স্টাফ রিপোর্টার : নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ১৮০ দিনের সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার সাহিত্যচর্চার অংশ হিসেবে জেলা সরকারি গ্রন্থাগার নড়াইলে সোমবার (২০ জুলাই) সকালে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাহিত্য আড্ডা’। অনুষ্ঠানে ‘সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ প্রেক্ষাপট নড়াইল’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চারণকবি মো. রওশন আলী। অনুষ্ঠান শেষে পরিবেশিত হয় নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী অষ্টক গান। সভাপতিত্ব করেন জেলা সরকারি গ্রন্থাগারের জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান (ইনচার্জ) মাসুদ রানা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কবি-সাংবাদিক সৈয়দ খায়রুল আলম।
প্রবন্ধে চারণকবি মো. রওশন আলী বলেন, সংস্কৃতি হলো একটি সমাজের সামগ্রিক জীবনযাত্রার রূপ। মানুষের ভাষা, চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, শিল্পকলা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, আচার-অনুষ্ঠান, সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, দর্শন, বিজ্ঞান-সবকিছু মিলেই সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় গড়ে ওঠে।
তিনি বলেন, লোক সংস্কৃতিই জাতীয় সংস্কৃতির শেকড়। সংস্কৃতির বিভাজন একটি ষড়যন্ত্র; বরং জাতির ঐতিহ্যমন্ডিত কর্মকান্ডসমূহকে বিলুপ্তির যাত্রাপথে নিয়ে এসেছে। সংস্কৃতি মানুষের জীবনযাত্রার নিয়ম-পদ্ধতি, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, উৎসব-অনুষ্ঠান, ধর্মকর্ম, শিক্ষাদীক্ষা, খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ এবং সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, দর্শন, বিজ্ঞানসহ মানস ফসলের সমষ্টি।
তিনি আরও বলেন, ক্রীড়া, সাহিত্য, সংগীত ও লোকঐতিহ্যের বিচারে নড়াইল ঈর্ষণীয় অবস্থানে রয়েছে। ক্রিকেটে বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নয়নের যাত্রায় নড়াইলের ক্যাপ্টেন মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার নেতৃত্ব ও অবদান সর্বাগ্রে বিবেচিত হয়। সংগীতে নজরুলসংগীতের অমর সুরকার কমল দাশগুপ্ত, কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত তবলাবাদক প্রতাপচন্দ্র্র ভট্টাচার্য, কবিগানের দিকপাল বিজয় সরকার, জারিগানের ছন্দযাদুকর মোসলেম উদ্দিন, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, পটচিত্র শিল্পী নিখিল চন্দ্র দাস, রূপান্তরের মাধ্যমে পটগানকে দেশ-বিদেশে পরিচিত করা স্বপন কুমার গুহ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ এবং সৈয়দ নওশের আলীসহ অসংখ্য কৃতিসন্তান নড়াইলের গৌরবকে সমৃদ্ধ করেছেন।
প্রবন্ধে তিনি আধুনিকতার নামে সাংস্কৃতিক বিচ্যুতির সমালোচনা করে বলেন, মানুষ নতুনের প্রতি আকৃষ্ট হলেও জাতিগত মৌলিক উপাদান থেকে বিচ্যুত হওয়ায় সমাজে অসংগতিপূর্ণ সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হচ্ছে। শেকড় ছিঁড়ে গেলে যেমন গাছ উপড়ে যায়, তেমনি সংস্কৃতির মৌলিক ভিত্তি থেকে সরে গেলে একটি জাতি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। তাই সুস্থ, মৌলিক ও সঠিক সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানবিক, নৈতিক ও উদার সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন নড়াইল জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি ‘বর্ষায় নজরুল’ বিষয়ক বক্তব্যে বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতা ও বিদ্রোহী চেতনাই আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ছায়েম আলি খান। তিনি বলেন,“যা করলে মানুষ শান্তি ও স্বস্তি পায়, সেটাই তার সংস্কৃতি।”
তিনি আরও বলেন, পরিবার, মহল্লা ও সমাজে জন্মলগ্ন থেকে যে জীবনাচার, অভ্যাস ও চর্চা মানুষ বহন করে সেটিই তার সংস্কৃতি। একজন মাঝি নৌকা বাইতে বাইতে গান গেয়ে যে শক্তি ও অনুপ্রেরণা পান, সেটিও এই জনপদের সংস্কৃতির অংশ।
বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রূপান্তরের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ বলেন, নড়াইলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি শিল্পাচার্য এস এম সুলতানের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। পাশাপাশি ‘অষ্টক গান’-এর উৎপত্তি ও ইতিহাসকে জাতীয় পর্যায়ে গবেষণার আওতায় আনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নড়াইলের গুণীজনদের নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে পারলে তাদের অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও জীবন্ত হয়ে থাকবে।
কারণ কবি বিজয় সরকার ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক এস. এম. আকরাম শাহীদ বলেন, নড়াইল একটি সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চল। এই ঐতিহ্য রক্ষা ও লালন করার দায়িত্ব নড়াইলবাসীরই।
নড়াইলের কৃতিসন্তান কবি হুসাইন বিল্লাহ অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের অমর সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করে উপস্থিত দর্শক- শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।
আলোচনায় অংশ নেন- বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মীনা রাজীব আহম্মদ, নড়াইলকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান, কবি ইমরান, যাত্রা অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুর রহমান, কবি আবু আক্কাছসহ আরও অনেকে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা সরকারি গ্রন্থাগারের জুনিয়র লাইব্রেরিয়ান (ইনচার্জ) মাসুদ রানা বলেন, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বইমুখী এবং ঐতিহ্য সচেতন করে গড়ে তোলাই এ ধরনের আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী অষ্টক গান পরিবেশিত হয়। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় লোকঐতিহ্যের এই অনন্য ধারাটি উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
প্রবন্ধে উঠে আসা নড়াইলের গৌরব
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ, শিল্পাচার্য এস এম সুলতান , কবিয়াল বিজয় সরকার, জারি সম্রাট মোসলেম উদ্দিন, নিহাররঞ্জন গুপ্ত, ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা, সৈয়দ নওশের আলী, সুরকার কমল দাশগুপ্ত, প্রতাপচন্দ্র ভট্টাচার্য, নিখিল চন্দ্র দাস, স্বপন কুমার গুহ।