বিজ্ঞাপন

নড়াইলে শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে নতুন বিতর্ক: ওলামায়ে কেরামের প্রেস ব্রিফিং, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরে ক্ষমা প্রার্থনা

  • নড়াইলের আবাসিক মাদ্রাসার ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী হাফেজ সৈয়দ সুলাইমান ইসলাম অভি’র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন মোড় নিয়েছে ঘটনাপ্রবাহ।
  • একদিকে পরিবারের অভিযোগ—মাদ্রাসায় মারধরের কারণে শিশুটির মৃত্যু।
  • অন্যদিকে নড়াইল সম্মিলিত ওলামায়ে কেরাম সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘অপসাংবাদিকতার’ অভিযোগ তুলে প্রেস ব্রিফিং করেন।
নড়াইলে শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘিরে নতুন বিতর্ক: ওলামায়ে কেরামের প্রেস ব্রিফিং, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পরে ক্ষমা প্রার্থনা
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

নড়াইলকণ্ঠ: নড়াইলসদর উপজেলার মারকাযুল কুরআন নড়াইল আবাসিক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাফেজ সৈয়দ সুলাইমান ইসলাম অভি (১৩)-এর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত চলমান থাকলেও ঘটনাটি ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

 শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগ, তিন শিক্ষককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া, ওলামায়ে কেরামের প্রেস ব্রিফিং এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ-সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন নড়াইলজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।


পরিবারের অভিযোগ: “সুস্থছেলে রাতেকীভাবে মৃত্যুরমুখে ঢলে পড়লো?”
নিহত শিক্ষার্থীর বাবা সৈয়দ ইকরাম আলী দাবি করেন, ঘটনার আগের দিন বিকেলেও তিনি ছেলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং একসঙ্গে নামাজ আদায় করেছিলেন। তখন তার ছেলের কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছিল না।

বিজ্ঞাপন

তার অভিযোগ, রাতে মাদ্রাসায় মারধরের কারণে ছেলে গুরুতর আহত হয়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে পরিবারকে জানায়নি। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তারা খবর পান এবং হাসপাতালে গিয়ে সন্তানকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান।

ইকরাম আলীর অভিযোগ, হাসপাতালে ছেলে কথা বলার চেষ্টা করলেও আর কিছু বলতে পারেনি। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

যেভাবে মৃত্যু হলো:
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বুধবার ভোররাতে শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে মাদ্রাসা থেকে পরিবারকে জানানো হয়।

পরিবারের সদস্যরা তাকে নড়াইল জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোরে পাঠানোর পরামর্শ দেন। যশোর নেওয়ার পথে বিকেল প্রায় ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর পরিবার অভিযোগ করে, মাদ্রাসার শিক্ষকদের মারধরের ফলেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।

তিন শিক্ষক পুলিশ হেফাজতে:
ঘটনার পর নড়াইল সদর থানা পুলিশ মাদ্রাসার তিন শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদেরজন্য থানায় নিয়ে যায়।

পুলিশ হেফাজতে নেওয়া শিক্ষকেরা হলেন—ইউসুফ হায়দার (৩৭), হাসিবুর রহমান (৩০),  ফাহাদ শেখ (৩২)।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ওলামায়ে কেরামের প্রেস ব্রিফিং: কী বলা হলো?
শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর বুধবার দুপুর প্রায় আড়াইটার দিকে নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া চৌরাস্তা মোড়ে মারকাযুল কুরআন নড়াইল মাদ্রাসার মূল শাখার হলরুমে নড়াইল সম্মিলিত ওলামায়ে কেরাম একটি প্রেস ব্রিফিং করেন।

সেখানে নড়াইলের বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় প্রিন্ট ওইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন নড়াইল সম্মিলিত ওলামায়ে কেরামের আহ্বায়ক মাওলানা ইকরামুল হক।

বিবৃতিতে বলাহয়— শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তারা গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করছেন। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন।

 তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ধরনের অপপ্রচার না করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

কিছু সংবাদমাধ্যম সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব ভুলে মাদ্রাসা ও ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি হয়—এমন সংবাদ প্রকাশ করেছে বলে অভিযোগ করেন।

 এ বিষয়ে তারা নিজেদের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দোষী প্রমাণিত হয়, তাহলে তার দায়ভার সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের; তবে পুরো মাদ্রাসা বা ইসলামকে দায়ী করা উচিত নয়।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ:
প্রেস ব্রিফিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ‘অপসাংবাদিকতা’ এবং ‘সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব ভুলে সংবাদ প্রকাশ’ করার অভিযোগ।

লিখিত বিবৃতি পাঠের পর উপস্থিত সাংবাদিকেরা এ অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

সাংবাদিকদেরবক্তব্য ছিল—কোন সংবাদে অপসাংবাদিকতা হয়েছে, সেটি নির্দিষ্ট করে দেখাতে হবে।

 কোন গণমাধ্যম পেশাগত নীতিমালা ভঙ্গ করেছে, তার প্রমাণ দিতে হবে।

 উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের পর ওলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত সংবাদ পড়ে শোনানো হয়।

অভিযোগের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন:
সংবাদটি পড়ে শোনানোর পর উপস্থিত সাংবাদিকেরা দাবি করেন, ওই প্রতিবেদনে লিখিত প্রেস বিবৃতিতে উল্লেখ করা অভিযোগের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিকদের বক্তব্যছিল—প্রতিবেদনে পরিবারের অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

পুলিশি তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। কোনো স্থানে পুরো মাদ্রাসা বা ইসলামকে দায়ী করা হয়নি।

এ পর্যায়ে উপস্থিত ওলামায়েকেরামের কয়েকজন প্রতিনিধি সাংবাদিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভুল বোঝাবুঝির জন্য ক্ষমা চান বলে উপস্থিত সাংবাদিকেরা জানান।

“মূলধারাগণমাধ্যম আরসোশ্যাল মিডিয়াএক নয়”
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত সাংবাদিকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরেন।

তাদের বক্তব্য, মূলধারার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেব্যক্তিগত পোস্ট বা ভিডিও এক বিষয় নয়।

অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেপ্রকাশিত বিভিন্ন মন্তব্য বা ভিডিওকে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

সাংবাদিকদের মতে, এই দুই ধরনের মাধ্যমকে এক করে দেখলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।

মাদ্রাসার কেউ উপস্থিত ছিলেন না
প্রেস ব্রিফিংটি মারকাযুল কুরআন নড়াইল মাদ্রাসার হলরুমে অনুষ্ঠিত হলেও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।

ফলে সাংবাদিকেরা মাদ্রাসা পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের আবাসিক নিরাপত্তা, দায়িত্বে থাকা শিক্ষক, রাতের ঘটনার বিবরণ এবং পরিবারকে দেরিতে খবর দেওয়ার অভিযোগসহ একাধিক প্রশ্ন তুললেও সেগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি।

তদন্ত এখন কোথায়?
বর্তমানে ঘটনাটি পুলিশের তদন্তাধীন।
তিন শিক্ষক পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।
শিক্ষার্থীর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ হবে।

এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগের বিচার দাবি করা হয়েছে।

 অন্যদিকে ওলামায়ে কেরামও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

পর্যবেক্ষণ :
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।


প্রথমত, শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের অভিযোগ, পুলিশি তদন্ত এবং ময়নাতদন্ত—এসব আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়।দ্বিতীয়ত, সংবাদ প্রকাশনিয়ে ওলামায়েকেরামের অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের প্রতিবাদ—এটিসংবাদ উপস্থাপনও গণমাধ্যমেরনৈতিকতার প্রশ্ন।

তদন্ত শেষনা হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুরকারণ বাদায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।একইভাবে কোনো সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগও  প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন