বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও সেদিন মাটির গন্ধে বারুদের তীব্রতা লেগে ছিল। সীমান্তের ওপারে আগুন জ্বলছিল, আর এপারে মানুষ দৌড়াচ্ছিল প্রাণ বাঁচানোর জন্য। কেউ জানত না, কে ভারতীয়, কে পাকিস্তানি, আর কে একদিন বাংলাদেশি হবে। পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
কলকাতার এক পুরোনো স্টেশনে তখন রাত প্রায় তিনটা। প্ল্যাটফর্মের কোণে বসে থাকা সাত বছরের শিশুটি শুধু একটি কথাই বলছিল—“আমার মা কোথায়?” তার গায়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত, চোখে আতঙ্ক, আর হাতে একটি ভাঙা কাঠের খেলনা। ট্রেনটি এসেছিল পাঞ্জাব থেকে। কিন্তু ট্রেনের ভেতরে জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষের সংখ্যা ছিল বেশি। স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের কেউ কেউ কাঁদছিল, কেউ চুপ করে তাকিয়ে ছিল। কারণ, সেই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
১৯৪৭ সাল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য উপমহাদেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শত বছরের শাসনের শেষে তারা এমন একটি মানচিত্র রেখে যায়, যা লাখো মানুষের জীবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু কাগজে টানা সীমান্ত বাস্তব জীবনে হয়ে ওঠে মৃত্যু ফাঁদ। এক রাতের মধ্যে প্রতিবেশী শত্রুতে পরিণত হয়। বন্ধু হয়ে যায় সন্দেহভাজন।
পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতে তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি। একদল মানুষ পশ্চিমে যাচ্ছে, আরেকদল পূর্বে। হাজার হাজার পরিবার গরুর গাড়ি, পায়ে হাঁটা কিংবা ট্রেনে করে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পথে পথে হামলা হচ্ছিল। অনেক ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাত মৃতদেহে ভরা অবস্থায়। ইতিহাসবিদদের মতে, বিভক্তির সময় প্রায় এক থেকে দুই মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়েছিল। কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিল।
লাহোরের এক মুসলিম পরিবার রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। পরিবারের কর্তা আবদুল করিম নিজের ঘরের দরজায় শেষবার হাত রেখে বলেছিলেন, “এই বাড়িতে হয়তো আর কখনো ফিরতে পারব না।” তার স্ত্রী তখন কোরআন শরীফ বুকের সঙ্গে চেপে ধরে ছিলেন। তাদের পাশের বাড়ির হিন্দু প্রতিবেশী রমেশ চন্দ্র চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। কয়েক মাস আগেও তারা একসঙ্গে ঈদ আর দুর্গাপূজায় মিষ্টি খেতেন। এখন তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুধু নীরব ছিল।
অন্যদিকে কলকাতার দাঙ্গা ইতোমধ্যেই শহরকে রক্তাক্ত করে তুলেছিল। রাস্তায় লাশ পড়ে থাকত দিনের পর দিন। হাসপাতালগুলো ভর্তি হয়ে যেত আহত মানুষে। সংবাদপত্রে প্রতিদিন ছাপা হতো নতুন মৃত্যুর খবর। ধর্মীয় উত্তেজনা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, অনেক মানুষ নিজের নাম পর্যন্ত গোপন রাখতে শুরু করেছিল।
তখনও কেউ বুঝতে পারেনি, এই বিভক্তির ক্ষত একদিন পূর্ব পাকিস্তান নামের আরেকটি ট্র্যাজেডির জন্ম দেবে। বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ তখন পাকিস্তানের অংশ। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি আর অর্থনৈতিক বৈষম্য ধীরে ধীরে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মনে করত, পূর্ব বাংলার মানুষ শুধু শ্রম দেবে, কিন্তু ক্ষমতার অংশীদার হবে না।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে উত্তেজনা। পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করতে চায়। কিন্তু বাংলাভাষী মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার—তারা জানত না, কয়েক ঘণ্টা পরই তারা ইতিহাস হয়ে যাবে। পুলিশের গুলি ছুটে আসে। রক্তে ভিজে যায় রাজপথ। ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সেই দিন শুধু একটি ভাষাকে রক্ষা করেনি, বরং বাঙালির স্বাধীনতার বীজও বপন করেছিল।
ঢাকার অলিগলিতে তখন ফিসফাস করে মানুষ বলত, “আমরা কি সত্যিই পাকিস্তানের নাগরিক? নাকি কেবল শাসিত জনগণ?” পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি সন্দেহের চোখে তাকাত। অথচ দেশের অর্থনীতির বড় অংশ আসত পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও কৃষি থেকে।
১৯৬০-এর দশকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বৈষম্য, সেনা শাসন—সব মিলিয়ে ক্ষোভ জমতে থাকে। শেখ মুজিবুর রহমান নামের এক নেতা তখন ধীরে ধীরে মানুষের আশা হয়ে উঠছেন। তার ভাষণ শুনতে লাখো মানুষ জড়ো হতো। তিনি বলতেন, “এ দেশের মানুষকে আর বঞ্চিত করা যাবে না।”
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো পূর্ব পাকিস্তানে। মানুষ বুঝতে শুরু করে, সামনে ভয়ংকর কিছু আসছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত। ঢাকার আকাশে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় হল, ছাত্রাবাস, পাড়া-মহল্লা—সব জায়গায় নির্বিচারে হত্যা চলতে থাকে। অনেক পরিবার ঘুম থেকে জেগে বুঝতেই পারেনি, তাদের শেষ রাত শুরু হয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে আগুন লাগানো হয়। ছাত্রদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। পুরান ঢাকার সরু গলিতে লাশ পড়ে থাকে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ গড়ে তোলা পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সামরিক অভিযান হিসেবে এই রাত আজও স্মরণ করা হয়।
একজন বৃদ্ধ শিক্ষক পরে বলেছিলেন, “সেদিন রাতের চিৎকার এখনও কানে বাজে।” তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন, কিভাবে আগুনের আলোয় মানুষ দৌড়াচ্ছিল, আর গুলির শব্দে পুরো শহর কেঁপে উঠছিল।
বাংলার গ্রামগুলোতেও ভয়াবহতা নেমে আসে। পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাত। অনেক গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নারীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। অসংখ্য মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে তখন উদ্বাস্তু শিবির গড়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম—সব জায়গায় লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নেয়। খাদ্য সংকট, রোগ, অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মাঝেও মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল। অনেক শিশু বাবা-মাকে হারায়। অনেক মা সন্তানকে হারিয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াতেন।
কিন্তু এই অন্ধকারের মাঝেও জন্ম নেয় প্রতিরোধ। তরুণরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে শুরু করে। কেউ ছিল ছাত্র, কেউ কৃষক, কেউ শিক্ষক। তারা অস্ত্র হাতে নেয় স্বাধীনতার জন্য। সীমান্তের ওপারে প্রশিক্ষণ শিবিরে দিনরাত যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে।
একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল, “আমরা হয়তো বাঁচব না, কিন্তু বাংলাদেশ বাঁচবে।” সেই ডায়েরি পরে একটি ধ্বংসস্তূপের ভেতর পাওয়া যায়। পাতাগুলো রক্তে ভেজা ছিল।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, ততই বাড়তে থাকে আন্তর্জাতিক চাপ। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার খবর প্রকাশ হতে থাকে। বিদেশি সাংবাদিকরা গোপনে ছবি তুলতেন। সেই ছবিতে দেখা যেত পুড়ে যাওয়া গ্রাম, আহত শিশু, আর উদ্বাস্তু মানুষের অসহায় মুখ।
অবশেষে ডিসেম্বর মাসে ভারত সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে অগ্রসর হতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ঢাকার আকাশে তখন যুদ্ধবিমানের গর্জন। মানুষ অপেক্ষা করছিল শেষ ঘোষণার জন্য।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু বিজয়ের আনন্দের মাঝেও ছিল অসংখ্য হারানোর বেদনা। লাখো শহীদ, নির্যাতিত নারী, ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবার—সবকিছু মিলিয়ে স্বাধীনতার মূল্য ছিল ভয়াবহ।
যুদ্ধ শেষে অনেকে নিজের গ্রামে ফিরে গিয়ে শুধু ধ্বংসস্তূপ পেয়েছিল। কোথাও বাড়ি নেই, কোথাও পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। তবুও মানুষ নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল।
এই ইতিহাস শুধু রাজনীতি নয়। এটি মানুষের গল্প। এক মায়ের কান্না, এক শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব, এক তরুণের আত্মত্যাগ, আর এক জাতির জন্মের গল্প।
আজও ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সীমান্তে দাঁড়ালে সেই বিভক্তির প্রতিধ্বনি শোনা যায়। পুরোনো প্রজন্মের অনেক মানুষ এখনও কাঁদেন তাদের হারিয়ে যাওয়া বাড়ির কথা মনে করে। কেউ লাহোরকে মনে করেন, কেউ কলকাতাকে, কেউ ঢাকার পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে বাঁচেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হলো—যুদ্ধ ও বিভক্তির মূল্য সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি দেয়। রাজনীতি বদলায়, মানচিত্র বদলায়, কিন্তু মানুষের কান্না থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
তবুও এই উপমহাদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, ধ্বংসস্তূপ থেকেও নতুন স্বপ্ন জন্ম নিতে পারে। রক্তের ভেতর থেকেও স্বাধীনতার সূর্য উঠতে পারে।
লেখক পরিচিতি
কাজী হাফিজুর রহমান
সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ, নড়াইল।
www.narailkantho.com
ইতিহাস, সমাজ ও উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন।