নড়াইলকণ্ঠ : শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নড়াইলে উদযাপিত হয়েছে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। সোমবার (১০ আগস্ট) দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নন্দিত এই শিল্পীকে স্মরণ করেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিশু-কিশোর ও সুলতানপ্রেমীরা। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়।
সকালে নড়াইল শহরের মাছিমদিয়া এলাকায় অবস্থিত এস এম সুলতান কমপ্লেক্সে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সমাগম ঘটে। শিল্পীর জন্মভিটাকে সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে এই কমপ্লেক্স।
সকালবেলায় কোরআনখানি ও দোয়ার মধ্যদিয়ে জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে শিল্পীর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আয়োজিত শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল সালাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূর-ই-আলম সিদ্দিকী, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিসহ শিল্পী সুলতানের ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন।
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় শিল্পীর সমাধিসৌধ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। পরে শিল্পীর আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় সুলতানের শিল্পভাবনা:
এরপর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘এস এম সুলতান: জীবনঘনিষ্ঠ ও সমাজ বাস্তবতার শিল্পী’ শীর্ষক মূল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক আব্দুল হালিম চঞ্চলের স্বাগত বক্তব্যের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক রেজা আসাদ আল হুদা অনুপম মূল আলোচক এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের প্রাক্তন প্রধান বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাস আলোচক হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে চারুকলায় বিশেষ অবদানের জন্য খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী ও অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সাত্তারকে ঐতিহ্যবাহী ‘সুলতান সম্মাননা পদক ২০২৬’ প্রদান করা হয়। পদক প্রদানের আগে সম্মাননাপ্রাপ্ত শিল্পীর জীবন ও কর্মের ওপর একটি বিশেষ ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা, নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম এবং নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনের ধন্যবাদ জ্ঞাপন এবং পরবর্তীতে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
শিশুদের রং-তুলিতে সুলতানকে স্মরণ
জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। শিল্পী এস এম সুলতানের হাতে গড়ে ওঠা শিশুদের চারুশিল্প চর্চার প্রতিষ্ঠান ‘শিশুস্বর্গ’-এর আয়োজনে প্রতিযোগিতায় প্রায় দুইশ ক্ষুদে শিল্পী অংশ নেয়।
শিশুরা রং ও তুলির বর্ণিল আঁচড়ে নিজেদের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে শিল্পী সুলতান, নদী-বেষ্টিত গ্রামবাংলা, প্রকৃতি, ফুল, ফসলের মাঠসহ নানা বিষয়। শিশুদের চিত্রকর্মে গ্রামীণ জীবন ও বাংলার প্রকৃতির প্রতি তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
আয়োজকদের মতে, শিশুদের মধ্যে চিত্রকলার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং শিল্পী সুলতানের শিল্পভাবনা ও গ্রামীণ জীবনকেন্দ্রিক সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করাই এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কৃষক ও গ্রামীণ জীবন ছিল সুলতানের শিল্পের প্রধান অনুষঙ্গ
এস এম সুলতানের চিত্রকলায় বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের জীবন, কৃষকের শ্রম, প্রকৃতি ও মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর চিত্রকর্মে কৃষককে দুর্বল বা অসহায় হিসেবে নয়, বরং শক্তিশালী ও কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
এই স্বতন্ত্র শিল্পদর্শনের কারণে তিনি বাংলাদেশের চিত্রকলায় একটি আলাদা অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর শিল্পকর্ম দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর আঁকা ছবি লন্ডনের বিভিন্ন গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয় এবং আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়। পরবর্তীতে তাঁর শিল্পকর্ম বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের কাজের সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতেও স্থান পায়।
জন্ম ও কর্মজীবন
শিল্পী এস এম সুলতানের পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। তিনি ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল শহরের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘লাল মিয়া’।
শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে শিল্পচর্চার মাধ্যমে তিনি নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টি করেন। বাংলার কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের জীবন তাঁর শিল্পকর্মের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
দেশের শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন।
দীর্ঘদিন নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভোগার পর ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তবে মৃত্যুর পরও তাঁর শিল্পকর্ম, দর্শন ও নড়াইলের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তাঁকে মানুষের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে। প্রতিবছর তাঁর জন্মদিনে নড়াইলে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও শিল্পভাবনা তুলে ধরা হয়।
শিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকীর আয়োজন তাই শুধু একজন বরেণ্য শিল্পীকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বাংলার মাটি, মানুষ, কৃষক ও গ্রামীণ জীবনের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ারও একটি প্রয়াস।