয়া নেতারা উল্টো প্রার্থীকে জিতিয়ে কেন্দ্রকে বেকায়দায় ফেলতে চাচ্ছেন, যা শেষমেশ বিএনপির জন্যই সে আসনটি হারানোর ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে।

শেষ কথা হচ্ছে, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে বিএনপি যাদেরকে বাহির করছে, তারা দল থেকেই হারিয়ে যাওয়া একেকটি শক্তি। নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরে এই অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা প্রকাশ্যে আসায় সংগঠনিক ভিত্তি যে নড়বড়ে হয়ে যায়, তা স্পষ্ট। কঠোর দলীয় সংস্কৃতি তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে দলের ঐক্য ও নির্বাচনী সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে- নড়াইল-২-এর গণসমাবেশ ও বিদ্রোহী প্রচারণা তার জ্বলন্ত উদাহরণ।