নড়াইলকণ্ঠ : বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ৪০ দিনের সৃজন কর্মসূচির আওতায় নড়াইল সদর উপজেলার আউড়িয়া ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুরে “দাইবাড়ি খাল” পুনঃখনন কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত ও ভরাট হয়ে থাকা এই খাল পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, সেচ সুবিধা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের আশা করছেন স্থানীয়রা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট হাসান সিকদার (নাকশী) জানান, প্রতিদিন ১১৯ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও ১৩ মে হাজিরা ছিল ১১৫ জন এবং ১৪ মে ১১১ জন। প্রত্যেক শ্রমিক প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে মজুরি পাচ্ছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কৃষি কাজে গুরুত্বপূর্ণ এই খালটি অকেজো হয়ে পড়ে ছিল। খালটি পুনঃখনন হলে কৃষকরা সেচ সুবিধা পাবেন, পাট জাগ দিতে পারবেন এবং সেচ ব্যয় কমবে।
প্রকল্পে প্রায় ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন, যা নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
“৪০দিনের সৃজন কর্মসূচির শ্রমিক (নারী) তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমরা এই কাজটা পেয়ে অনেক খুশি হইছি। গরীব মানুষ সবাই মিলে করতি পারতিচি। খালটা হওয়াতে আরো খুশি মানসি হাঁস পুষতি পারবে, গরু গোসল করাতি পারবে, মাছ হবে, জমিতি পানি দিয়ে ধান করতি পারবে, সবদিক দিয়ে আমাদেও সুযোগ সুবিধা হবে। ”
“আরো এক নারী শ্রমিক তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, আমরা যারা এখানে শ্রমিক আছি- সকাল ৮ টায় আসি আর বিকাল ৩টা পর্যন্ত কাজ করি। আমাদের মজুরি ৫০০ টাকা। এখানে বাড়ি থেকে আসতে এবং যেতে ৫০ টাকা খরচ হয়। আমাদের ২টায় ছেড়ে দিলে আমাদের একটু সবিধা হয়। এছাড়া দুপুরে আমাদের কিছু স্যালাইনের ব্যবস্থা করলে উপকৃত হতো।”
“দাইবাড়ি খাল” প্রকল্পের পিআইসি ও আউড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য উজ্জ্বল মিনা জানান, খালটির দৈর্ঘ্য ৯৫০ মিটার। উপরের প্রস্থ ৮ মিটার, গভীরতা সাড়ে ৩ মিটার, তলদেশ ১১ ফুট এবং পাড় ৬ ফুট রাখা হবে।
তিনি বলেন, খালটি দুই প্রক্রিয়ায় খনন করা হবে—প্রথমে শ্রমিকদের মাধ্যমে কুদাল-ঝুড়ি ব্যবহার করে মাটি কেটে পাড়ে ফেলা হচ্ছে। পরে ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে বাকি অংশের কাজ সম্পন্ন করা হবে। ঈদের পর যন্ত্রচালিত অংশের অনুমোদন পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে কাজ সন্তোষজনক গতিতে এগোচ্ছে।
আউড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম পলাশ জানান, গত ১২ মে নড়াইল-১ ও ২ আসনের সংসদ সদস্যরা প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। নির্ধারিত ১১৯ জন উপকারভোগীর মধ্যে ৩০ শতাংশ নারী রয়েছেন। খালের আশেপাশে ৭-৮টি গ্রাম এবং প্রায় ৭০০-৮০০ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে, যা এই খালের পানির ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আরো জানান, উদ্বোধনের দিন এলাকাবাসী কৃষি সেচ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্লুইসগেট স্থাপনের দাবি জানান। কৃষকরা মনে করেন, স্লুইসগেট থাকলে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
দাইবাড়ি খাল পুনঃখনন শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি কৃষি অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠারও একটি উদ্যোগ। পানি কৃষির প্রাণ। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে কৃষকরা কম খরচে বেশি উৎপাদন করতে পারবেন। ফলে সেচ ব্যয় কমবে, কৃষি লাভজনক হবে এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খালটি পুনঃখনন সম্পন্ন হলে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে ৫-৬ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। ধান, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়বে, পাশাপাশি মাছ চাষ ও হাঁস পালনের মতো বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ জলাধার ও খাল পুনঃখনন জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। দাইবাড়ি খাল প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে এটি হবে একটি টেকসই কৃষি উন্নয়ন মডেল।
স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, এই প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে ইউনিয়নের অন্যান্য পরিত্যক্ত খালও পুনঃখননের আওতায় আসবে। এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল হবে।