আজ ৫ মে ২০২৬, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ এস বি এম মিজানুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। স্বাধীনতার সূচনালগ্নে যাঁরা জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন এই তরুণ প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
১৯৭১ সালে তিনি পিরোজপুর মহকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট (ট্রেজারি অফিসার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই তিনি স্থানীয় জনগণ, পুলিশ বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতাদের সংগঠিত করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে পিরোজপুরে স্বাধীনতার চেতনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
১৭ এপ্রিল ১৯৭১, মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের দিনই তিনি সাহসী এক ঘোষণা দেন—পিরোজপুর মহকুমাকে স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণা ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় পর্যায়ে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং সম্ভাব্য শত্রু আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকতে বলেন।
তখন পর্যন্ত পিরোজপুর শত্রুমুক্ত থাকলেও ৫ মে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিমান ও গানবোটের সমন্বয়ে ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। সীমিত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিজানুর রহমান ও তাঁর সহযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও আধুনিক অস্ত্রের মুখে সেই প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
এই দিনই তিনি নিখোঁজ হন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন। পরে তাঁকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয় এবং নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তাঁর মরদেহ আজও পাওয়া যায়নি।
সাইফ মিজানুর রহমানের জন্ম নড়াইলে এক রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর মাতুল সৈয়দ নওশের আলী ছিলেন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার স্পিকার ও মন্ত্রী। বাবা আফসার উদ্দীন আহমেদ ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মা মতিয়া আহমেদও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও আগ্রহী ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং কারাবরণও করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের সদস্যও ছিলেন।
পরে তিনি অধ্যাপনা পেশায় যোগ দেন এবং সিএসএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। যদিও রাজনৈতিক কারণে চাকরি পেতে বাধা সৃষ্টি হয়, তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। জীবনের নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাদেশিক প্রশাসনে দায়িত্ব নেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বিবাহিত, তবে তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস এবং আত্মত্যাগ আজও বাংলাদেশের প্রতিটি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
শহীদ এস বি এম মিজানুর রহমান কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন না—তিনি ছিলেন স্বাধীনতার এক নির্ভীক সৈনিক, যাঁর আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শহীদ মিজানুর রহমান এঁর ৫৫তম মৃত্যুবার্ষিকী: পিরোজপুরে স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে আত্মত্যাগের মহাকাব্য
- মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ এস বি এম মিজানুর রহমান এঁর আজ মৃত্যুবার্ষিকী।
- ১৯৭১ সালের উত্তাল সময়ে পিরোজপুরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধের অনন্য দৃষ্টান্ত।
- পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ৫ মে তিনি নিখোঁজ হন, পরে শহীদ হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।