• 23 Apr, 2026

স্মৃতির মাঠে ফিরে দেখা: হালচাষ, ধুও গান আর হারিয়ে যাওয়া গ্রামের ভালোবাসা

স্মৃতির মাঠে ফিরে দেখা: হালচাষ, ধুও গান আর হারিয়ে যাওয়া গ্রামের ভালোবাসা

মানুষের জীবনে কিছু স্মৃতি কখনও পুরোনো হয় না—সময়ের সাথে তা আরও গভীর ও আবেগময় হয়ে ওঠে। শৈশবের সেই গ্রাম, মাঠের আইল, কৃষিকাজের ব্যস্ততা, কামলাদের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া, আর দূর থেকে ভেসে আসা লোকসংগীত—সব মিলিয়ে ছিল এক অন্যরকম পৃথিবী। আজকের যান্ত্রিক জীবনে দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা আর ভালোবাসার ঢেউ জেগে ওঠে।

গ্রামের জীবনকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন—গ্রাম মানে শুধু কাঁচা রাস্তা, সবুজ ধানক্ষেত আর পাখির ডাক নয়; গ্রাম মানে সম্পর্ক, পরিশ্রম, ভাগাভাগি, সম্প্রীতি আর একসাথে বেঁচে থাকার এক অনন্য অনুভূতি। আমার শৈশবও ঠিক তেমনই এক গ্রামীণ পরিবেশে কেটেছে, যেখানে প্রতিটি সকাল ছিল কাজের ডাক, প্রতিটি বিকেল ছিল গল্পের আসর, আর প্রতিটি রাত ছিল শান্তির।

আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন আমাদের সংসারে কৃষিকাজ ছিল জীবনের প্রধান অংশ। আমার মেজ ভাই ছিলেন সংসারের অন্যতম ভরসা। তিনি বারো মাসই কামলাদের নিয়ে মাঠে কাজ করতেন। হালচাষ করা, জমি নিড়ানো, ধান কাটা, পাট কাটা, আখ লাগানো, আখ মারাই করা, খেজুর গাছ ও তালগাছ কাটা—সবকিছুতেই তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল চোখে পড়ার মতো।

সেই সময় কৃষিকাজ মানেই ছিল শুধু শ্রম নয়, ছিল একধরনের সামাজিক উৎসবও। সকালবেলা ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। কামলারা একে একে এসে জড়ো হতেন। কারও হাতে লাঙল, কারও হাতে কাস্তে, কারও কাঁধে দা। আর ঘরের ভেতর থেকে শুরু হতো আরেক যুদ্ধ—তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করা।

আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল সেই খাবার মাথায় করে মাঠে পৌঁছে দেওয়া। হাতে খাবারের ডিশ, অন্য হাতে পানির কলস বা জগ—এই ভার নিয়ে প্রতিদিন সকালবেলা ক্ষেত-খামারে যেতে হতো। তখন মনে হতো, এর চেয়ে বিরক্তিকর কাজ আর কিছু হতে পারে না! বন্ধুরা স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর আমি মাঠের পথে হাঁটছি কাদা মাড়িয়ে।

কিন্তু আজ বুঝি, সেই বিরক্তিকর কাজের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা।

খাবার পৌঁছে দিয়ে অনেক সময় আমি তাদের সঙ্গে বসেই খেয়ে নিতাম। সাধারণ খাবার—ভাত, ডাল, আলুভর্তা, শাক কিংবা মাছের ঝোল—কিন্তু সেই খাবারের স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি। কারণ সেখানে ছিল পরিশ্রমের ঘ্রাণ, ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ, আর একধরনের অকৃত্রিম ভালোবাসা। কেউ আলাদা ছিল না, ছোট-বড়র বিভেদ ছিল না—ছিল শুধু মানুষ আর মানুষের টান।

মাঠে কাজের সময় আরেকটি জিনিস আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত—লোকসংগীত। দলবেঁধে কাজ করতে করতে তারা গান ধরতেন। সেই গানের নাম ছিল “ধুও গান”। আজকের প্রজন্ম হয়তো এই নামটাও শোনেনি। কিন্তু সেই গান ছিল মাঠের প্রাণ।

ধান কাটার সময়, পাট তোলার সময় কিংবা আখ মারাই করার সময়—একসাথে কণ্ঠ মেলানো সেই ধুও গান যেন ক্লান্ত শরীরে নতুন শক্তি এনে দিত। গানের সুর ভেসে যেত এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে। দূর থেকে শুনলেও মনে হতো, যেন পুরো গ্রাম একসাথে শ্বাস নিচ্ছে।

সেই গান শুধু বিনোদন ছিল না, ছিল সম্পর্কের বন্ধন। গান গাইতে গাইতে কাজ করলে ক্লান্তি কম লাগত, মন ভালো থাকত, আর কাজের গতি বেড়ে যেত। আজকের দিনে যেখানে মানুষ পাশাপাশি থেকেও একে অপরকে চেনে না, সেখানে সেই সময়ে মানুষ কাজ করতে করতেই একে অপরের জীবন জেনে ফেলত।

আমার মেজ ভাইয়ের বয়সী যারা তখন মাঠে কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই আজ আর এই পৃথিবীতে নেই। কেউ চলে গেছেন বার্ধক্যে, কেউ অসুস্থতায়, কেউবা সময়ের নির্মম নিয়মে হারিয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের হাসি, তাদের কণ্ঠ, তাদের শ্রম আর তাদের সহজ সরল জীবন আজও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত।

আজ যখন সেই গ্রামের পথে হাঁটি, সেই জমির আইল ধরে এগোই, বারবার মনে হয়—এই তো একটু আগে মেজ ভাই আর তাঁর সাথীরা এখানে কাজ করছিলেন। কেউ লাঙল ধরেছে, কেউ ধান বেঁধে রাখছে, কেউ আবার গান ধরেছে—“ও ভাইরে ধান কাটিতে যাই…”

হঠাৎ মনে পড়ে—না, এসব এখন শুধু কল্পনা। বাস্তব বদলে গেছে।

আজকের গ্রামে সেই আগের সম্প্রীতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মানুষ ব্যস্ত, সম্পর্ক সীমিত, সময় সংকুচিত। কৃষিকাজেও এসেছে যন্ত্রের আধিপত্য। ট্রাক্টর, হারভেস্টার, মেশিন—সবকিছু দ্রুত হচ্ছে, কিন্তু কোথাও যেন সেই মানবিক উষ্ণতা কমে গেছে।

আগে মাঠে কাজ মানে ছিল দলবদ্ধতা, এখন তা একাকীত্ব। আগে একজনের সুখে দশজন খুশি হতো, একজনের দুঃখে পুরো গ্রাম পাশে দাঁড়াত। এখন মানুষ পাশের বাড়ির খবরও অনেক সময় জানে না।

তবুও স্মৃতি বড় আশ্চর্য জিনিস।

সে কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। হঠাৎ এক বিকেলের হাওয়ায়, পুরোনো কোনো গানের সুরে, কিংবা মাটির গন্ধে—সেই দিনগুলো ফিরে আসে। মনে করিয়ে দেয়, আমরা কোথা থেকে এসেছি।

আমি প্রায়ই ভাবি—যে সময় চলে যায়, সে কি সত্যিই চলে যায়? নাকি আমাদের ভেতরেই থেকে যায় অন্য এক রূপে?

আমার কাছে মনে হয়, শৈশব কখনও শেষ হয় না। শুধু মানুষ বড় হয়ে যায়।

আজ জীবনের এই শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে যখন পিছনে তাকাই, তখন সেই দিনগুলোকে আর কষ্টের মনে হয় না। বরং মনে হয়—সেই ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। তখন টাকা কম ছিল, কিন্তু ভালোবাসা বেশি ছিল। সুযোগ কম ছিল, কিন্তু সম্পর্ক গভীর ছিল। ক্লান্তি ছিল, কিন্তু মানসিক শান্তিও ছিল।

আজ আমরা অনেক আধুনিক হয়েছি, কিন্তু হয়তো কিছু খুব মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলেছি—মানুষের প্রতি টান, একসাথে থাকার আনন্দ, আর মাটির সঙ্গে সম্পর্ক।

এই স্মৃতিগুলো শুধু আমার একার নয়। আমাদের প্রজন্মের হাজারো মানুষের গল্প এরকমই। হয়তো আপনার জীবনেও এমন কোনো সকাল ছিল, যখন আপনি কারও জন্য খাবার নিয়ে মাঠে গিয়েছেন। হয়তো আপনিও শুনেছেন ধানক্ষেতে ভেসে আসা কোনো লোকগান। হয়তো আপনারও মনে পড়ে সেই হারিয়ে যাওয়া গ্রামের মানুষগুলোকে।

যদি তাই হয়, তবে এই লেখা শুধু আমার নয়—আপনারও।

কারণ স্মৃতি কখনও একার হয় না; স্মৃতি ভাগ করলে তা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে।

যেদিন যায়, সেদিন ভালোই যায়। সামনে কী আছে জানি না। কিন্তু পেছনে যে পথ পেরিয়ে এসেছি, তার ধুলো এখনো পায়ে লেগে আছে। সেই ধুলোর গন্ধই আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের মাঠে।

সেই মাঠে এখন হয়তো আর ধুও গান শোনা যায় না, কিন্তু আমার হৃদয়ে সেই সুর আজও বাজে। ভালোবাসা নিরন্তন।

লেখক: কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ। ২৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি: