সাংবাদিকতার পরিচয়ের সংকট: নিবন্ধন, জবাবদিহি ও মূলধারার গণমাধ্যমের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ "মাঠে-ময়দানে কাজ করার সময় দশজন সাংবাদিক পাওয়া যায় না। নির্বাচনের সময় এলে জেলা ও উপজেলা পর্যায় দেখা যায় দুই-তিনশো সাংবাদিক। কেউ কেউ ফেসবুক পেইজের নামেও পাস নেন।"আজ একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা এই মন্তব্যটি হয়তো আবেগের বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু এর ভেতরে সাংবাদিকতা পেশার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশে গত এক দশকে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইউটিউব চ্যানেল এবং ফেসবুকভিত্তিক কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম দ্রুত বেড়েছে। এই পরিবর্তন তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, নাগরিক সাংবাদিকতার সুযোগও তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠিত সম্পাদকীয় কাঠামো, নীতিমালা বা জবাবদিহি ছাড়াই নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের সঙ্গে অপেশাদার বা ভুয়া পরিচয় ব্যবহারকারীদের পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কিংবা বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় হঠাৎ বিপুল সংখ্যক নতুন ‘সাংবাদিক’ দেখা যায় বলে অভিযোগ শোনা যায়। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কেউ তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে থাকেন, আবার কেউ পরিচয়পত্রকে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। যদিও সবাইকে একইভাবে বিচার করা ন্যায্য নয়, তবুও এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর যাচাই প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সাংবাদিকতার মূলধারাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কিছু সংবাদমাধ্যমে নিয়োগ, পরিচয়পত্র বিতরণ কিংবা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নির্বাচনেও কখনো কখনো যথাযথ মানদণ্ড অনুসরণ না করার অভিযোগ ওঠে। ফলে দায় কেবল ব্যক্তির নয়; কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান, মালিকপক্ষ এবং সম্পাদকীয় ব্যবস্থাপনাও সমালোচনার মুখে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করা অপরাধ নয়। বরং অনেক স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরছেন। তবে একটি কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা আর পেশাদার সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করা এক বিষয় নয়। সাংবাদিকতা মানে তথ্য যাচাই, একাধিক সূত্র নিশ্চিত করা, নৈতিকতা মেনে সংবাদ প্রকাশ এবং ভুল হলে সংশোধনের দায় গ্রহণ করা। এই মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত হলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কারণে সাংবাদিক নিবন্ধন বা স্বীকৃতি ব্যবস্থার আলোচনা সামনে এসেছে। তবে শুধু নিবন্ধন চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিবন্ধন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত। প্রকৃত সাংবাদিকদের মতামত, সম্পাদক, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় নিবন্ধন নিজেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়পত্র ইস্যুর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। কোন প্রতিষ্ঠান কাকে পরিচয়পত্র দেবে, সেই প্রতিষ্ঠানের আইনগত অবস্থান কী, সম্পাদকীয় কাঠামো আছে কি না, নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে কি না—এসব বিষয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পরিচয়পত্র যেন দায়িত্বের প্রতীক হয়, সুবিধা অর্জনের মাধ্যম না হয়।
প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান, নির্বাচন কিংবা বিশেষ দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন বা প্রবেশপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা চর্চা, সদস্যপদ প্রদানের স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। শুধু দাবি আদায় নয়, পেশার মান রক্ষায়ও সংগঠনগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সাংবাদিকতা একটি জনআস্থার পেশা। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পরিচয়পত্র নয়; বরং তাঁর সততা, তথ্যের নির্ভুলতা, জনস্বার্থে কাজ করার মানসিকতা এবং পেশাগত নৈতিকতা। এই মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে গেলে কোনো নিবন্ধন বা পরিচয়পত্রই সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে না।
সুতরাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্থাপিত প্রশ্নকে কেবল ক্ষোভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে একটি বাস্তব সমস্যা নিয়ে জনআলোচনার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, ন্যায্য নীতিমালা, কার্যকর জবাবদিহি এবং পেশাদার সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগ।
সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। এই স্তম্ভকে শক্তিশালী করতে হলে ভুয়া পরিচয়ের অপব্যবহার রোধের পাশাপাশি প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। তাহলেই জনসাধারণের আস্থা ফিরবে, আর সাংবাদিকতা তার প্রকৃত দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে।
লেখক: কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ।