স্টাফ রিপোর্টার : “নড়াইল সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পাশেই অবস্থিত একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের পর এক প্রসূতির জীবনসংকট, পুনরায় অস্ত্রোপচার এবং শেষ পর্যন্ত জরায়ু অপসারণের অভিযোগ ঘিরে দেখা দিয়েছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, অস্ত্রোপচারে অবহেলা, পরবর্তী চিকিৎসা তদারকির ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রমে অদক্ষ ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করার মতো বিষয় নিয়ে।”
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত ৪ জুলাই নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ি ইউনিয়নের বনগ্রামের বাসিন্দা কামরুজ মোল্যার অন্তঃসত্ত্বা কন্যা সোহানা বেগম (২০) সিজারের জন্য নড়াইল মডার্ন সার্জিক্যাল ক্লিনিক-এ ভর্তি হন। পরিবারের দাবি, অন-কল ভিত্তিতে ডাকা চিকিৎসক ডা. সুব্রত কুমারের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় এবং সোহানা একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন।
পরিবার জানায়, ৮ জুলাই প্রসূতিকে বাড়িতে নেওয়া হয়। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। প্রথমে তাকে নড়াইল সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর জরুরি ভিত্তিতে আট ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়। পরে পুনরায় অস্ত্রোপচার করা হয়। পরিবারের দাবি, সেখানে চিকিৎসকেরা তাদের জানান, আগের অস্ত্রোপচারের সময় ভেতরে নাড়ির একটি অংশ থেকে যাওয়ায় সংক্রমণ ও জটিলতা তৈরি হয়েছে। রোগীর জীবন রক্ষায় শেষ পর্যন্ত তার জরায়ু অপসারণ করতে হয়েছে বলে পরিবার অভিযোগ করেছে। তবে এ বিষয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিখিত চিকিৎসা মতামত এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
সোহানার মা রবেয়া বেগম বলেন, “আমার মেয়ের ১১ দিনের মাথায় রক্তক্ষরণ শুরু হলে ক্লিনিকের মালিককে ফোন করি। তিনি আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেননি। পরে সদর হাসপাতাল থেকে খুলনায় পাঠানো হয়। খুলনায় ডাক্তাররা আট ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করতে বলেন। অপারেশনের পর আমাদের জানানো হয়, আগের অপারেশনের কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। মেয়েকে বাঁচাতে জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছে।”
ঘটনার অনুসন্ধানে ক্লিনিকে গিয়ে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে কর্মরত এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের জানান, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নবম শ্রেণি পর্যন্ত। তার দাবি, চিকিৎসক অপারেশন শেষে চলে যাওয়ার পর রোগীর সেলাই, অ্যানেস্থেসিয়া-সংক্রান্ত সহায়তা, প্রি-অপারেটিভ এবং পোস্ট-অপারেটিভ বিভিন্ন দায়িত্ব তিনি নাকি নিজেই পালন করেন।
যদি এই দাবি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা, রোগীর নিরাপত্তা এবং চিকিৎসা নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে নড়াইল মডার্ন সার্জিক্যাল ক্লিনিক-এর স্বত্বাধিকারী মফিজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,“আমাদের এখানে অপারেশনের কারণে কোনো সমস্যা হলে আমরাই দেখি। তারা খুলনায় গেছে, সেটা আমরা জানি না। আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সত্য নয়।”
এদিকে বৃহস্পতিবার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগের সঙ্গে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রও সংযুক্ত করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। একই অভিযোগ জেলা প্রশাসকের কাছেও পাঠানো হয়েছে। পরিবার জানিয়েছে, দ্রুত প্রতিকার না পেলে তারা আদালতের শরণাপন্ন হবেন।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর জরুরি
• অস্ত্রোপচারে জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি?
• অপারেশনের পর রোগী পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপে কোনো অবহেলা ছিল কি?
• গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রমে অনুমোদনহীন বা অদক্ষ ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেছেন কি?
• ক্লিনিকটি লাইসেন্সের শর্ত ও জনবল কাঠামো মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি?
• রোগীর জটিলতার প্রকৃত কারণ কী—তা কি স্বাধীন মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে?
স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার
নিরাপদ মাতৃত্ব এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ উঠলে তা কেবল একটি পরিবারের ক্ষতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, জবাবদিহি এবং মানবাধিকারেরও প্রশ্ন। তাই ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।