নড়াইলকণ্ঠ : পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশু কোরবানি। আর কোরবানিকে ঘিরেই প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠে কয়েকশ’কোটি টাকার পশুর বাজার। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছরও কৃষিনির্ভর জেলা নড়াইল-এ কোরবানির পশু বেচাকেনায় প্রায় দুই শত কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি ও পশুপালননির্ভর অর্থনীতি
প্রায় আট লাখ মানুষের বসবাসের এ জেলায় ভারী শিল্প-কারখানার তেমন বিকাশ ঘটেনি। বিল, ঘের ও কৃষিজমি বেষ্টিত জনপদে জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি, মৎস্যচাষ ও পশুপালন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জেলার প্রায় ৮২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, গমসহ নানা ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ পশুপালনের সঙ্গে জড়িত।
গত কয়েক দশক ধরে জেলার খামারি ও প্রান্তিক চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে গরু ও ছাগল পালন করে আসছেন। বিশেষ করে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে তারা অতিরিক্ত পশু মোটাতাজা করেন। ফলে কোরবানির মৌসুমে এ জেলা পরিণত হয় এক বৃহৎ পশু সরবরাহ কেন্দ্রে।
৪৫ হাজার পশু প্রস্তুত, ৬ হাজার উদ্বৃত্ত
চলতি বছর জেলায় ৪ হাজার ৬০০ খামারি ও কৃষক মিলে মোট ৪৫ হাজার পশু প্রস্তুত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ২১ হাজার গরু এবং ২৪ হাজার ছাগল। অথচ জেলার অভ্যন্তরীণ কোরবানির চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার পশু।
সে হিসেবে প্রায় ৬ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা সিলেট, ঢাকা, খুলনা, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে। ইতোমধ্যেই অনেক ক্রেতা সরাসরি খামারে এসে গরু-ছাগল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে খামারিদের হাটভাড়া, পরিবহন ও ঝুঁকি—সবই কমছে।
দেশীয় পদ্ধতিতে মোটাতাজা, নিরাপদ পশু প্রস্তুত
জেলার খামারিরা সারা বছর ধরে দেশীয় ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করেন। কাঁচা ঘাস, খড়, গমের ভুসি, খৈল, চালের গুঁড়া—এসব দেশীয় খাবারই প্রধান উপকরণ। সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষতিকর হরমোন বা স্টেরয়েড ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর নিয়মিত তদারকি করছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে দেশে পর্যাপ্ত পশুর মজুদ রয়েছে। আমাদের জেলায় প্রস্তুত পশুগুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন বলে আমরা আশাবাদী।”
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তদারকির ফলে পশুগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান এবং বাজারজাতকরণের আগে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে ক্রেতাদের আস্থা যেমন বাড়ছে, তেমনি জেলার পশুর সুনামও ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য জেলায়।
দামের চিত্র ও সম্ভাব্য আয়
খামার সূত্রে জানা গেছে, আকার ও ওজনভেদে প্রতিটি গরুর দাম ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর প্রতিটি ছাগল বিক্রি হচ্ছে ১৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায়।
গড় হিসাবে যদি প্রতিটি গরুর দাম ধরা হয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ছাগলের গড় দাম ২৫ হাজার টাকা, তাহলে মোট লেনদেন সহজেই ২০০ কোটির ঘরে পৌঁছাতে পারে। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী:—
২১ হাজার গরু × গড় ১.৫ লাখ টাকা = প্রায় ৩১৫ কোটি টাকা (উচ্চমূল্যের সম্ভাবনা সহ)
২৪ হাজার ছাগল × গড় ২৫ হাজার টাকা = প্রায় ৬০ কোটি টাকা
যদিও বাস্তবে সব পশু সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয় না, তবে গড় ও ওঠানামা মিলিয়ে অন্তত ২০০ কোটি টাকার বাজার তৈরি হবে বলেই প্রত্যাশা।
আয়-ব্যয় ও মুনাফার চিত্র
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি গরু মোটাতাজা করতে ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে খাবার, ওষুধ, শ্রম ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ পড়ে গড়ে ৬০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। বাজারে ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকায় বিক্রি হলে প্রতি গরুতে ৩০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুনাফা সম্ভব।
ছাগলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। গড়ে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ছাগল প্রস্তুত করা যায়। বাজারে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হলে ভালো লাভ থাকে।
এই মুনাফাই বছরের বাকি সময়ের কৃষি ও পারিবারিক ব্যয় মেটাতে বড় সহায়ক হয়। অনেক পরিবারের জন্য কোরবানির মৌসুমই বছরের প্রধান আয়কাল।
সরাসরি ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান
জেলায় অন্তত দেড় লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া খড়-ভুসি ব্যবসায়ী, পশুখাদ্য সরবরাহকারী, ওষুধ বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক, হাট ইজারাদার—সব মিলিয়ে বিশাল একটি অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়।
কোরবানির আগে-পরে কয়েক সপ্তাহে এ খাতে ব্যাপক অর্থপ্রবাহ ঘটে। স্থানীয় বাজার, দোকান, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এর সুফল পান।
খামার থেকে সরাসরি বিক্রি: ঝুঁকি কম, লাভ বেশি
এবারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—অনেক ক্রেতাই সরাসরি খামারে গিয়ে পশু কিনছেন। এতে খামারিদের হাটে নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচ, দালাল খরচ ও ঝুঁকি কমছে। একইসঙ্গে ক্রেতারাও পশুর খাবার, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিজের চোখে দেখে কিনতে পারছেন।
অনেক খামারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আগাম বুকিংও নিচ্ছেন। এতে বিক্রির নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
আমদানি ইস্যুতে উদ্বেগ
তবে খামারিদের বড় উদ্বেগ—ঈদকে সামনে রেখে যদি বিদেশ থেকে পশু আমদানি করা হয়, তাহলে স্থানীয় বাজারে দাম কমে যেতে পারে। এতে জেলার হাজারো খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত পশু মজুদ রয়েছে। তাই স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় আমদানি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি
কোরবানির পশুর হাট ও খামারে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পশুর স্বাস্থ্য সনদ, টিকাদান, এবং অসুস্থ পশু শনাক্তকরণে বিশেষ টিম কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ পশু নির্বাচন করতে ক্রেতাদের উচিত—
পশুর চোখ, নাক ও চামড়া পর্যবেক্ষণ করা
অস্বাভাবিক ফোলা বা ইনজেকশনের চিহ্ন আছে কি না দেখা
স্বাস্থ্য সনদ নিশ্চিত করা
সামগ্রিক প্রত্যাশা
সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে এ বছর নড়াইল-এ কোরবানিকে ঘিরে অন্তত ২০০ কোটি টাকার পশু কেনাবেচা হবে। এতে জেলার অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, প্রান্তিক খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রবাহ আরও গতিশীল হবে।
কৃষিনির্ভর এ জনপদে কোরবানি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক বিপ্লব। পশুর হাট জমে উঠছে, খামারে ব্যস্ততা বেড়েছে, আর খামারিদের চোখে এখন স্বপ্ন—পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার।