• 23 Apr, 2026

স্মৃতির ভাঁজে মানুষ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস

স্মৃতির ভাঁজে মানুষ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস

মানুষের জীবন স্মৃতিরই আরেক নাম। কিছু স্মৃতি হাসায়, কিছু কাঁদায়, কিছু মানুষকে বদলে দেয় চিরদিনের জন্য। শৈশবের উঠোন, হারিকেনের আলো, মায়ের অদ্ভুত অনুভূতি, প্রথম কোরআন শেখা, স্কুলজীবনের সংগ্রাম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—এসব মিলিয়েই গড়ে ওঠে একজন মানুষের জীবনদর্শন। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, বরং সত্য, সংগ্রাম, ভালোবাসা ও নীরব প্রতিবাদের এক বাস্তব জীবনগাথা।

সেই ছোটবেলার কথা আজও মনে পড়লে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি হয়। সময় কত দ্রুত বদলে যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য কখনও মুছে যায় না। মানুষের বয়স বাড়ে, চুলে পাকা রঙ লাগে, চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়—কিন্তু শৈশবের কিছু মুহূর্ত ঠিক যেন হৃদয়ের ভেতরে স্থির হয়ে থাকে।

যখন স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়েছে, ঠিক সেই সময় আমাদের পরিবারে এক বিশেষ মানুষ ছিলেন—আমার ভাই, যিনি মামা বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতেন। নানার খুব আদরের নাতি ছিলেন তিনি। তার নাম ছিল কাজী নবীর হোসেন। পরিবারের সবার কাছে তিনি ছিলেন আলাদা ভালোবাসার মানুষ।

একবার তিনি মামা বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে এলেন। আমি তখন খুব ছোট। আমার ঠিক বড় ভাইকে আর আমাকে নিয়ে তিনি লেখাপড়া শেখানোর জন্য নানা রকম গল্প, খেলাধুলা আর মজার আয়োজন করতেন। ছোটবেলার স্মৃতি বলে সবকিছু স্পষ্ট মনে নেই, কিন্তু তার হাসি, তার স্নেহ, আর আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে তার ব্যস্ততা আজও যেন অস্পষ্ট আলো হয়ে মনে জ্বলে।

জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—যাদের আমরা সবচেয়ে আপন মনে করি, তারা কখনও কখনও খুব হঠাৎ করেই চলে যায়।

নবীর ভাই এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করে নানা বাড়িতে ফিরেছিলেন। সবার মধ্যে আনন্দ ছিল—ছেলেটি বড় হচ্ছে, সামনে তার ভবিষ্যৎ, পরিবারের স্বপ্ন। কিন্তু সেই রাতেই হঠাৎ তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলেন। সময়টা ছিল এমন, যখন চিকিৎসা এত সহজলভ্য ছিল না। একটি রাত কখনও কখনও একটি জীবনের সমাপ্তি লিখে দেয়।

ভোররাতে নানা বাড়ি থেকে আমার মেজো মামা, মরহুম মোঃ হাবিবুর রহমান, একটি হারিকেন হাতে আমাদের বাড়িতে ঢুকলেন। উঠোন অন্ধকার, বাতাসে অজানা আতঙ্ক। ঘরে ঢুকেই তিনি আমার মাকে ডাকতে লাগলেন—“কুলছুম, কুলছুম!”

মামার সেই ডাক মুহূর্তের মধ্যে মায়ের কানে পৌঁছালো। আর মা যেন কোনো অদৃশ্য অনুভূতিতে, না জেনেই বলে উঠলেন—“আমার নবীর মনে হয় আর নেই।”

আজও আমি ভাবি—এ কেমন অনুভূতি ছিল? একজন মায়ের হৃদয় কি সত্যিই দূর থেকে মৃত্যুর সংবাদ শুনে ফেলে? না কি ভালোবাসার নিজস্ব কোনো ভাষা আছে, যা শব্দের আগেই সত্যকে চিনে নেয়?

সেই দৃশ্য আজও আমার ভেতরে গেঁথে আছে। হারিকেনের আলো, মামার মুখ, মায়ের কাঁপা কণ্ঠ—সব যেন আজও জীবন্ত।

জীবনের শুরুতে শিক্ষা ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। প্রথম যখন লেখাপড়া শেখার জন্য ভর্তি হলাম, সেটি ছিল একটি ইবতেদায়ী মক্তব। সেখানেই প্রথম আমপারা পড়া, তারপর ধীরে ধীরে কোরআন শরীফ পড়া শেখা। শিক্ষার প্রথম অক্ষর ছিল ধর্মীয় জ্ঞানের সঙ্গে জড়ানো। সেই শিক্ষা শুধু পড়া শেখায়নি; মানুষ হতে শিখিয়েছে।

আমরা ওই মক্তবেই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করি। এরপর পূর্ব পাকিস্তান আমলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই সম্মেলনী চালিতাতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, নতুন স্বপ্ন—সবকিছু যেন জীবনের নতুন দরজা খুলে দিল।

১৯৭৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করি। এরপর নড়াইলের Victoria College, Narail থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং বি.এ. সম্পন্ন করি। শিক্ষাজীবন কখনও শুধু ডিগ্রি অর্জনের নাম ছিল না; এটি ছিল নিজেকে তৈরি করার পথ।

আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকেই সমাজের অন্যায় আমাকে নাড়া দিতে শুরু করে। হয়তো বয়স কম ছিল, কিন্তু বিবেক তখনই জেগে উঠেছিল। আমরা কয়েকজন মিলে একটি ছোট কমিটি তৈরি করলাম। নাম দিলাম—“তরমুজ পার্টি।”

নামটি শুনে অনেকে হাসতেন। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই গম্ভীর। যেখানে অন্যায়, অসামাজিকতা, দুর্নীতি—সেখানেই সরাসরি রুখে দাঁড়ানো। বয়সে ছোট হলেও আমাদের ভেতরে প্রতিবাদের আগুন ছিল প্রবল।

আজ ভাবি, সমাজ পরিবর্তনের বীজ আসলে ছোটবেলাতেই রোপিত হয়। যে শিশু অন্যায় দেখে প্রশ্ন করতে শেখে, সে বড় হয়ে মাথা নত করে বাঁচতে পারে না।

আজ যখন বয়স জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, তখনও মনে হয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করা যাবে না। দুর্নীতি, অনিয়ম, শোষণ—এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি এক ধরনের ঈমানও বটে।

একটি ছোট্ট ঘটনা বলি-

সম্ভবত আশির দশকের শেষ দিকে কিংবা নব্বইয়ের শুরুর দিকে জেলা শহরের খাদ্য গুদামের শ্রমিকদের সঙ্গে আমার কিছুটা ওঠাবসা ছিল। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আমার এক অদ্ভুত টান সবসময় ছিল। কেন ছিল, আজও জানি না। হয়তো তাদের কষ্টের ভেতরে সত্যকে বেশি স্পষ্ট দেখা যায়।

একদিন শ্রমিকদের মুখে শুনলাম, তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বড় বড় বস্তা বহন করে। সেই পরিশ্রমের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের অন্যায় পথে বিপুল টাকা আয় করার সুযোগ তৈরি হয়। আমি জানতে চাইলাম—“এর বিনিময়ে আপনারা কী পান?”

তারা বলল—“আমরা ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। প্রতি বস্তা বহনের জন্য চার আনা পাই।”

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

যে শ্রমিক নিজের শরীর ভেঙে কাজ করছে, যার ঘামে কর্মকর্তাদের লাখ লাখ টাকার অবৈধ আয়—সে দিনের শেষে পায় মাত্র চার আনা!

ঘটনার গভীরে ঢুকে দেখলাম, এই শ্রমিকদের দিয়ে বস্তার পর বস্তা আনলোড-আপলোড করিয়ে একজন কর্মকর্তা সরকারি সম্পদ থেকে সাত-আট লাখ টাকা পর্যন্ত নানা কারচুপির মাধ্যমে আত্মসাৎ করছেন। অন্যদিকে শ্রমিকেরা দিন শেষে খালি হাতে বাড়ি ফিরছে।

তাদের ঘরে চুলা জ্বলে কি না, সন্তান খেয়েছে কি না—এসব জানার প্রয়োজন মনে করেনি কেউ। দুর্নীতির টেবিলে বসা মানুষ কখনও শ্রমিকের ক্ষুধার শব্দ শোনে না।

আমি সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে একটি ভিন্ন পথ নিলাম।

ওই কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করলাম। শান্তভাবে বললাম—“শ্রমিকদের প্রতি একটু খেয়াল রাখা দরকার। তাদের দিয়ে আপনারা যে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন, সে খবর আমাদের কাছে আছে।”

বেশি কিছু বলিনি। শুধু সত্যিটুকু তার সামনে রেখে এসেছিলাম।

পরের দিন থেকেই শুরু হলো ভিন্ন দৃশ্য।

জানতে পারলাম, প্রতিদিন শ্রমিকরা ঠিকাদারের মাধ্যমে যে পারিশ্রমিক পেতেন, তার বাইরে ওই কর্মকর্তা শ্রমিকদের জন্য প্রতিদিন এক বস্তা চাল বরাদ্দ করেছেন।

হঠাৎ এই পরিবর্তনে শ্রমিকরা অবাক।

একদিন তাদের একজন নেতা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন—“আপনি স্যারের সঙ্গে দেখা করে আসার পর থেকে উনি আমাদের সঙ্গে যে ব্যবহার করছেন, তা অকল্পনীয়। কী এমন কথা বললেন?”

আমি শুধু হেসেছিলাম।

সব কথা প্রকাশ্যে বলা যায় না। কিছু কথা শুধু বিবেকের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দেয়। আর মানুষ যদি পুরোপুরি মৃত না হয়ে থাকে, তবে সেই দরজা একদিন না একদিন খুলবেই।

এ রকম ঘটনা জীবনে অসংখ্য আছে। অনেক গল্প কখনও প্রকাশ্যে আসেনি। কেউ আনবার চেষ্টা করেনি, আমিও না। কারণ সব লড়াই মঞ্চে দাঁড়িয়ে হয় না; কিছু লড়াই নীরবে হয়, যেখানে হাততালি নেই, সংবাদপত্রের শিরোনাম নেই—শুধু মানুষের মুখে একটু স্বস্তির হাসি থাকে।

আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, দেখি—জীবন আমাকে বড় কোনো পদ দেয়নি, বড় পরিচয়ও দেয়নি। কিন্তু কিছু মানুষের দোয়া দিয়েছে। কিছু শ্রমিকের সম্মান দিয়েছে। কিছু মায়ের অশ্রু মুছে দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে?

আমাদের প্রজন্মের মানুষরা আজ অনেকটাই স্মৃতির ভেতরে বাস করি। নতুন পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি এগিয়েছে, সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু মানুষের ভেতরের মানবিকতা কি সমানভাবে বেড়েছে?

আজও প্রশ্ন জাগে।

শিক্ষা কি শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য? না কি শিক্ষা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়?

ধর্ম কি শুধু নামাজ-রোজায় সীমাবদ্ধ? না কি ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোও এক ধরনের ইবাদত?

সমাজ কি শুধু বড়লোকদের জন্য? না কি একজন দিনমজুরের ঘামেরও সমান মূল্য আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই হয়তো জীবন কেটে গেছে।

আজ যারা ষাটোর্ধ্ব বয়সে পৌঁছেছেন, তাদের প্রত্যেকের বুকের ভেতর এমন অসংখ্য গল্প জমে আছে। কিছু গল্প হারিকেনের আলোয় লেখা, কিছু চোখের জলে, কিছু প্রতিবাদের আগুনে।

সেই গল্পগুলো বলা দরকার।

কারণ ইতিহাস শুধু বড় বড় মানুষের জীবনী নয়; ইতিহাস তৈরি হয় সাধারণ মানুষের ছোট ছোট সাহস থেকে।

আপনারও যদি এমন কোনো স্মৃতি থাকে—যা আপনাকে বদলে দিয়েছে, মানুষ করেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখিয়েছে—তবে সেটি লিখে রাখুন। শেয়ার করুন। কারণ আগামী প্রজন্মের জানা দরকার, আমরা কেমন সময় পেরিয়ে এসেছি।

মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু তার সততা, সাহস, আর স্মৃতি থেকে যায়। সত্যিকারের উত্তরাধিকার সেখানেই।