বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় একজন নারীর জীবন যেন দুইটি বাড়ির মাঝখানে আটকে থাকা এক দীর্ঘ যাত্রা—একদিকে বাবার বাড়ি, অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দুই বাড়ির কোনটিই কি সত্যিকার অর্থে তার নিজের?
জন্মের পর একটি মেয়ে শিশুকে পরিবারের সবাই ভালোবাসে, আদর করে, বড় করে তোলে। কিন্তু সেই ভালোবাসার আড়ালে ছোটবেলা থেকেই তাকে শুনতে হয়—“তুই তো পরের বাড়ির মানুষ”, “একদিন তো চলে যাবি”, “মেয়েদের আসল বাড়ি শ্বশুরবাড়ি।” এই কথাগুলো এত স্বাভাবিকভাবে বলা হয় যে, মেয়েটি নিজেও একসময় বিশ্বাস করে ফেলে—বাবার বাড়িতে তার অবস্থান সাময়িক।
বিয়ের পর শুরু হয় আরেক অধ্যায়। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন দায়িত্ব। একজন নারী তার স্বপ্ন, অভ্যাস, পরিচয়—সবকিছু বদলে নতুন পরিবারকে আপন করার চেষ্টা করেন। স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, দেবর, ননদ—সবার যত্ন নেওয়াই যেন তার প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সে সংসার চালায়, সন্তান জন্ম দেয়, পরিবারকে ধরে রাখে, কিন্তু অধিকারের প্রশ্নে অনেক সময় সে নীরব দর্শক।
ধরা যাক, একজন নারী বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গেলেন। বহু বছর সংসার করলেন। একটি কন্যা সন্তান জন্ম নিল। সেই সন্তান বড় হলো, বিয়ে হলো। নারীটি নিজের যৌবন, শ্রম, ভালোবাসা সবটুকু এই পরিবারে ঢেলে দিলেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ তার স্বামী হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। তখনই শুরু হলো বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষা।
স্বামী বেঁচে থাকতে তিনি ছিলেন “গৃহিণী”, “বউমা”, “স্ত্রী”। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিচয় বদলে গেল—তিনি এখন “বিধবা”। এই একটি শব্দই সমাজে তার অবস্থানকে অনেকখানি বদলে দেয়।
পরিবারে অনেক মানুষ আছে—দেবর আছে, ননদ আছে, আত্মীয়স্বজন আছে, উপার্জনক্ষম সদস্য আছে। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় এই নারী। তাকে বলা হয়—“তুমি বৃদ্ধ শাশুড়িকে দেখবে, তার জন্য মাসে কিছু টাকা দেওয়া হবে।”
অর্থাৎ, স্বামীর মৃত্যুর পরও তার ভূমিকা যেন সেবাদানেই সীমাবদ্ধ। তাকে একজন মানুষ হিসেবে নয়, একজন ‘দায়িত্ব পালনকারী’ হিসেবেই দেখা হয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তরাধিকার। ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রী ও সন্তানের নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে। যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে, তবে স্ত্রী পান এক-অষ্টমাংশ (১/৮) এবং কন্যা সন্তান একা হলে পায় অর্ধেক (১/২)। কিন্তু বাস্তবে বহু নারী এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।
অনেক পরিবারে বলা হয়—“তুমি তো এই বাড়িতেই থাকছো, আবার সম্পত্তি কেন?” অথবা “মেয়েরা তো বিয়ে হয়ে চলে যায়, জমি নিয়ে কী করবে?” সামাজিক চাপ, মানসিক নির্যাতন, সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়—সব মিলিয়ে অনেক নারী নিজের অধিকার দাবি করতেই সাহস পান না।
একই অবস্থা বাবার বাড়িতেও। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী কন্যা সন্তানেরও পৈতৃক সম্পত্তিতে অংশ আছে। ছেলে সন্তানের তুলনায় তার অংশ কম হলেও, সেটি তার বৈধ অধিকার। কিন্তু বাস্তবে কত মেয়ে বাবার সম্পত্তির অংশ পান?
অনেক সময় ভাইরা বলে—“তোমার তো বিয়েতে অনেক খরচ হয়েছে”, “তোমার স্বামীর বাড়ি আছে”, “মেয়েরা আবার বাপের সম্পত্তি নেয় নাকি?” আর মা-বাবাও অনেক সময় শান্তির জন্য মেয়েকে চুপ থাকতে বলেন।
ফলে একজন নারী দুই দিক থেকেই বঞ্চিত হন—বাবার বাড়ি থেকেও, শ্বশুরবাড়ি থেকেও।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হলো—এই বঞ্চনাকে সমাজ ভাগ্য বলে মেনে নিতে শেখায়। যখন একজন বিধবা নারী কাঁদতে কাঁদতে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন, তখন অনেকেই বলেন—“এটা তোর কপালের লিখন”, “সব আল্লাহর ইচ্ছা”, “নারীর জীবন এমনই।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যিই ভাগ্য, নাকি সমাজের তৈরি অন্যায়?
ধর্ম কখনও নারীর অধিকার অস্বীকার করেনি; বরং ইসলামে নারীর উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ, মর্যাদা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সমস্যা ধর্মে নয়, সমস্যা আমাদের সামাজিক ব্যাখ্যায়।
আমরা ধর্মের নাম বলি, কিন্তু অধিকার দিই না। আমরা সম্মানের কথা বলি, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিই না। আমরা মাকে জান্নাতের দরজা বলি, কিন্তু সেই মাকেই বৃদ্ধ বয়সে আশ্রয়হীন করে দিই।
যে নারী সারাজীবন অন্যের জন্য বেঁচে থাকেন, শেষ বয়সে তার নিজের জন্য একটি নিরাপদ ঘরও থাকে না—এটি শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামাজিক অন্যায়।
অনেক ক্ষেত্রে কন্যা সন্তানই হয়ে ওঠে মায়ের শেষ আশ্রয়। মেয়ে বলে—“মা আমার সঙ্গে থাকবে।” কিন্তু তখনও সমাজ বাধা দেয়—“চল্লিশ দিন আগে যাবে না”, “মানুষ কী বলবে”, “শ্বশুরবাড়ির নিয়ম আছে।”
অর্থাৎ মৃত্যুর পরও একজন নারীর স্বাধীনতা পুরোপুরি তার নিজের নয়।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। শিক্ষা, চাকরি, নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু ঘরের ভেতরের এই নীরব বঞ্চনা এখনও রয়ে গেছে। একজন নারী যদি নিজের উত্তরাধিকার, নিজের আশ্রয়, নিজের মর্যাদা না পান—তবে সেই ক্ষমতায়ন কতটা পূর্ণ?
প্রয়োজন শুধু আইন নয়, সচেতনতা। পরিবারকে বুঝতে হবে—মেয়ের সম্পত্তির অংশ দান নয়, অধিকার। বিধবা পুত্রবধূকে আশ্রয় দেওয়া দয়া নয়, মানবিক দায়িত্ব। একজন নারীর সম্মান তার বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না।
বাবার বাড়ি যেন মেয়ের জন্য চিরদিনের আশ্রয় থাকে, আর শ্বশুরবাড়ি যেন শুধু কর্তব্যের জায়গা না হয়ে সত্যিকারের আপন ঠিকানা হয়—এই মানসিক পরিবর্তন জরুরি।
একজন নারীকে “পরের বাড়ির মানুষ” বলা বন্ধ করতে হবে। কারণ নারী কারও ‘পর’ নয়—সে পরিবার গড়ে, সম্পর্ক ধরে, প্রজন্ম তৈরি করে। তার অধিকার করুণা নয়, ন্যায্য প্রাপ্য।
যে সমাজ নারীর কান্নাকে ভাগ্য বলে চুপ করিয়ে দেয়, সেই সমাজ কখনও সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
আজ সময় এসেছে প্রশ্ন করার—একজন নারীর নিজের বাড়ি কোথায়?
যদি উত্তর না থাকে, তবে আমাদের সমাজ এখনও অসম্পূর্ণ।