বিজ্ঞাপন

ঈদ এলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নড়াইলের কামারপল্লী!

  • কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলেই নতুন প্রাণ ফিরে পায় নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী কামারপল্লী।
  • আগুন, কয়লা আর হাতুড়ির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে গ্রামের ছোট ছোট দোকান।
  • দা, ছুরি, চাপাতি ও বঁটি তৈরির কাজে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটান কামার শিল্পীরা।
ঈদ এলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নড়াইলের কামারপল্লী!
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

কোরবানির ঈদ সামনে এলেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকার কামার শিল্পীরা। তবে নড়াইলের সিংগাশোলপুর বাজারের চিত্র যেন একটু ভিন্ন। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই মৌসুমে এখানকার কামারপল্লীতে বাড়ে কাজের চাপ, বাড়ে মানুষের আনাগোনা, আর বাড়ে কর্মচাঞ্চল্য। সকাল গড়াতেই দোকানগুলোতে জ্বলে ওঠে আগুনের চুল্লি। এরপর শুরু হয় হাতুড়ির আঘাত, লোহা পেটানোর শব্দ আর ধোঁয়াময় এক ব্যস্ত পরিবেশ।

এই বাজারের কামার শিল্পীরা শুধু স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করেন না, তাদের তৈরি দা, ছুরি, চাপাতি, বঁটি ও কৃষি সরঞ্জাম চলে যায় খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে তাদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের ভাষায়, ঈদের সময় এই কামারপল্লী যেন “জেগে ওঠে” নতুন করে।

বিজ্ঞাপন

সিংগাশোলপুর বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছোট ছোট টিনশেডের দোকান। কোথাও আগুনে লাল হয়ে থাকা লোহা, কোথাও হাতুড়ির আঘাতে তৈরি হচ্ছে দা কিংবা ছুরি। আবার কোথাও পুরোনো বঁটি ও চাপাতি শান দিচ্ছেন কারিগররা। দোকানের সামনে অপেক্ষা করছেন ক্রেতারা।

কেউ নতুন দা বানাতে এসেছেন, কেউ পুরোনো ছুরি ধার করাতে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে তাই এখন কামারদের যেন দম ফেলার সময় নেই।

স্থানীয় কামার শিল্পীরা জানান, বছরের এই সময়টাই তাদের সবচেয়ে বড় আয়ের মৌসুম। ঈদ ঘিরে কয়েক সপ্তাহের আয় দিয়েই অনেক পরিবার বছরের বড় একটি অংশের খরচ চালান।

সিংগাশোলপুর বাজারের সবচেয়ে প্রবীণ কামার শিল্পীদের একজন নিরাপদ বিশ্বাস। বয়স এখন ৮৪ বছর। বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সাড়া না দিলেও এখনো প্রতিদিন দোকানে এসে বসেন তিনি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ থেকেই এই পেশার সঙ্গে জড়িত নিরাপদ বিশ্বাস। তার বাবা পঞ্চান্ন বিশ্বাসও ছিলেন কামার শিল্পী। বাপ-দাদার সেই পেশাই আজও ধরে রেখেছেন তিনি ও তার পরিবার।

দোকানের এক কোণে বসে নিরাপদ বিশ্বাস বলেন,
“স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে আমি এই কাজের সাথে জড়িত। আমার বাবা পঞ্চান্ন বিশ্বাসও এই কাজ করতেন। এখন বয়স হইছে, আগের মতো পারি না। এখন আমার ছেলে কাজ করে, আমি একটু দেখাই দেই।”

তার চোখেমুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু পেশার প্রতি ভালোবাসা এখনো অটুট।

তিনি আরও বলেন,
“সরকার যদি একটু সহায়তা দিতো তাহলে আমাদের কাজের সুবিধা হতো।”

একই বাজারের আরেক প্রবীণ কারিগর স্বপন সরকার। বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই। কিন্তু এখনো সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন।

স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু একজন কামার নন, একজন শিক্ষকও। কারণ এই বাজারের অনেক কামার শিল্পীই তার কাছ থেকে কাজ শিখেছেন।

স্বপন সরকার বলেন,
“সারা বছরই আমাদের কাজ থাকে, তবে ঈদ এলে ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। এই বাজারের ২০-৩০ ঘর কামারের কাজ চলে। অধিকাংশ লোক আমার শিষ্য।”

তিনি জানান, তাদের দোকানে দা, ছুরি, বঁটি, কাঁচি, কুদাল, হাইশো ও চাপড়া চাকুসহ নানা ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করা হয়।

তার ভাষায়,
“আমাদের কাজের মান ভালো বলেই খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় মাল যায়।”

তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“লোহার দাম বাড়ছে, কয়লার দাম বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় লাভ বাড়ে না,” বলেন তিনি।

ঈদ সামনে রেখে শুধু নতুন দা-ছুরি তৈরিই নয়, পুরোনো সরঞ্জাম শান দেওয়ার কাজও বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কোরবানির সময় মানুষ নতুন সরঞ্জামের পাশাপাশি পুরোনো দা, বঁটি ও চাপাতি ধার করাতেও ভিড় করেন কামারদের দোকানে।

জারী শিল্পী ও স্থানীয় বাসিন্দা অধ্যক্ষ রওশন আলী বলেন,
“আমার জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি এই বাজারে কামার শিল্পীরা কাজ করে। এদের তৈরি মালামালের গুণগত মান ভালো।”

তিনি বলেন,
“কোরবানির ঈদ এলে দোকানে অনেক ভিড় পড়ে যায়। কেউ পুরোনো দা-ছুরি শান দিতে আসে, আবার কেউ নতুন কিনতে আসে।”

তার মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

কামার শিল্পীরা বলছেন, বর্তমানে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে এই শিল্প ধীরে ধীরে সংকটে পড়ছে।

অনেক তরুণ এখন এই পেশায় আসতে চান না। কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় অনেকে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

তারপরও পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন প্রবীণ কারিগররা।

তাদের দাবি, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এই শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

নড়াইল বিসিক কার্যালয় বলছে, জেলার কামার শিল্পীদের উন্নয়নে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় তা নিয়ে তারা কাজ করছেন।

বিসিক নড়াইলের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সোলাইমান হোসেন বলেন,
“এ জেলায় প্রায় ৮০-৯০ জন কামার শিল্পী রয়েছেন। তাদের কাজের মান ভালো হওয়ায় জেলার বাইরেও চাহিদা রয়েছে।”

তিনি বলেন,
“কোরবানির ঈদ এলে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এই শিল্পের উন্নয়নের জন্য বিসিক কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সে ব্যাপারে আমরা ভাবছি।”

সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে অনেক কিছু। কিন্তু সিংগাশোলপুর বাজারের কামারপল্লীতে এখনো আগুন, কয়লা আর হাতুড়ির শব্দে টিকে আছে পুরোনো এক ঐতিহ্য।

কোরবানির ঈদ এলেই সেই ঐতিহ্য যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। আগুনের তাপে, ঘামের বিনিময়ে তৈরি হয় দা, ছুরি আর চাপাতি—যেগুলো হয়ে ওঠে কোরবানির প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রবীণ কামারদের চোখে-মুখে ক্লান্তি থাকলেও আছে এক ধরনের গর্ব। কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বিজ্ঞাপন