• 01 Dec, 2025

অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু, শূন্য পুঁজি-আজ ১৫০ নারীর কর্মসংস্থান: উদ্যোক্তা শোভা সুলতানার অনন্য সাফল্যের গল্প

অষ্টম শ্রেণি থেকে শুরু, শূন্য পুঁজি-আজ ১৫০ নারীর কর্মসংস্থান: উদ্যোক্তা শোভা সুলতানার অনন্য সাফল্যের গল্প

নড়াইলের মালিবাগ এলাকায় নারী উদ্যোক্তা শোভা সুলতানার প্রতিষ্ঠিত “রঙরাণী” কারখানাটি বিদ্যুৎ সংযোগ সমস্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নতমানের যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভবন মালিককে একাধিকবার অনুরোধ করেও সমাধান না পেয়ে বিষয়টি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নড়াইলের সীমাখালী গ্রামের সাধারণ এক পরিবারের সন্তান শোভা সুলতানা। শৈশবের হাতে বানানো ব্যাগ থেকে সঞ্চয়, ছাগল-গরু পালন, ঘরে বসে কাস্টমাইজড পোশাক তৈরি-সব মিলিয়ে এক অনড় ভরসা ছিল নিজের উপর। আজ তিনি “রঙরাণী” নামে সফল একটি ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা-যার কারখানায় পাঁচটি জেলায় প্রায় ১৫০ দক্ষ নারী প্রতিদিন তৈরি করছেন ১০০টিরও বেশি পণ্য। তাঁর সেই সংগ্রাম-সাফল্যের পথচলায় উঠে এসেছে নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অনন্য দৃষ্টান্ত।

নড়াইলকণ্ঠ: উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা কেমন ছিল?
শোভা সুলতানা: আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন থেকেই কাস্টমাইজড পোশাক তৈরির মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করি। মায়ের আগ্রহেই প্রথম টেইলরিং শিখি। নিজের জন্য যে পোশাক বানাতাম তা সবাই পছন্দ করত, আমাকেই বানিয়ে দিতে বলত। পুঁজি না থাকায় তাদের কাছ থেকে আগেই টাকা নিয়ে কাজ করতাম। এভাবেই শুরু হয় আমার উপার্জনের পথ।

নড়াইলকণ্ঠ: ছোটবেলায় সঞ্চয় করার অভ্যাস কীভাবে গড়ে ওঠে?
শোভা সুলতানা: খুব ছোট বয়স থেকেই আমার ভিতরে ছিল সঞ্চয়ের প্রবণতা। ক্লাস টু-তে বাবা প্রতিদিন ২ টাকা দিতেন। সেই টাকা দিয়ে আমি প্রথম ৫০০ টাকা জমিয়ে পরিবারের হাতে তুলে দিই। এরপর ক্লাস সিক্সে প্রথম সুই-সুতা দিয়ে মায়ের জন্য শাড়ি আর নিজের জন্য হাতের ডিজাইন করা ড্রেস বানাই। ওই হাতের কাজই ছিল আমার প্রথম “উদ্যোক্তা পরিচয়পত্র”।

নড়াইলকণ্ঠ: আপনার প্রথম বড় বিনিয়োগ কিভাবে করলেন?
শোভা সুলতানা: স্কুলের হাতখরচ জমিয়ে ১,২০০ টাকা দিয়ে প্রথম ছাগল কিনি। যত্নে-লালনে তা ১১টি ছাগলে পরিণত হয়। পরে বিক্রি করে একটি জার্সি গরু কিনি, যার দাম পাই ৫৫ হাজার টাকা। সেই টাকা পরিবারকেই দিয়ে দিই। তখনই বুঝেছিলাম-পরিশ্রম করলে বড় কিছু করা যায়। 

নড়াইলকণ্ঠ: শৈশব জীবনে শিল্প ও সৃজনশীলতার ভূমিকা কী ছিল? 
শোভা সুলতানা: নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, ছবি আঁকা-সব ক্ষেত্রেই অংশ নিয়েছি এবং পুরস্কার পেয়েছি ৩৫টিরও বেশি। এটি আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ব্লক, বাটিক, কারচুপি, হ্যান্ডপেইন্টসহ প্রায় ৩৫ ধরনের দক্ষতার প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমার শখই ছিল শেখা; মানুষ যেখানে টাকা জমিয়ে বিলাসিতা করে, আমি নিজের দক্ষতায় বিনিয়োগ করেছি।

নড়াইলকণ্ঠ: একজন অতিথির দেওয়া ১০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা বড় করা প্রসঙ্গে কিছু বলবেন?
শোভা সুলতানা: ২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষার সময় এক অতিথি আমার তৈরি একটি ড্রেস দেখে খুব প্রশংসা করেন। তিনি আমার ব্যবসা বড় করার জন্য ১০ হাজার টাকা দেন এবং ১০ মাস সময় দেন এটি ফেরত দেওয়ার জন্য। সেই টাকা দিয়ে ভালো মানের সামগ্রী কিনে ঈদের অর্ডারে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। প্রথম ঈদেই আয় হয় ২৫ হাজার টাকা-আর আমি মাত্র ৩ মাসে উনার দেয়া টাকা পরিশোধ করি। এরপর টাকাটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মূলধন দাঁড়ায় দেড় লক্ষে।

নড়াইলকণ্ঠ: পরিবার কি ব্যবসায় সমর্থন করেছিল?
শোভা সুলতানা: শুরুতে মোটেও না। পরিবার বলত “মেয়েরা দোকান দিলে মান-সম্মান নষ্ট হয়।” তবুও আমি থামিনি। ২০১৫ সালে ৫০০ টাকা ভাড়ায় প্রথম ছোট দোকান নেই। পরে মূলধন বাড়তে থাকায় আরেকটি দোকান নেই। তিন বছরেই মূলধন দাঁড়ায় পাঁচ লক্ষ টাকা।

নড়াইলকণ্ঠ: “রঙরাণী” ব্র্যান্ডের জন্ম কীভাবে?
শোভা সুলতানা: আমি যেহেতু নিজের হাতে পণ্য তৈরি করি, তাই একটি ব্র্যান্ড তৈরির সিদ্ধান্ত নেই। নাম দিই “রঙরাণী” কারণ আমরা রঙিন পণ্য নিয়ে কাজ করি এবং আমার প্রতিটি গ্রাহকই আমার কাছে রাণী। ভিজিটিং কার্ড থেকে শুরু করে লাইটবোর্ড-সব ডিজাইন নিজেই করেছি। শ্লোগান দিয়েছি “অনন্যতায় সেরা”।

নড়াইলকণ্ঠ: দক্ষ কর্মী পাওয়ার ক্ষেত্রে কী সমস্যায় পড়েছেন?
শোভা সুলতানা: একসময় প্রচুর অর্ডার আসতে থাকে। কিন্তু দক্ষ কর্মী কম। আমি নিজেই ২৫-৩০ জন মেয়েকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিই। তারা-ই আমার প্রথম কর্মীদল। এরপর অনলাইন অর্ডার, বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি অর্ডার আসতে থাকে।

নড়াইলকণ্ঠ: মেলায় অংশ নেওয়া আপনার উদ্যোক্তা জীবনে কী পরিবর্তন এনেছে?
শোভা সুলতানা: প্রথম মেলা ছিল আগারগাঁও আইসিটি ভবনের। একাই গিয়েছি, কারণ আমাকে নিয়ে দৌড়ানোর মতো কেউ ছিল না। দ্বিতীয় মেলা ছিল খুলনায়-১০০ কেজির দুই ব্যাগ টেনে একাই স্টল সাজাই। প্রথম দিনেই ১০ হাজার টাকার বিক্রি। গত ৯ বছরে ৬-৭টি জাতীয়-আঞ্চলিক মেলায় অংশ নিয়েছি। বিদেশে মেলায় অংশ নেওয়া এখন আমার বড় স্বপ্ন। 

nk-nov-014.jpgনড়াইলকণ্ঠ: এত কাজের মাঝেও পড়াশোনা কীভাবে চালিয়ে গেলেন? 
শোভা সুলতানা: পড়াশোনায় পরিবার খুব বাধা দিত। বলত “মেয়েদের বেশি পড়াশোনার দরকার নেই।” অনার্স ভাইভার আগেও আমাকে জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। নিজের উপার্জনের টাকায় বই কিনেছি, সময় বের করে পড়েছি। এখন একাউন্টিং নিয়ে অনার্স সম্পন্ন করেছি, লক্ষ্য মাস্টার্স শেষ করা।

নড়াইলকণ্ঠ: আপনার প্রতিষ্ঠানে কী কী পণ্য উৎপাদন হয়?
শোভা সুলতানা: কাস্টমাইজ ড্রেস, ব্লক, বাটিক, হ্যান্ডপেইন্ট, কারচুপি, কুশিকাটা, টাই-ডাই, কাঠ, পাট, বাঁশ, জিপসাম পণ্য, কাস্টমাইজ মোমবাতি, আর্টিফিশিয়াল ফুলের গহনা, হোমডেকর, ম্যাক্রোম সুতার পণ্যসহ আরও ১০০টিরও বেশি আইটেম।

নড়াইলকণ্ঠ: বর্তমানে কতজন কর্মী এবং কী পরিমাণ উৎপাদন ক্ষমতা আছে?
শোভা সুলতানা: পাঁচটি জেলায় প্রায় ১৫০ জন দক্ষ নারী আমার সঙ্গে কাজ করছেন। কারখানায় পাঁচটি মেশিন আছে। কাঁচামালের স্টক প্রায় ৭ লক্ষ টাকার। মাসিক নিট আয় প্রায় এক লক্ষ টাকা।

nk-nov-015.jpgনড়াইলকণ্ঠ: নড়াইলে কারখানা পরিচালনায় আপনি কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন?
শোভা সুলতানা: নড়াইল শহরতলীর মালিবাগ এলাকায় দোতলা একটি ভবনে আমার কারখানা চালানো হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে উপযুক্ত বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব। প্রয়োজনীয় ও উন্নত মানের যন্ত্রপাতি বসাতে পারছি না। ভবন মালিককে বারবার অনুরোধ করেও কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আপনাদের মাধ্যমে আমি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে আনার অনুরোধ জানাচ্ছি। 

নড়াইলকণ্ঠ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? 
শোভা সুলতানা: রঙরাণীকে একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। নারীদের জন্য একটি টেকসই ট্রেনিং সেন্টার গড়তে চাই, যাতে প্রশিক্ষণ শেষে তারা চাকরি না পেলেও আমার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারে। এছাড়া বিদেশে পণ্য রপ্তানি, আন্তর্জাতিক ফেয়ার-এ অংশগ্রহণ এবং অর্গানিক ফুড ব্র্যান্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।