• 04 Feb, 2026

“তারেকের প্রত্যাবর্তন ও খুলনার বার্তা: বিএনপির ভবিষ্যৎ পথচলার ইঙ্গিত”

“তারেকের প্রত্যাবর্তন ও খুলনার বার্তা: বিএনপির ভবিষ্যৎ পথচলার ইঙ্গিত”

“২২ বছর পর জনসমক্ষে নেতার প্রত্যাবর্তন, জনস্রোত ও রাজনৈতিক ভাষণে বদলে যাওয়া নির্বাচনী সমীকরণ”

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুলনায় আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে জোরালো ভাষণ দেন। তিনি দেশের একাংশের রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার কঠোর সমালোচনা করেন, যা নারীদের গৃহবন্দি রাখতে চায়। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে দিকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল নারীদের প্রতি প্রকাশ্যে অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করেছে এবং নারীর নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বাস দেখাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে আধুনিক বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই মানসিকতা সম্পূর্ণ বেমানান। দেশের গর্ব তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এ খাতের মেরুদন্ড হলো দেশের নারীরা- তাদের পরিশ্রমেই অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। বিরোধীদের ধর্মীয় ভাবাবেগ কাজে লাগানোর প্রচেষ্টার জবাবে তিনি ইসলামি ইতিহাস উদ্ধৃত করেন; উদাহরণ হিসেবে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরা (রা.) একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন উল্লেখ করে তারেক রহমান বোঝান যে ইসলামের প্রেক্ষাপটেও নারীরা কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

নারী অধিকার ও অংশগ্রহণ প্রশ্নে প্রতিপক্ষের দ্বৈতনীতির সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, যারা ইসলামী শাসন কায়েমের কথা বলছে তারাই আবার রাজনৈতিক স্বার্থে নারীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করছে- যা সত্যিকারের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তিনি স্পষ্টভাবে জনসমাবেশে ঘোষণা করেন যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে নারীদের অগ্রগতির পথকে প্রশস্ত করবে এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন করবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দেশবাসীর সমর্থন চেয়ে তারেক রহমান জনগণকে আহ্বান জানান যেন তারা ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেন। “গৃহবন্দিত্ব নয়, আমরা নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী”, এই বার্তা দিয়ে তিনি সমাবেশে উপস্থিত ভোটারদের কাছে বিএনপির পক্ষে রায় দেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টার বিষয়ে সতর্ক করে তারেক রহমান নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানান যে নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়টি চ্যালেঞ্জে ভরা এবং কিছু গোষ্ঠী নৈরাজ্য সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে – তাই সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। তারেক রহমানের এই বক্তব্যে মুক্ত সমাজ, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং নারীর মর্যাদা রক্ষার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার উঠে এসেছে, যা উপস্থিত জনতা করতালি ও শ্লোগানের মাধ্যমে স্বাগত জানায়।

জনসমাগম ও জনসভার পরিবেশ:
খুলনার খালিশপুর এলাকার প্রভাতী স্কুল মাঠে তারেক রহমানের জনসভাকে কেন্দ্র করে জনতার ঢল নেমেছিল। সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের এ সমাবেশে অংশ নিতে ভোর থেকেই খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ আশেপাশের জেলা-উপজেলা থেকে দলে দলে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যানার-ফেস্টুন ও দলের পতাকা হাতে মিছিল সহকারে সমাবেশস্থলে আসতে শুরু করেন। মাঠ ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়; স্লোগানে মুখরিত জনতার উদ্দেশ্য একটিই – দীর্ঘ ১৭ বছর পর স্বদেশে ফিরেছেন যিনি, সেই দলনেতাকে একনজর দেখা এবং তার বক্তব্য শোনা। প্রভাতী স্কুল প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয় এবং অনুমান করা হচ্ছে লক্ষাধিক মানুষ এ সমাবেশে যোগ দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর প্রিয় নেতা সরাসরি উপস্থিত থাকায় উপস্থিত জনতা ছিল উচ্ছ্বসিত। অনেকেই আগের রাতেই দূরদূরান্ত থেকে খুলনায় পৌঁছে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র এই অনুষ্ঠানটিতে অংশ নিতে।

জনসভা শুরুর অনেক আগে থেকেই মাঠে জাতীয় ও দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে নেতাকর্মীরা জায়গা করে নেন। নারীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এবং পুরুষ সমর্থকদের জন্য ছিল পৃথক ব্যবস্থা, যাতে সকলেই স্বাচ্ছন্দ্যে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন। দুপুরের দিকে প্রধান অতিথি তারেক রহমানের আগমন ঘিরে পরিবেশ আরও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি হেলিকপ্টারে করে ঠিক সময়ে খুলনায় পৌঁছালে মাঠজুড়ে করতালির ঢেউ ওঠে এবং “তারেক রহমান, জিন্দাবাদ” শ্লোগানে চারদিক মুখরিত হয়। সমাবেশস্থলে প্রবেশের সময় নেতাকর্মীরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন এবং বহু সমর্থক মোবাইল ফোনে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

দীর্ঘ ২২ বছর পর খুলনার মাটিতে তারেক রহমানের সরাসরি আগমন স্থানীয়দের আবেগাপ্লুত করে। তিনি সর্বশেষ ২০০৪ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে খুলনা সফর করেছিলেন। এত বছর পর নিজের মাঝে তাদের নেতাকে ফিরে পেয়ে কর্মী-সমর্থকদের মনে উৎসাহের সঞ্চার হয়েছে। জনসভায় আগত সাধারণ মানুষ ও কর্মীরা তার বক্তৃতা থেকে কী বার্তা আসে তা শোনার জন্য অধীর অপেক্ষায় ছিলেন। অনেক সমর্থক জানিয়েছেন, তারা বিশেষ করে জানতে চান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে তারেক রহমানের পরিকল্পনা কী। কারো কারো আশা, নতুন নেতৃত্ব দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে এবং সন্ত্রাসমুক্ত শান্তিপূর্ণ দেশ উপহার দেবে। অন্যদিকে স্থানীয় তরুণ ভোটারদের মধ্যে উৎসুক জিজ্ঞাসা ছিল বিএনপি ক্ষমতায় এলে এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নে কী পরিবর্তন আসবে। তারেক রহমান তার ভাষণে এসব প্রশ্নের জবাবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং খুলনাসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সুসম উন্নয়নের রূপরেখা উপস্থাপন করবেন বলে ইঙ্গিত দেন।

স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা ও আয়োজন:
এই জনসভা সফল করতে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সমাবেশটি আয়োজন করে খুলনা মহানগর বিএনপি ও খুলনা জেলা বিএনপি যৌথভাবে, যেখানে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারাও অংশ নেন। মঞ্চ পরিচালনা ও সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মোনা। সকাল থেকেই মঞ্চে স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দিতে শুরু করেন- খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা এবং স্থানীয় শীর্ষ নেতারা এলাকার সমস্যা, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেন। মোট ১৪টি সংসদীয় আসনের বিএনপি প্রার্থী এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন বলে জানা গেছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন পূর্বেই জানিয়েছিলেন যে তারেক রহমান সোমবার বেলা ১১টায় হেলিকপ্টারে খুলনায় পৌঁছাবেন এবং দুপুর ১২টায় সমাবেশে ভাষণ দেবেন। ঠিক সেইসূচি মেনেই তারেক রহমানের আগমন ঘটে। তুহিন আরও আশা প্রকাশ করেছিলেন যে কোনো প্রকার চাপ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে লক্ষাধিক মানুষ জনসভায় যোগ দেবে- বাস্তবেও জনসমাগম সেই প্রত্যাশা ছাড়িয়ে যায় বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল আগেই জানিয়েছিলেন, শুধু খুলনা নয়, পাশের সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকেও অসংখ্য নেতা-কর্মী এই সমাবেশে অংশ নিতে আসবেন। তিনি এও জানান যে দলের পক্ষ থেকে নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুরো আয়োজনটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল ও ছাত্রদলের কর্মীরা মিলে মাঠ ব্যবস্থাপনা, মঞ্চ সাজসজ্জা, শব্দব্যবস্থা ও অতিথিদের আসন বিন্যাস নিশ্চিত করেন। মঞ্চের আশেপাশে ও প্রবেশপথে স্বেচ্ছাসেবকরা শৃঙ্খলা বজায় রাখছিলেন, যাতে এত বিপুল জনসমাগমেও কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিস্থিতি:
তারেক রহমানের এই জনসভাকে ঘিরে প্রশাসন শুরু থেকেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। খুলনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গঠন করা হয়। সমাবেশের আগের রাত (১ ফেব্রুয়ারি) থেকেই খুলনার খুলিশপুরের প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল, যাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। সমাবেশস্থল ও আশেপাশের এলাকায় পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঠের প্রবেশ পথে মেটাল ডিটেক্টর ও তল্লাশির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। জনসভাস্থলের সামনে ও চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরাও স্থাপন করা হয়।

দলের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তায় সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা আগের রাত থেকেই জনসভার মঞ্চ এবং আশেপাশের এলাকা পাহারা দিয়ে রেখেছিলেন, যেন কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। মহিলা কর্মীদের দ্বারা নারী সমর্থকদের বসার জায়গা দেখভাল এবং পুরুষ কর্মীদের দ্বারা পুরুষ দর্শকদের জায়গা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল- আলাদা বসার ব্যবস্থা থাকায় সবাই স্বস্তিতে ছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে বিএনপি নেতারা পুরো অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য সতর্ক ছিলেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর উপস্থিতি এবং দলের স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয়তায় সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

তবে জনসভা শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে খুলনায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী চক্র ও পুলিশ এখনও বিএনপি কর্মীদের ওপর হয়রানি চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির খুলনা মহানগরের আহ্বায়ক শফিকুল আলম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে সমাবেশ শেষে কর্মীরা বাড়ি ফেরার পথে কিছু এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে এবং পুলিশও দলের কর্মীদের বিভিন্নভাবে বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হলেও এটি স্পষ্ট যে তৎকালীন রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে উভয় পক্ষই অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রশাসন সমাবেশস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও পরবর্তী সময়ে দলীয় কর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্ব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সামগ্রিকভাবে, জনসভাটি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং নেতাকর্মীরা কোনো সংঘাত এড়িয়ে স্ব-স্ব আবেগ প্রকাশ করতে পেরেছেন।

প্রেক্ষাপট:
তারেক রহমানের খুলনার এই সফর এবং জনসভা একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শাসক পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন নেতা, যার ওপর বর্তমানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দায়িত্ব নেয়ার সম্ভাবনা জাগ্রত হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। এরপর টানা ১৭ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনে থেকে অবশেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ঢাকায় ফিরে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমেই প্রতীকীভাবে নিকটস্থ মাটি হাতে তুলে নিয়ে তিনি বাংলা মাটিতে প্রত্যাবর্তনের আবেগ প্রকাশ করেন। সমবেত জনতার উদ্দেশে সেদিন তিনি বলেছিলেন, “প্রিয় বাংলাদেশ”, এই মাটিকে মায়ের স্বপ্নের দেশে পরিণত করার অঙ্গীকার করেন তিনি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে বারবার উচ্চারণ করেন - “আমরা দেশে শান্তি চাই”। তার সে প্রত্যাবর্তন মুহূর্তে রাজধানী ঢাকা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে লাখো মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছিল- বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে বরণ করে নেয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই।

তারেক রহমানের দেশে ফেরা সম্ভব হয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দেশের ইতিহাসে স্মরণকালের বৃহত্তম ছাত্র আন্দোলন ও গণবিস্ফোরণের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধীদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা ও শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, সেসবের অনেকগুলোই পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ায় বাতিল বা স্থগিত হয়। হাসিনা সরকারের আমলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জারি করা অর্থপাচার মামলায় এবং শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত মামলায় তাকে (তারেককে) যে দন্ড দেওয়া হয়েছিল, শেখ হাসিনার পতনের পর সেগুলো আদালতে খারিজ হয়ে যায়। ফলে দেশে ফিরতে তার আর আইনি বাধা থাকেনি। দেশে ফেরার পেছনে আরেকটি অনুষঙ্গ হচ্ছে তার মা, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অসুস্থতা। খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আছেন এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই বাইরে। বিএনপির হাল ধরার মতো শীর্ষ নেতৃত্বের এক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, যা তারেক রহমানের আগমন পূরণ করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।

বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষমতায় রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর নতুন নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এই অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠন করা হয়। ইউনূস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় হলেও দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একাংশ এখনো প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে ধারনা করা হয়। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন সময়মতো অনুষ্ঠানের ওপর দেশ-বিদেশের নজর রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ঘোষনা করেছে যে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন এবং তার দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে কতটা কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারবে তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। শেখ হাসিনার দল দাবি করছে যে তাদেরকে নির্বাচনে প্রচার ও অংশগ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না এবং নেতা-কর্মীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন - যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা চলছে। অন্যদিকে বিএনপি ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে এবং তারেক রহমানকে দলটির প্রধান মুখ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

উল্লেখ্য, তারেক রহমান নিজে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং সারা দেশ ঘুরে বিভিন্ন জনসভায় তিনি ধানের শীষ মার্কায় ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে শুরু করে জানুয়ারির শেষ নাগাদ চট্টগ্রাম বিভাগ ও উত্তরবঙ্গ মিলিয়ে তিনি মাত্র ১০ দিনে ১৯টি নির্বাচনী জনসভা সম্পন্ন করেছেন, যা বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে অনেকে মনে করছেন। প্রতিটি জনসভায় তিনি স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিএনপির পূর্ববর্তী শাসনামলের সাফল্য এবং আওয়ামী লীগের গত শাসনামলের ব্যর্থতা তুলে ধরছেন। যেমন উত্তরবঙ্গের বগুড়ার সমাবেশে তিনি বলেছেন, বিগত ১৫ বছরে তথাকথিত মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে, যার ফলে “১৫ বছর ধরে শুধু বগুড়া নয়, পুরো দেশ বঞ্চিত হয়েছে”। বিএনপি সরকারে এলে প্রত্যেকটি জেলায় ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি অঙ্গীকার করেছেন। খুলনার জনসভায়ও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বিএনপি দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন করবে এবং কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলায় উন্নয়ন সীমাবদ্ধ থাকবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া:
তারেক রহমানের খুলনার জনসভা এবং সারাদেশে তার তীব্র প্রচারণা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করছেন। অনেকের মতে, ১৭ বছর পর স্বদেশের মাটিতে তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটিকে সংগঠিত করেছে। আল জাজিরার পর্যবেক্ষক তানভির চৌধুরী বলেন, তারেক রহমান এমন এক সময়ে দেশে ফিরেছেন যখন বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবেশ অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। তার আগমন দেশের রাজনৈতিক ময়দানে একটি সাময়িক শূন্যতা পূরণ করেছে- বিশেষ করে তার মায়ের অসুস্থতা ও অনুপস্থিতির কারণে বিএনপিতে যে নেতৃত্বশূন্যতা ছিল, তিনি এখন তা পূরণ করে দলকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন বেশ জোরেশোরে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছে এবং সাম্প্রতিক জনসমর্থন দেখে অনেকেই তাকে আগামী প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য মুখ হিসেবে বিবেচনা করছেন। ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে বলে সাধারণভাবে ধরা হচ্ছে এবং বিজয়ী হলে তারেক রহমান দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। তাঁর সামনে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার গুরুদায়িত্ব থাকবে, যা এক দশকেরও বেশি সময়ের সংকট কাটিয়ে দেশকে সুস্থিত পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।

তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ভাষণগুলোতে কয়েকটি অভিন্ন বার্তা বারবার উঠে আসছে, যা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রথমত, তিনি বারবার জনগণকে আশ্বাস দিচ্ছেন যে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে আইন-শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা হবে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে বলে যে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, তারেক রহমান সেখান থেকে ফায়দা তুলে জনগণকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছেন। বিএনপি প্রধানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সহিংস উগ্রবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও পরিলক্ষিত হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী থেকে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দূরত্ব বজায় রেখেছে এবং তারেক রহমান নিজেও খুলনার সমাবেশে পরোক্ষভাবে জামায়াতের নারীবিরোধী মনোভাবের সমালোচনা করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলের পুরনো মিত্র হলেও জনমত ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় জামায়াত থেকে দূরত্ব রাখা এবং নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া তারেক রহমানের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত – এর মাধ্যমে তিনি বিএনপিকে মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল দল হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। এর ফলে নারী, সংখ্যালঘু ও তরুণ ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির প্রতি আস্থাশীল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কেও তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়েছে। ঢাকায় এক সমাবেশে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন “না দিল্লি, না পিন্ডি-  সবার আগে বাংলাদেশ”, বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ কারও ছায়া অনুসরণ করবে না, বরং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। এই “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখার ইঙ্গিত বহন করে, যা বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীতি থেকেও ভিন্নমত প্রকাশ করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলেছেন, এই অবস্থান নিয়ে তারেক রহমান মূলধারার জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী অনুভূতিতে সাড়া দিতে চাইছেন, একই সাথে ভারত ও পাকিস্তান ইস্যুতে ভারসাম্যের বার্তা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গ্রহণযোগ্য হতে চাচ্ছেন।

এদিকে নির্বাচনী মাঠে প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ বর্তমানে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। তানভির চৌধুরী আল জাজিরায় বলেন, দেশ এখন দুটি শিবিরে বিভক্ত- একটি পক্ষ তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে, অপর পক্ষের অভিযোগ তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শেখ হাসিনা দেশের বাইরে অবস্থান করায় এবং তার দলের অনেক শীর্ষনেতা আইনি জটিলতায় পড়ায় আওয়ামী লীগ সংগঠিতভাবে প্রচারে নামতে পারছে না বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। অবশ্য আওয়ামী লীগের দাবী, তাদের নেতা-কর্মীদের উপর রাজনৈতিক হয়রানি চলমান, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বিশাল জনসমাবেশগুলো বিএনপির পক্ষে অনুকূল বাতাবরণ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। তাদের মতে, খুলনার জনসভায় যেমন বিপুল জনসমাগম দেখা গেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে মাঠপর্যায়ে বিএনপির সংগঠন পুনরায় জেগে উঠেছে এবং জনগণের একটি বড় অংশ পরিবর্তনের পক্ষে উদগ্রীব। তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে জনসমর্থনকে ভোটে পরিণত করতে বিএনপিকে এখনও অনেক বাধা অতিক্রম করতে হবে – বিশেষত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা ও খুলনায় ঐতিহাসিক জনসভাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে। মাঠের জনগণের উদ্দীপনা থেকে স্পষ্ট, দীর্ঘদিন পর তারা বিএনপির শীর্ষ নেতাকে সামনে পেয়ে উজ্জীবিত। তারেক রহমান তার বক্তব্যে যে বার্তা দিয়েছেন - গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সুশাসন, নারীর ক্ষমতায়ন ও সর্বজনীন উন্নয়ন- তা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনের দিনগুলোতে তারেক রহমানকে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের রোডম্যাপ স্পষ্ট করতে হবে এবং বহুমুখী চাপ সামলে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য অটুট রাখতে হবে। খুলনার জনসভায় জনসমুদ্র দেখে তারেক রহমান আবেগাপ্লুত হলেও, সামনে নির্বাচন জেতার কঠিন লড়াইয়ে তার দলকে নেতৃত্ব দিতে হবে দূরদর্শিতা ও ধৈর্যের সঙ্গে। এই জনসভা তাই একদিকে যেমন বিএনপির জন্য মনোবল বৃদ্ধির কারণ, অন্যদিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অভিমুখ নির্ধারণের গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিতবহন করছে।