বৈশ্বিক চিত্র: উদ্বেগজনক নিম্নগতি:
ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) প্রতি বছর সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ মূল্যায়ন করে এই সূচক প্রকাশ করে।
২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের গড় স্কোর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
প্রথমবারের মতো অর্ধেকেরও বেশি দেশ “কঠিন” অথবা “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” পর্যায়ে রয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কঠোর আইন বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রবাহ সীমিত করছে, এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও।
সূচকে ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত স্কোর দেওয়া হয়।
৮৫–১০০: ভালো
৭০–৮৫: সন্তোষজনক
৫৫–৭০: সমস্যাযুক্ত
৪০–৫৫: কঠিন
০–৪০: খুব গুরুতর
বাংলাদেশের অবস্থান:
বাংলাদেশের স্কোর এবার ৩৩.০৫, যা গত বছরের ৩৩.৭১ থেকে কমেছে। ফলে দেশটি “খুব গুরুতর” (গাঢ় লাল) শ্রেণিতে রয়েছে।
গত বছর বাংলাদেশ ছিল ১৪৯তম স্থানে; এবার নেমে এসেছে ১৫২তম স্থানে।
আরএসএফের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি পাঁচটি সূচকে মূল্যায়ন করা হয়েছে—
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তা।
শীর্ষ ও তলানির দেশ:
সূচকে প্রথম স্থানে রয়েছে Norway (স্কোর ৯২.৭২) এবং সর্বশেষ ১৮০তম স্থানে রয়েছে Eritrea (স্কোর ১০.২৪)।
বাংলাদেশের প্রতিবেশীদের মধ্যে:
India ১৫৭তম (স্কোর ৩১.৯৬)
Pakistan ১৫৩তম (স্কোর ৩২.৬১)
যুদ্ধ ও দমনপীড়নের প্রভাব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সাংবাদিকতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান অভিযানে ২২০ জনের বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যাদের অন্তত ৭০ জন দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন।
এছাড়া China (১৭৮তম), North Korea (১৭৯তম) এবং Iran (১৭৭তম) তালিকার তলানির দিকে রয়েছে।
Vladimir Putin-এর নেতৃত্বাধীন Russia (১৭২তম) ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় মারাত্মকভাবে পিছিয়ে আছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবনতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Donald Trump-এর অধীনে United States সাত ধাপ নেমে ৬৪তম স্থানে গেছে।
মার্কিন আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সংকোচনের ফলে বহু দেশে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: আরএসএফ যা বলেছে
১. গণমাধ্যম কাঠামো
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমগুলো কার্যত সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেসরকারি খাতে প্রায় তিন হাজার মুদ্রিত প্রকাশনা, ৩০টি রেডিও, ৩০টি টিভি চ্যানেল ও শতাধিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে।
বাংলা দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার কিছুটা সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
২. রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতা
২০০৯–২০২৪ সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী Sheikh Hasina-এর শাসনামলে সেন্সরশিপ, অনলাইন হয়রানি ও কঠোর আইনের প্রয়োগ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন (ডিএসএ) ও সাইবার সিকিউরিটি আইন (সিএসএ)-কে সাংবাদিকতার জন্য কঠোর ও বিতর্কিত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
৩. অর্থনৈতিক প্রভাব
গণমাধ্যম মালিকানার বড় অংশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর হাতে কেন্দ্রীভূত। সরকারি বিজ্ঞাপন ও আমদানিকৃত নিউজপ্রিন্টের ওপর নির্ভরতা সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
৪. সামাজিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
ধর্মীয় সংখ্যালঘু ইস্যুতে মূলধারার গণমাধ্যমের নীরবতা, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলা এবং অনলাইন বিদ্বেষমূলক প্রচারণা সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
নারী সাংবাদিকরা বিশেষভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপসংহার
আরএসএফের সাম্প্রতিক সূচক বলছে, শুধু বাংলাদেশ নয়—বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে। আইনি কড়াকড়ি, রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি—সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা ক্রমেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিন ধাপ অবনতি এই বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন, তবে স্থানীয় বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সূত্র: Reporters Without Borders (আরএসএফ)