স্বৈরাচারের পতনের পরও কি স্বৈরাচারী মানসিকতার অবসান ঘটে? পরিবর্তনের ভেতরে আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা
ইতিহাস আমাদের বারবার একটি শিক্ষা দিয়েছে—কোনো ব্যক্তি, দল বা শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই পতনের পর নতুন সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়াবে তা নিশ্চিত করা। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি তখনই ঘটে, যখন একটি স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ার পর একই মানসিকতা নতুন রূপে ফিরে আসে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। কেউ এটিকে গণঅভ্যুত্থান বলেছেন, কেউ স্বৈরাচারের পতন, আবার কেউ রাজনৈতিক পালাবদলের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো আমাদের সামনে নতুন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর কোথাও কোথাও প্রতিশোধ, দখল, প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার প্রবণতা দেখা গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী কিংবা স্বাধীন মতপ্রকাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও সংস্কারের নামে ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই প্রবন্ধে একটি কাল্পনিক কিন্তু বাস্তবতা থেকে নেওয়া উদাহরণের মাধ্যমে সেই মানসিকতার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ধরা যাক, একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিদ্যমান কমিটির মেয়াদ শেষ হতে তখন আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময় শেষে নতুন নেতৃত্ব আসার কথা ছিল। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে কিছু মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হলো—বর্তমান কমিটির সবাই আগের শাসনব্যবস্থার সমর্থক, তাই প্রতিষ্ঠানটিকে "স্বৈরাচারমুক্ত" করা জরুরি। শুরু হলো আলোচনা, প্রচারণা এবং শেষ পর্যন্ত একটি পরিবর্তনের উদ্যোগ। প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া কি অন্যায়? অবশ্যই নয়। কিন্তু যে পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়, সেটিই মূল বিষয়। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির উদ্যোগে সাধারণ সদস্যদের নিয়ে সভা ডাকা হলো। সেখানে সংস্কার ও স্বৈরাচারমুক্তির নামে একটি এডহক কমিটি গঠন করা হলো। সাধারণত এ ধরনের কমিটির দায়িত্ব নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করে গণতান্ত্রিক উপায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা। কিন্তু সময় অতিক্রম করেও যদি সেই অস্থায়ী কমিটি স্থায়ী রূপ নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। যে আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, সেই একই আচরণ কি নতুনভাবে ফিরে আসছে না? ইতিহাস বলে, ক্ষমতা মানুষকে পরীক্ষা করে। আর ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে ধীরে ধীরে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তির দিকে নিয়ে যায়, যেসব ভুলের বিরুদ্ধে সে একসময় অবস্থান নিয়েছিল।
একটি প্রতিষ্ঠানে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার জন্য অযোগ্য ব্যক্তিদের সদস্যপদ দেওয়া হয়, যখন উদ্দেশ্য হয় ভারসাম্য নয়, বরং নিজেদের পাল্লা ভারী করা—তখন সেই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের চেয়ে কৌশলী আধিপত্যের কাছাকাছি চলে যায়। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— সংস্কারের নামে যদি পক্ষপাতমূলক সদস্য সংগ্রহ করা হয়, তবে তা আগের অন্যায়ের চেয়ে কতটা ভিন্ন? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা।
গণতন্ত্র কেবল ফলাফলের নাম নয়, এটি একটি প্রক্রিয়ার নাম। যে নির্বাচন মানুষের অংশগ্রহণ, আপত্তি, যাচাই-বাছাই ও সাংগঠনিক বিধিবিধান অনুসরণ করে না, সেই নির্বাচন কাগজে-কলমে বৈধ হলেও নৈতিক বৈধতা হারাতে পারে। কারণ বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা সবসময় এক জিনিস নয়। অনেক সময় দেখা যায়, আবেগ, পরিস্থিতি বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে কিছু মানুষ একটি প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে বসেন। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তারা গঠনতন্ত্র, নিয়ম কিংবা আইনি কাঠামো সম্পর্কে অবগত হন, তখন উপলব্ধি করেন—হয়তো সিদ্ধান্তটি যথেষ্ট বিচক্ষণ ছিল না। এই আত্মসমালোচনার জায়গাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং সেটি একটি পরিণত সমাজের লক্ষণ। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার রাজনীতি নয়, বরং আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি। আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চাই? নাকি আমরা কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তন করতে চাই? আমরা কি জবাবদিহিতা চাই? নাকি জবাবদিহিতামুক্ত নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই? আমরা কি স্বচ্ছতা চাই?
নাকি আমাদের পক্ষের মানুষের ক্ষেত্রে সবকিছু উপেক্ষা করতে চাই?
এই প্রশ্নগুলো শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নয়; বরং পরিবার, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সমিতি, পেশাজীবী সংগঠন—সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
একজন বাবা যদি পরিবারের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী হন, একজন শিক্ষক যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না দেন, একজন সংগঠক যদি সমালোচনা সহ্য করতে না পারেন, একজন নেতা যদি ভিন্নমতকে শত্রু মনে করেন—তাহলে কেবল রাষ্ট্র পরিবর্তনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কারণ গণতন্ত্র কেবল সংসদ ভবনে জন্ম নেয় না; এটি জন্ম নেয় পরিবারে, বিদ্যালয়ে, ক্লাবে, সংগঠনে এবং মানুষের চেতনার ভেতরে। একটি সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে মতবিরোধ থাকবে, সমালোচনা থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু প্রতিশোধ থাকবে না। ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু জবাবদিহিতাও থাকবে। নেতৃত্ব থাকবে, কিন্তু অহংকার থাকবে না। সংস্কার থাকবে, কিন্তু সেটি হবে অংশগ্রহণমূলক এবং স্বচ্ছ। ২০২৪ সালের পরিবর্তন আমাদের সামনে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি নৈতিক পুনর্জাগরণেরও সুযোগ। আমরা চাইলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারি। চাইলে নতুন প্রজন্মের জন্য আরও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারি। চাইলে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি, যেখানে ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে। যেখানে আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা বড় হবে। যেখানে ক্ষমতার চেয়ে নীতি বড় হবে। যেখানে সংখ্যার চেয়ে সত্য বড় হবে। আর যদি আমরা তা না পারি, তাহলে হয়তো ইতিহাস আবারও আমাদের সামনে একই প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়াবে— স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল ঠিকই, কিন্তু স্বৈরাচারী মানসিকতার পতন কি ঘটেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, সিদ্ধান্ত, সততা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক সাহসের ওপর। কারণ একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়, বরং মানুষের বিবেকের পরিবর্তনের মধ্যেই নিহিত।
বি.দ্র.: লেখাটি একটি নৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ হিসেবে রচিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করে।
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ