বিজ্ঞাপন

সূর্যের শক্তিতে নড়াইলে কৃষি বিপ্লব: প্রতিদিন ১২ লাখ লিটার পানি তুলছে সোলার পাম্প, অর্ধেকে নেমেছে সেচ খরচ

  • নড়াইলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে সৌরবিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্প।
  • প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ লিটার পানি উত্তোলনের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রান্তিক কৃষক স্বল্প খরচে বোরো ধান, ভুট্টা, তিল, পাট ও বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন।
  • এতে একদিকে সেচ ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, অন্যদিকে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার একটি সফল মডেল তৈরি হয়েছে।
সূর্যের শক্তিতে নড়াইলে কৃষি বিপ্লব: প্রতিদিন ১২ লাখ লিটার পানি তুলছে সোলার পাম্প, অর্ধেকে নেমেছে সেচ খরচ
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক: 
দেশের কৃষিখাতে প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে নড়াইলের সৌরবিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্প প্রকল্প। সূর্যের আলোকে শক্তিতে রূপান্তর করে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, যা ব্যবহার করে বোরো ধান, ভুট্টা, তিল, পাট, শাকসবজি এবং অন্যান্য ফসল চাষ করছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।

বর্তমানে নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর ইউনিয়নের মিতনা ও তুলারামপুর বিল এবং কালিয়া উপজেলার একটি বিলে স্থাপিত তিনটি সোলার পাম্প প্রতিদিন প্রায় ১৬ ঘণ্টা ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহ করছে। এর ফলে স্থানীয় প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রান্তিক কৃষক স্বল্প খরচে সেচ সুবিধা পাচ্ছেন এবং চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের আশা করছেন।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথমদিকে অনেকের মধ্যে এ প্রযুক্তি নিয়ে সন্দেহ ছিল। তবে এখন ফল দেখে তারা অত্যন্ত সন্তুষ্ট।

বিজ্ঞাপন

চাচড়া গ্রামের এক কৃষক বলেন,

“বোরো মৌসুমে অন্য এলাকার কৃষকেরা যখন সেচ নিয়ে চিন্তায় থাকেন, তখন আমাদের সেই দুশ্চিন্তা নেই। সময়মতো পানি পাচ্ছি, ফলে ধানের ফলনও ভালো হবে।”

বামনহাটি গ্রামের আরেক প্রান্তিক কৃষক বলেন,

“শুধু ধান নয়, পাট আর সবজিতেও সুন্দরভাবে পানি দিতে পারছি। স্যালো মেশিনের তুলনায় খরচ প্রায় অর্ধেক।”

স্থানীয় কৃষকদের মতে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আগে সেচ খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারে সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

নড়াইল সদরের তুলারামপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুদীপ্ত বিশ্বাস বলেন,

“বর্তমান জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় এই পদ্ধতি অত্যন্ত সময়োপযোগী। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি।”

নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন,

“সোলার পাম্পগুলো কৃষকেরা যৌথভাবে পরিচালনা করছেন। এটি কৃষিতে টেকসই উন্নয়নের একটি সফল মডেল। ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ করা গেলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের লাভ বাড়বে।”

সৌরচালিত সেচ পাম্প: কৃষি উন্নয়নে সম্ভাবনাময় দিকসমূহ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুচ্চালিত সেচ ব্যবস্থা বাংলাদেশের কৃষিখাতে একটি গেম চেঞ্জার প্রযুক্তি হতে পারে।

ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের তুলনায় সৌর পাম্পে জ্বালানি ব্যয় প্রায় শূন্য। এতে কৃষকের সেচ খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে

ডিজেল পাম্প থেকে কার্বন নিঃসরণ হয়, যা পরিবেশ দূষণের বড় কারণ। সৌর পাম্প ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যে নেমে আসে

৩. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা

বাংলাদেশে মৌসুমি বিদ্যুৎ সংকট এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষিতে বড় চ্যালেঞ্জ। সৌরচালিত সেচ পাম্প এ সংকট থেকে মুক্তির কার্যকর সমাধান দিতে পারে।

নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ থাকায় কৃষকেরা শুধু ধান নয়, ভুট্টা, তিল, সবজি, পাটসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।

স্বল্প খরচে সেচ সুবিধা পাওয়ায় ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। এতে তাদের আয় বাড়ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের সময়ে সৌর সেচ ব্যবস্থা কৃষিকে টেকসই রাখতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশের কৃষি এখন প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের পথে। সৌরবিদ্যুচ্চালিত সেচ পাম্প শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ কৃষি ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নড়াইলের এই মডেল যদি দেশের অন্যান্য জেলাতেও সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে কৃষিখাতে উৎপাদন ব্যয় কমে খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

বিজ্ঞাপন