নিজস্ব প্রতিবেদক : নড়াইলের রামসিদ্দি গ্রামের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্প এখনো বর্ষা মৌসুমের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর। বর্ষা শুরু হলেই গ্রামজুড়ে বেড়ে যায় নৌকা নির্মাণ ও বেচাকেনার ব্যস্ততা। প্রায় পাঁচ শতাধিক কারিগর, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট মানুষ এ সময় নৌকা তৈরির কাজে যুক্ত থাকেন। তবে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশায় নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ ভবিষ্যতে শিল্পটির অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নড়াইল শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে বিল ও ঘেরবেষ্টিত রামসিদ্দি গ্রামের অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস নৌকা নির্মাণ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে এখানেই বসে জেলার অন্যতম বৃহৎ নৌকার হাট। চলতি বছরও এক মাস আগে থেকেই জমে উঠেছে সেই হাট। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এ বছর নৌকার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে আকারভেদে প্রতিটি নৌকার দাম গত বছরের তুলনায় এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, চলতি মৌসুমে এ গ্রাম থেকে অন্তত দুই কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হবে।
গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি সাজানো কাঠের নৌকা। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য নৌকা তৈরির কারখানা। সেখানে দক্ষ কারিগর ও শ্রমিকরা দিনরাত পরিশ্রম করে কাঠের নৌকা নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
নৌকা নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা জানান, উড়ি আম, পোয়া ও মেহগনি কাঠ সংগ্রহ করে দক্ষ হাতে বিভিন্ন ধরনের নৌকা তৈরি করা হয়। বছরের প্রায় ছয় মাস ধরে চলে এ কাজ। একজন দক্ষ কারিগর প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১,২০০ টাকা এবং শ্রমিকরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন।
প্রবীণ কারিগর প্রবীর বিশ্বাস জানান, বর্ষা মৌসুমে প্রতি বুধবার রামসিদ্দি গ্রামেই বসে নৌকার হাট। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এ হাটে প্রতি সপ্তাহে দেড়শ থেকে দুইশ নৌকা বিক্রি হয়। কারিগর আশিস বিশ্বাস বলেন, এখান থেকে ব্যবসায়ীরা নৌকা কিনে ভ্যান, নসিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যান।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রহমত কাজী জানান, খুলনা, যশোর, মাগুরা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা এ হাটে নৌকা কিনতে আসেন। গত বছর পাঁচ থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া নৌকা চলতি বছর এক থেকে তিন হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তবুও চাহিদা কমেনি।
নৌকা কারিগর সুজিত বিশ্বাস বলেন, স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অন্তত ১০টি জেলার ব্যবসায়ীরা এখান থেকে নৌকা কিনে নিয়ে যান। বিশেষ করে বিলাঞ্চলে চলাচলের উপযোগী ‘কালাই-ঢালাই’ নৌকার চাহিদা এবার অনেক বেশি।
কারিগর আসলাম জানান, বংশপরম্পরায় তারা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। বছরের ছয় মাস সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। চাহিদা বেশি থাকায় কাজের চাপও বেড়েছে। আরেক কারিগর গোপাল বলেন, অতিরিক্ত কাজের কারণে বর্তমানে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করা প্রবীণ কারিগর বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেন, তার বাবা-দাদাও একই পেশায় ছিলেন। বর্তমানে দুজন সহযোগীকে নিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করলেও আগের মতো লাভ নেই। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, নতুন প্রজন্মের কেউ আর এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়।
কারিগর ও শ্রমিকদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেই রামসিদ্দি ‘নৌকা গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। চলতি মৌসুমে গ্রামের প্রায় ৪০টি কারখানায় ছয় হাজারেরও বেশি নৌকা তৈরি হবে বলে তারা আশা করছেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অধিকাংশ নৌকা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হবে।
ডহর রামসিদ্দি গ্রামের কৃষ্ণকালী ও হরি মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান, নৌকার হাটটি মন্দির কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে। প্রতি বছর হাসিল বাবদ প্রায় তিন লাখ টাকা আদায় হয়। এ অর্থ মন্দিরের ধর্মীয় কার্যক্রম, এলাকার অসহায় মানুষের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন মানবিক কাজে ব্যয় করা হয়। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিটি নৌকায় ৫০ টাকা এবং সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে হাসিল নেওয়া হয়। তবে বিক্রেতাদের কোনো ধরনের খাজনা দিতে হয় না।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) নড়াইল কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সুলাইমান হোসেন বলেন, নড়াইলের তৈরি নৌকার চাহিদা দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিসিকের পক্ষ থেকে কারিগরদের প্রশিক্ষণ, ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।