ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি অভিন্ন প্রশ্ন সামনে আসে-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে এবং সেই দায়িত্ব পালনের জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?
বাংলাদেশ এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা-এই তিনটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব বহুমাত্রিক।
সপ্তাহজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের নতুন পরিস্থিতি। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘোষণা এবং তা ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের দৃষ্টি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে সামনের মাসগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিতও মিলছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে।
এদিকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান বন্যা ও পাহাড়ধস আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে-জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দুর্যোগে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, হাজার হাজার ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের তৎপরতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-আমরা কি এখনও দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া জানানোতেই সীমাবদ্ধ, নাকি দুর্যোগের আগেই প্রস্তুুতি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছি?
বাংলাদেশ প্রতিবছরই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের মুখোমুখি হয়। তাই প্রতিবার একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; এর একটি অংশ পরিকল্পনার ঘাটতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার দখল, নদী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সীমাবদ্ধতারও ফল।
অর্থনীতির দিক থেকেও সপ্তাহটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এলডিসি-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলায় নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং পুঁজিবাজার সংক্রান্ত কয়েকটি নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের নীতিগত উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নীতি প্রণয়ন নয়; বাস্তবায়ন। উন্নয়ন পরিকল্পনা কাগজে যতই আকর্ষণীয় হোক, যদি মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা থেকে যায়, তবে কাঙ্খিত ফল পাওয়া কঠিন।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত হত্যাকান্ড, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং অপরাধের ঘটনাগুলোও উদ্বেগজনক। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতিনিধিরাও যখন সহিংসতার শিকার হন, তখন বোঝা যায় যে সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে এখনো অনেক ক্ষেত্রে আইনের পরিবর্তে শক্তির মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে মতপার্থক্যের সমাধান আদালত, নির্বাচন ও আলোচনার মাধ্যমে হওয়া উচিত। অস্ত্র, হামলা কিংবা প্রতিশোধ কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।
এই সপ্তাহে সংসদে জুলাই গণঅভ্যু-সংশ্লিষ্ট একটি আইন পাস হয়েছে, যা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসকে বিচার করার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন-এই তিনটি নীতি কখনো বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় সংকট হলো জবাবদিহিতার সংস্কৃতির দুর্বলতা।
বন্যা হলে প্রকৃতি দায়ী হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় চালক দায়ী হয়, সরকারি জমি দখল হলে দখলদার দায়ী হয়, আর অর্থনৈতিক সমস্যায় বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে দায়ী করা হয়। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নজরদারির অভাব কিংবা দায়িত্ব পালনে গাফিলতির জন্য কতজন কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান বাস্তবে জবাবদিহির মুখোমুখি হন?
রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষমতা আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে সমানভাবে দায়িত্বও থাকতে হবে।
আজ দেশের মানুষ উন্নয়ন দেখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে জানতে চায়-
- একটি প্রকল্প সময়মতো শেষ হলো কি না।
- সরকারি জমি কেন দখল হলো।
- দুর্নীতির অভিযোগের কী পরিণতি হলো।
- তদন্ত প্রতিবেদন কোথায় গেল।
- বাজেটের অর্থ কীভাবে ব্যয় হলো।
- জনগণের করের টাকা কতটা সঠিকভাবে ব্যবহার হলো।
এ প্রশ্নগুলো বিরোধিতার নয়; গণতন্ত্রের।
স্থানীয় সরকারকেও নতুন করে ভাবতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ না নেয়। কারণ স্থানীয় সংঘাতই অনেক সময় জাতীয় অস্থিরতার ভিত্তি তৈরি করে।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। শুধু ঘটনা প্রকাশ করাই নয়, ঘটনার পরিণতি, তদন্তের অগ্রগতি এবং দায় নির্ধারণের বিষয়েও ধারাবাহিক অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে। সংবাদপত্রের শক্তি এখানেই-স্মৃতি ধরে রাখা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সামাজিক চাপ তৈরি করা।
নাগরিক সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। আইন মানা, কর প্রদান, পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করা-এসব কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; নাগরিক দায়িত্বও বটে।
সবশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা যেমন বড়, তেমনি চ্যালেঞ্জও বড়। জনশক্তি, কৃষি, রপ্তানি, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা সক্ষমতা-সব মিলিয়ে দেশ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখে। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রার ভিত্তি হতে হবে সুশাসন, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
রাষ্ট্রের প্রতিটি সম্পদ জনগণের। প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের করের অর্থে পরিচালিত। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে জনগণের স্বার্থ। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
এই সপ্তাহের ঘটনাগুলো আমাদের আবারও সেই পুরোনো শিক্ষা দিয়েছে-সংকট কখনো একা আসে না; কিন্তু সুশাসন থাকলে সংকট মোকাবিলা সম্ভব। আর জবাবদিহিতা না থাকলে উন্নয়নও টেকসই হয় না।
বাংলাদেশের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়, বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা-যেখানে আইন সবার জন্য সমান, দায়িত্ব পালনে অবহেলার জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং জনগণের আস্থাই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি।