বিজ্ঞাপন

জমিদার আমলের বাংলাদেশ: শাসন, ঐশ্বর্য, পতন এবং আজও টিকে থাকা ইতিহাসের উত্তরাধিকার

  • বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় এক শতাব্দী আগে এই ভূখন্ডের গ্রাম, জনপদ ও অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন জমিদাররা।
  • কেউ ছিলেন দানশীল, কেউ ছিলেন কঠোর শাসক, আবার কেউ ইতিহাসে পরিচিত হয়েছেন বিদ্রোহ দমনের জন্য।
  • জমিদার প্রথার উত্থান, শাসনব্যবস্থা, পতন এবং তাঁদের বংশধরদের বর্তমান অবস্থান-সব মিলিয়ে এটি বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
জমিদার আমলের বাংলাদেশ: শাসন, ঐশ্বর্য, পতন এবং আজও টিকে থাকা ইতিহাসের উত্তরাধিকার
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

বাংলাদেশের ইতিহাসে জমিদার প্রথা এমন একটি অধ্যায়, যার প্রভাব আজও দেশের বহু জনপদ, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও লোককথায় স্পষ্টভাবে টিকে আছে। স্বাধীনতার অনেক আগে, বিশেষ করে অষ্টাদশ, ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বর্তমান বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিভিন্ন জমিদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। যদিও তাঁরা সরাসরি রাজা ছিলেন না, তবুও নিজ নিজ অঞ্চলে তাঁদের ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র রাজাদের সমতুল্য ছিল। কৃষকের জীবন, খাজনা আদায়, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, দিঘি, মন্দির, মসজিদ কিংবা বাজার-সবকিছুর সঙ্গে জমিদারদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল।

বাংলায় জমিদার ব্যবস্থার শিকড় মধ্যযুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। সুলতানি ও মুঘল আমলে স্থানীয় ভূস্বামী, চৌধুরী, কানুনগো কিংবা রাজস্ব সংগ্রাহকদের মাধ্যমে ভূমি প্রশাসন পরিচালিত হতো। তবে সেই সময়ের জমিদারদের ভূমিকা বর্তমান অর্থে জমির মালিকের মতো ছিল না। তাঁরা মূলত সরকারের পক্ষে রাজস্ব সংগ্রহ করতেন এবং নির্দিষ্ট এলাকার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন। মুঘল স¤্রাট আকবরের শাসনামলে রাজা টোডরমলের ভূমি জরিপ ও রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে বাংলায় ভূমি প্রশাসন আরও সুসংগঠিত হয়। এই ব্যবস্থাই পরবর্তীতে জমিদার শ্রেণির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ বাংলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে বাংলার প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। ১৭৬৫ সালে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করলে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বও তাদের হাতে আসে। কিন্তু বিশাল ভূখন্ড পরিচালনার জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এখান থেকেই জমিদারদের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

১৭৯৩ সালে গর্ভনর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' বা চবৎসধহবহঃ ঝবঃঃষবসবহঃ চালু করেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারদের ভূমির স্থায়ী স্বত্ব দেওয়া হয় এবং সরকারকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। সময়মতো রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হলে জমিদারি নিলামে বিক্রি হয়ে যেত। ফলে একদিকে নতুন ধনী ব্যবসায়ী ও মহাজনরা জমিদার হয়ে ওঠেন, অন্যদিকে বহু পুরোনো জমিদার পরিবার সম্পত্তি হারিয়ে ফেলেন।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের হাতে বিপুল অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা এনে দেয়। কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের প্রায় সম্পূর্ণ অধিকার তাঁদের হাতে ন্যস্ত হয়। অধিকাংশ কৃষক ভূমির প্রকৃত মালিক না হয়ে প্রজায় পরিণত হন। ভালো মৌসুমে কৃষকের অবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাজনার চাপ তাঁদের জীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলত। অনেক অঞ্চলে খাজনা আদায়ে কঠোরতা, উচ্ছেদ এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

তবে সব জমিদার একই ধরনের ছিলেন না। অনেক জমিদার নিজেদের অঞ্চলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁরা বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, পাঠাগার, হাসপাতাল, দাতব্য চিকিৎসালয়, দিঘি, সড়ক এবং ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করেন। অনেক ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ির পাশে এখনও বিশাল দিঘি, নাটমন্দির, মন্দির, মসজিদ ও অতিথিশালা দেখা যায়, যা তাঁদের সমাজসেবামূলক কর্মকান্ডের সাক্ষ্য বহন করে।

বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য বিখ্যাত জমিদার পরিবার ছিল। নাটোর রাজপরিবার ছিল বাংলার অন্যতম শক্তিশালী জমিদারি। রানি ভবানী তাঁর দানশীলতা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকান্ডের জন্য বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁকে অনেক ইতিহাসবিদ 'উত্তর বাংলার জননী' বলেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বহু মন্দির, সড়ক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আজও ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

দিনাজপুর রাজ ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জমিদারি। বিশাল কৃষিভূমি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দাতব্য কর্মকান্ডের জন্য এই পরিবার সুপরিচিত ছিল। তাঁদের প্রাসাদ ও বিভিন্ন স্থাপনা আজও উত্তরাঞ্চলের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদার পরিবার শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। করটিয়া অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। একইভাবে কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, পাবনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রংপুর এবং খুলনা অঞ্চলেও বহু প্রভাবশালী জমিদার পরিবার গড়ে ওঠে।

জমিদারবাড়িগুলো শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না; এগুলো ছিল শিল্প, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র। দুর্গাপূজা, রাস উৎসব, নাট্যোৎসব, কীর্তন, পালাগান, কবিগান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো এসব প্রাসাদে। বহু শিল্পী, কবি, সংগীতজ্ঞ ও সাহিত্যিক জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন।

অন্যদিকে ইতিহাসের আরেকটি বাস্তবতা হলো কৃষকদের সঙ্গে জমিদারদের দ্বন্দ্ব। অতিরিক্ত খাজনা, প্রজাদের ওপর নির্যাতন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে বিভিন্ন সময় কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীতে পাবনা কৃষক আন্দোলন বাংলার কৃষক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। কৃষকেরা সংগঠিতভাবে অন্যায় খাজনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। এই আন্দোলন পরবর্তীকালে কৃষক অধিকার বিষয়ে নতুন চিন্তার পথ খুলে দেয়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়। এরপর ভূমি সংস্কারের দাবিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। অবশেষে ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গ রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমে জমিদারি প্রথার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। জমিদারদের কাছ থেকে বিশাল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করে সরকার কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। শতাব্দীপ্রাচীন জমিদারি ব্যবস্থার এখানেই কার্যত সমাপ্তি ঘটে।

জমিদারি বিলুপ্ত হওয়ার পর অধিকাংশ জমিদার পরিবার তাদের আর্থিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। বিশাল প্রাসাদ, অসংখ্য কর্মচারী, ঘোড়ার গাড়ি, হাতি, পালকি ও ঐশ্বর্যময় জীবনধারা ধীরে ধীরে অতীত হয়ে যায়। অনেক পরিবার কলকাতা, ঢাকা কিংবা বিদেশে চলে যায়। আবার কেউ কেউ ব্যবসা, শিক্ষা, আইন, চিকিৎসা কিংবা সরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়ে নতুন জীবন শুরু করেন।

আজকের বাংলাদেশে জমিদারদের অধিকাংশ বংশধর সাধারণ নাগরিক হিসেবেই জীবনযাপন করেন। কেউ শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী বা গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অনেক পরিবার তাদের পূর্বপুরুষদের জমিদার পরিচয়কে কেবল ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হিসেবেই দেখেন। যদিও কিছু পরিবার এখনও ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ, নথিপত্র, প্রতœসম্পদ ও পারিবারিক ইতিহাস সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা বহু জমিদারবাড়ি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতœসম্পদ হিসেবে বিবেচিত। নাটোরের উত্তরা গণভবন, বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদারবাড়ি, দিনাজপুর রাজবাড়ি, কাকিনা জমিদারবাড়ি, দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি এবং আরও অসংখ্য স্থাপনা ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে পর্যাপ্ত সংরক্ষণের অভাবে অনেক স্থাপনা ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

জমিদারদের নিয়ে বাংলা সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও লোককাহিনিতেও ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। কখনও তাঁরা দয়ালু অভিভাবক, কখনও অত্যাচারী শাসক, আবার কখনও সমাজসংস্কারক হিসেবে উঠে এসেছেন। বাস্তব ইতিহাসও একই রকম বহুমাত্রিক। সব জমিদারকে একভাবে বিচার করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি তাঁদের অবদান ও সীমাবদ্ধতা-উভয় দিকই ইতিহাসের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

জমিদার প্রথা বাংলার সামাজিক কাঠামো, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যেমন কিছু অঞ্চলে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের বিকাশ ঘটেছে, তেমনি কৃষক সমাজের ওপর দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও শোষণের ইতিহাসও তৈরি হয়েছে। তাই জমিদারদের ইতিহাস কেবল প্রাসাদ, রাজকীয় জীবন কিংবা বিলাসিতার গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে ক্ষমতা, প্রশাসন, কৃষি অর্থনীতি, সামাজিক পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ইতিহাস।

বাংলাদেশ আজ স্বাধীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু দেশের নানা প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী জমিদারবাড়ি, পুরোনো কাছারি, বিশাল দিঘি, মন্দির, মসজিদ, নাটমন্দির এবং প্রাচীন বৃক্ষ এখনও অতীতের সেই অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। এগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং বাংলার দীর্ঘ সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের জীবন্ত দলিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা মানে কেবল অতীতকে রক্ষা করা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসকে তার পূর্ণতা ও বৈচিত্র্যসহ নতুন করে জানার সুযোগ সৃষ্টি করা।

লেখক : কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ । শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬।

বি:দ্র: বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন হতে সংগ্রহ থেকে ফিচারটি প্রস্তুত করা হয়েছে, এতে কোন ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।
 

বিজ্ঞাপন