গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রের “চতুর্থস্তম্ভ ” বলা হয়। আইনসভা , নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগেরপাশাপাশি গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রেরজবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালীমাধ্যম হিসেবে কাজ করে। একটিরাষ্ট্রে ন্যায় , স্বচ্ছতা , সুশাসন এবং জনস্বার্থ রক্ষায়গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মী বা সাংবাদিক কেবলসংবাদ সংগ্রহকারী নন ; তিনি সমাজেরবিবেক , মানুষের কণ্ঠস্বর এবং সত্য প্রতিষ্ঠারএকজন নির্ভীক সৈনিক।
একজন সাংবাদিকের কাজের ধরন বহুমাত্রিক। তিনিসমাজ , পরিবার এবং রাষ্ট্রের প্রচলিতআইন , প্রশাসনিক কাঠামো এবং সামাজিক বাস্তবতাপর্যবেক্ষণ করেন। কোথায় অন্যায় হচ্ছে , কোথায় দুর্নীতি বাসা বাঁধছে , কোথায়সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে —এসব বিষয় খুঁজেবের করে জনগণের সামনেতুলে ধরেন। তিনি তথ্য সংগ্রহকরেন , উপাত্ত যাচাই করেন এবং নিরপেক্ষভাবেতা প্রিন্ট , ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মাধ্যমেপ্রকাশ করেন। এই কারণেই গণমাধ্যমকেশুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমনয় , বরং গণতন্ত্র রক্ষারএকটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা সব সময় আদর্শেরমতো থাকে না। যখনএকজন গণমাধ্যম কর্মী সত্যের পথ থেকে সরেগিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলেরপ্রভাব বা ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়কাজ করতে শুরু করেন , তখন প্রশ্ন ওঠে —গণমাধ্যম কিসত্যিই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে তার মর্যাদা ধরেরাখতে পারছে ? তখন সংবাদ আরজনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না ; বরংতা হয়ে ওঠে প্রভাবশালীদেরহাতিয়ার। এই অবস্থায় গণমাধ্যমেরপ্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবংসমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরওস্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে দেখাযায় , গণমাধ্যম মালিকরা সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা , বেতন , পেশাগত মর্যাদা কিংবা স্বাধীনতা দেন না। সাংবাদিকরাতখন বাধ্য হয়ে নানা চাপেরমধ্যে কাজ করেন। একজনসংবাদকর্মী যখন নিজের পরিবারেরমৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিমখান , তখন তার পক্ষেআদর্শ সাংবাদিকতা ধরে রাখা কঠিনহয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক দুর্বলতা অনেক সময় নৈতিকদুর্বলতার জন্ম দেয়। এইসুযোগে কিছু অসাধু ব্যক্তিও গোষ্ঠী সাংবাদিকদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থহাসিলের চেষ্টা করে।
এখানে মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষের সম্পর্কটিঅত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পত্রিকার মালিক মালিকই থাকেন , আর সাংবাদিকরা হচ্ছেনকলম শ্রমিক। এই “কলম শ্রমিক ” শব্দটির মধ্যে রয়েছে পরিশ্রম , মেধা , দায়িত্ব এবং ত্যাগের ইতিহাস।একজন সাংবাদিক প্রতিদিন মাঠে ঘুরে তথ্যসংগ্রহ করেন , ঝুঁকি নেন , সত্য উদঘাটনেরজন্য সংগ্রাম করেন। তার শ্রমেই একটিসংবাদপত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় , একটিটেলিভিশনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে , একটি অনলাইন পোর্টালেরঅবস্থান শক্ত হয়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এইকলম শ্রমিকরা তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন পান না। মালিকপক্ষঅনেক সময় প্রতিষ্ঠানের আর্থিকলাভ , রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক নিরাপত্তাকে সাংবাদিকতার নীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।ফলে সংবাদকর্মীরা হয়ে পড়েন চাপেরশিকার। কোনো খবর প্রকাশকরতে হবে , কোন খবরচেপে যেতে হবে , কাকেসমর্থন করতে হবে , কাকেআঘাত করতে হবে —এসবসিদ্ধান্ত অনেক সময় সম্পাদকীয়নীতির ভিত্তিতে নয় , বরং মালিকেরস্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
এই পরিস্থিতি সাংবাদিকতার মূল আদর্শের সঙ্গেসাংঘর্ষিক। সাংবাদিকতার মূলনীতি হওয়া উচিত সত্য , ন্যায় , নিরপেক্ষতা এবং জনস্বার্থ। তোষামোদনয় , বরং ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাইএকজন সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব। ক্ষমতাবানদের প্রশংসা করে ব্যক্তিগত সুবিধানেওয়া নয় , বরং ক্ষমতারঅপব্যবহার হলে তা জনগণেরসামনে তুলে ধরাই প্রকৃতসাংবাদিকতা।
বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অনেকগণমাধ্যমকর্মী এই পেশায় প্রবেশকরছেন। এটি অবশ্যই ইতিবাচকদিক। তবে উদ্বেগের বিষয়হলো , অনেকেই সাংবাদিকতাকে সমাজসেবা বা সত্য প্রতিষ্ঠারপেশা হিসেবে নয় , বরং ক্ষমতাবানদেরকাছে যাওয়ার শর্টকাট পথ হিসেবে দেখছেন।তারা প্রভাবশালীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ব্যক্তিগতসুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে সাংবাদিকতা পেশারসম্মান ক্ষুণ্ন হয় এবং রাষ্ট্রেরচতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসারজন্য প্রথমেই প্রয়োজন গণমাধ্যম মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ ব্যবসানয় ; এটি একটি সামাজিকদায়িত্ব। তাই মালিকদের উচিতসাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন , নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতানিশ্চিত করা। একজন সাংবাদিকযদি সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন , তবেতিনি অধিক সাহসের সঙ্গেসত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত , সাংবাদিকদের নিজেদেরও আত্মসমালোচনা করতে হবে। শুধুমাত্রপ্রেস কার্ড , পরিচয় বা সামাজিক প্রভাবেরজন্য এই পেশায় থাকাউচিত নয়। একজন সাংবাদিককেজানতে হবে —তিনি কেবলনিজের জন্য কাজ করছেননা ; তিনি সমাজের জন্যকাজ করছেন। তার একটি লেখামানুষের জীবন বদলে দিতেপারে , একটি প্রতিবেদন দুর্নীতিরমুখোশ খুলে দিতে পারে , একটি অনুসন্ধান রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার মুখে দাঁড় করাতেপারে।
তৃতীয়ত , সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও শক্তিশালী হতেহবে। কলম শ্রমিকদের অধিকাররক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা জরুরি। সাংবাদিকদের ন্যায্য মজুরি , চাকরির নিরাপত্তা , আইনি সুরক্ষা এবংপেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মতৈরি করতে হবে। সাংবাদিকযদি নিজের পেশায় নিরাপদ না থাকেন , তবেতিনি জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে কীভাবে কথা বলবেন ?
চতুর্থত , পাঠক ও দর্শকদেরওসচেতন হতে হবে। মানুষকেবুঝতে হবে কোন গণমাধ্যমসত্য বলছে , আর কোনটি স্বার্থেরকাছে বিকিয়ে যাচ্ছে। জনগণের সচেতনতা গণমাধ্যমকে সঠিক পথে রাখারবড় শক্তি। কারণ শেষ পর্যন্তগণমাধ্যমের শক্তি জনগণের আস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।
পঞ্চমত , রাষ্ট্রকেও স্বাধীন গণমাধ্যমের গুরুত্ব বুঝতে হবে। সরকার যদিসমালোচনাকে শত্রুতা মনে করে , তবেগণতন্ত্র দুর্বল হয়। বরং সমালোচনাকেসংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। স্বাধীনসাংবাদিকতা রাষ্ট্রের শত্রু নয় ; বরং একটিসুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার সহায়ক শক্তি।
সাংবাদিকতা কোনো তোষামোদের পেশানয় , এটি সত্যের পক্ষেদাঁড়ানোর শপথ। একজন সাংবাদিকেরকলম মানুষের অধিকার রক্ষার অস্ত্র। সেই কলম যদিবিক্রি হয়ে যায় , তবেসমাজ অন্ধকারে হারিয়ে যায়। আর যদি সেইকলম সত্যের পক্ষে থাকে , তবে রাষ্ট্র আলোরপথে এগিয়ে যায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে , রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ কথাটি শুধু একটি অলংকারনয় ; এটি একটি দায়িত্ব , একটি নৈতিক অবস্থান। এই মর্যাদা অর্জনকরতে হলে গণমাধ্যম মালিক , সাংবাদিক এবং সমাজ —সকলকেইনিজ নিজ জায়গা থেকেসৎ হতে হবে। মালিককেবুঝতে হবে তিনি শুধুব্যবসায়ী নন ; তিনি একটিসামাজিক প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। সাংবাদিককে বুঝতে হবে তিনি শুধুকর্মচারী নন ; তিনি সমাজেরবিবেক। আর জনগণকে বুঝতেহবে সত্যের পক্ষে থাকা গণমাধ্যমকে সমর্থনকরাই তাদের দায়িত্ব।
আজ সময় এসেছে সবভুলে গিয়ে সাংবাদিকতার প্রকৃত নীতির কাছে ফিরে যাওয়ার।ন্যায় , সত্য , সাহস এবং দায়িত্ব —এই চার ভিত্তিরওপর দাঁড়িয়েই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। কলমশ্রমিকদের মর্যাদা দিতে হবে , মালিকদেরজবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবংসাংবাদিকতার আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
যেদিন সাংবাদিকরা সত্যের সঙ্গে আপস করবেন না , যেদিন গণমাধ্যম মালিকরা পেশাকে ব্যবসার চেয়ে দায়িত্ব হিসেবে দেখবেন , যেদিন জনগণ সত্যভিত্তিক সংবাদকেমূল্য দেবে —সেদিনই “গণমাধ্যমরাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ” এই মহান বাক্যটিসত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই দিনের প্রত্যাশায় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
লেখক : কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ। ২৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি: