বিজ্ঞাপন

নড়াইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল, জবাবদিহিতার মুখে প্রশাসন

  • ২ হাজার ৭৫০ একরের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৩৫০ একর বেদখল;…
  • ্তিমালিকানায় রেকর্ড, বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা-দায়িত…
  • ্বহীনতা ও তদারকির অভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় উঠছে প্রশ্ন
নড়াইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল, জবাবদিহিতার মুখে প্রশাসন
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

নড়াইলকণ্ঠ : নদীভাঙন প্রতিরোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নদী তীর সংরক্ষণের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সরকার গত ছয় দশকে নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় অংশ এখন প্রভাবশালী দখলদারদের কবলে। প্রশাসনের চোখের সামনেই সরকারি জমিতে বালু ভরাট করে নির্মিত হচ্ছে দোকানপাট, বাজার, বসতবাড়ি ও স্থায়ী স্থাপনা। কোথাও চলছে প্রকাশ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম, কোথাও আবার বহুতল ভবন পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে-এত বড় পরিসরে সরকারি জমি দখল হলো কীভাবে, এত বছর ধরে কারা নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন, আর এই রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিনিময়ে সরকার কী পেল?

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দায়িত্বহীনতা, নিয়মিত তদারকির অভাব, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং কার্যকর জবাবদিহিতার সংকটের সুযোগেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জমি একের পর এক বেদখল হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণেই দখলদাররা ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

জানা গেছে, ১৯৬২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলার ১৬০টি মৌজায় ৭৯৬টি ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন (এলএ) মামলার মাধ্যমে মোট ২ হাজার ৭৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এসব জমি নদীর তীর সংরক্ষণ, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণ, খাল পুনঃখনন এবং পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বর্তমানে অভিযোগ উঠেছে, মোট জমির অন্তত ১ হাজার ৩৫০ একর ইতোমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে। শুধু দখলই নয়, প্রায় সমপরিমাণ জমি বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ডও হয়ে গেছে। সরকারি হিসেবে যে জমি রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের কথা ছিল, সেই জমিতেই এখন গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক হাট-বাজার, অসংখ্য দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও বহুতল ভবন।

ভূমি সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি জমি যদি বছরের পর বছর ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়ে যায়, সেখানে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে ওঠে এবং প্রকাশ্যে ব্যবসা পরিচালিত হয়-তাহলে শুধু দখলদারদের দায় নয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ, সময়মতো রেকর্ড সংশোধন, সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলে পরিস্থিতি এতদূর গড়ানোর সুযোগ ছিল না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, লোহাগড়া উপজেলার কালনা-কালিগঞ্জ সড়ক, কালিয়া উপজেলার পেড়লি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা। পেড়লির কয়েকটি স্থানে সরকারি জমিতে বালু ভরাটের কাজও চলতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে বালু ভরাট করে জমি দখল নিশ্চিত করা হয়, পরে সেখানে নির্মাণ করা হয় ঘরবাড়ি, দোকান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেড়লি এলাকার কয়েকজন দখলদার দাবি করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মচারীর কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে মৌখিক অনুমতি নিয়েই তারা বালু ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণ করছেন। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সার্ভেয়ার মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, মোট ২ হাজার ৭৫০ একর জমির মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ একর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে রেকর্ড হয়েছে। বাকি জমি বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে রেকর্ড হয়ে গেছে। এসব জমি পুনরুদ্ধারে ইতোমধ্যে ৩০টি দেওয়ানি মামলা, ৫টি এলএসটি মামলা এবং ১৯টি নামজারি আবেদন করা হয়েছে। আরও তিন শতাধিক নামজারি আবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সব জমির রেকর্ড পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, যে জমি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, সেটি যদি কয়েক দশক ধরে অন্যের নামে রেকর্ড হয়ে যায়, তাহলে সেই সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল? নিয়মিত তদারকি, সীমানা চিহ্নিতকরণ কিংবা রেকর্ড সংরক্ষণে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি মো. শাহ্ আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীবেষ্টিত নড়াইলে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংরক্ষিত জমি হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের পানি ব্যবস্থাপনা ও নদী রক্ষার জন্য বড় হুমকি।

সমাজকর্মী স্বপ্না রানী রায় বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে থেকে কিছু ব্যক্তি বছরের পর বছর এসব জমি দখল করেছেন। সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ভয় কিংবা প্রভাবের কারণে প্রতিবাদ করতে পারেন না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিকাংশ জমিই বেদখল হয়ে যাবে। তখন নতুন কোনো নদী রক্ষা বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ভূমি সংকট দেখা দেবে।

তিনি অবিলম্বে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান, সীমানা পিলার স্থাপন, সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টানানো, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যাচাই এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানান।

স্থানীয় এক আইনজীবী বলেন, সরকারি জমি একবার ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেলে তা বাতিল করতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। রাজনৈতিক চাপ, আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে দখলদাররা স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সরকারি জমি পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

তথ্য অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক হাট-বাজার গড়ে উঠেছে। এসব বাজারে প্রায় পাঁচ হাজার ব্যবসায়ী স্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রের জমিতে এত বড় অর্থনৈতিক কার্যক্রম চললেও সরকারের রাজস্ব আয় কোথায়? সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালিত হলেও রাষ্ট্র কি কোনো আর্থিক রিটার্ন পাচ্ছে, নাকি পুরো সুবিধাই চলে যাচ্ছে দখলদারদের হাতে?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। তিনি মত দেন, হাট-বাজার এলাকায় ভূমিহীন ও ব্যবসায়ীদের নামে নীতিমালার আওতায় ইজারা দেওয়া হলে অন্তত সরকার রাজস্ব আদায় করতে পারবে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজীৎ কুমার সাহা বলেন, জমির রেকর্ড যাচাই ও সীমানা নির্ধারণের কাজ চলছে। বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে পর্যায়ক্রমে জমি উদ্ধার করা হবে। তিনি জানান, ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হওয়া এক একর জমি ফিরে পেতে ইতোমধ্যে চারটি এলএ মামলা করা হয়েছে এবং বাকি জমির জন্যও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক ডা. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, নদী দখলসহ সরকারি জমি উদ্ধারে জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সহযোগিতা চাইলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার করা হবে।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবশিষ্ট জমিও বেদখল হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, কেবল মামলা করলেই হবে না; কে বা কারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন, কেন সরকারি সম্পত্তি বছরের পর বছর রক্ষা করা যায়নি, এবং এই বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত কার-সেই প্রশ্নেরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। 

বিজ্ঞাপন