বিজ্ঞাপন

তামাক কোম্পানির প্রলোভন ঠেকাতে কঠোর আইনের দাবী

  • বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তামাক কোম্পানির আইনবিরোধী প্রচারণা, ই-সিগারেট ও নতুন নিকোটিন পণ্যের বিস্তার রোধে কঠোর আইনী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকরা।
  • তারা বলেন, কিশোর-তরুণদের লক্ষ্য করে তামাক কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে আসক্তি বাড়াচ্ছে।
  • এজন্য বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধে জরুরি..।
তামাক কোম্পানির প্রলোভন ঠেকাতে কঠোর আইনের দাবী
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ উপলক্ষে তামাক কোম্পানির প্রলোভন বন্ধে কঠোর আইনী পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও তামাকবিরোধী আন্দোলনের নেতারা। তারা বলেছেন, তামাক কোম্পানিগুলো নতুন নতুন কৌশলে শিশু-কিশোর ও তরুণদের নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে ই-সিগারেট, ভেপ ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন পণ্যকে আকর্ষণীয় ডিজাইন, রং ও ফ্লেভারের মাধ্যমে বাজারজাত করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠছে।

রবিবার (২৪ মে) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে তামাকবিরোধী সংগঠন ‘মানস’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী। তিনি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

সংবাদ সম্মেলনে অতিথি আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানসের সহ-সভাপতি ও অভিনেত্রী রুমানা রশীদ ঈশিতা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, ইউনিকো হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদ্রা কুরিয়েন এবং মানসের সাংগঠনিক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান তালুকদার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মানসের সাধারণ সম্পাদক ও কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ। সঞ্চালনা করেন মানসের সিনিয়র প্রজেক্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার মো. আবু রায়হান।

বিজ্ঞাপন

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, দেশে তামাক উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকার স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি হয়, যেখানে এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় মাত্র ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্ষতির পরিমাণ রাজস্ব আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। তিনি বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো এখন শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। আকর্ষণীয় মোড়ক, বিভিন্ন ফ্লেভার ও আধুনিক ডিজাইনের মাধ্যমে তরুণদের নেশায় আসক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের ৪৬টি দেশে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ এবং ৮২টি দেশে কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাংলাদেশে ই-সিগারেট, ভেপ ও নিকোটিন পাউচের মতো ইমার্জিং তামাক পণ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, নাটক, চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজে ধূমপান ও মাদক সেবনের দৃশ্যকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে কিশোর-তরুণরা ভুল বার্তা পাচ্ছে এবং নেশার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।

অভিনেত্রী রুমানা রশীদ ঈশিতা বলেন, তামাকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। সমাজের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও তারকাদের তরুণদের সুস্থ ও নেশামুক্ত জীবনে উদ্বুদ্ধ করতে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি তামাকবিরোধী আন্দোলনে গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি অঙ্গনের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

ইউনিকো হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদ্রা কুরিয়েন বলেন, চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য বহু রোগ ও অকালমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, দেশে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ ও ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার অন্যতম কারণ তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। তিনি জানান, চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সিগারেট কোম্পানিগুলো নতুন আর্টিফিশিয়াল নিকোটিন পণ্য বাজারে আনছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের মূল্য অত্যন্ত কম। যেখানে একটি ডিমের দাম ১০ টাকার বেশি, সেখানে ৫ টাকায় জর্দা, গুল বা সিগারেট পাওয়া যায়। তাই তামাকপণ্যে উচ্চ কর ও মূল্য বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মত দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলন থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— ই-সিগারেট ও নতুন তামাক পণ্যে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা, নাটক-চলচ্চিত্র ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ধূমপানের দৃশ্য বন্ধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বন্ধ, তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, তামাকপণ্যে উচ্চ কর আরোপ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম বৃদ্ধি, বিকল্প কৃষি চাষে কৃষকদের উৎসাহ প্রদান এবং জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ।

বক্তারা জানান, বিশ্বে প্রতি বছর তামাকের কারণে প্রায় ৮৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর ৩১ মে বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ পালন করা হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা— “Unmasking the Appeal: Countering Nicotine & Tobacco Addiction”, যার বাংলা ভাবানুবাদ— “প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি।”

বিজ্ঞাপন