• 29 Apr, 2026

খাল ফিরলে বাঁচবে নড়াইল: জলাবদ্ধতা মুক্ত শহর, কৃষি উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের সন্ধানে

খাল ফিরলে বাঁচবে নড়াইল: জলাবদ্ধতা মুক্ত শহর, কৃষি উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের সন্ধানে

“বর্ষা নামলেই নড়াইল শহরের বহু এলাকা ডুবে যায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে। জলাবদ্ধতা শুধু নাগরিক দুর্ভোগই বাড়ায় না, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অথচ বহু পুরোনো খাল, বিল ও জলপথের সঠিক পুনঃসংযোগ এবং পুনঃখনন করা গেলে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। হারিয়ে যাওয়া খাল ফিরিয়ে এনে নড়াইলকে আবারও কৃষি ও পরিবেশসম্মত জেলার মডেলে রূপান্তরের সময় এখনই।”

নড়াইল একটি নদীবেষ্টিত ও বিলসমৃদ্ধ জেলা। একসময় এই জেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলের জলপ্রবাহের প্রধান মাধ্যম ছিল অসংখ্য খাল, বিল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক সংযোগপথ। বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন, কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব খালের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল, ভরাট, অব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় এসব খালের অনেকগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায় কিংবা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
নড়াইল পৌরসভার মূল শহর এবং এর দক্ষিণ, উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম অংশে বসবাসকারী মানুষের অন্যতম প্রধান সমস্যা এখন জলাবদ্ধতা। অতি বর্ষণ হলেই শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পানি জমে দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, অফিস আদালত—সবখানেই এর প্রভাব পড়ে। অনেক এলাকায় নোংরা পানি জমে থাকায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ে। শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।

এই সমস্যার একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে প্রাকৃতিক খাল ব্যবস্থার সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত করা। বিশেষ করে নড়াইলের এলজিইডি অফিসের দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রবাহিত তরতরি খাল, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ—সেটিকে শহরের ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা গেলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব।

এই তরতরি খাল দিয়ে শহরের পানি পশ্চিম পাশের বাইরডাঙ্গা-ভওয়াখালী বিল হয়ে সীতারামপুর ব্রিজ সংলগ্ন খালে প্রবাহিত হতে পারে। সেখান থেকে লোহাগাড়া-কালনা-যশোর সড়কের উত্তর দিক ঘেঁষে দীর্ঘদিনের পুরোনো জলপ্রবাহ পথ ধরে আফরা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব। তুলারামপুর ব্রিজের উত্তরের অংশে স্লুইসগেট সংযোগস্থল, বরপিট বা খাল, এবং সীতারামপুর ব্রিজের নিচ দিয়ে তুলারামপুরমুখী খাল হয়ে মূলিয়া স্লুইসগেট পর্যন্ত এই পুরো ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা গেলে পানি নিয়ন্ত্রণের একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।

এখানেই শেষ নয়। নড়াইল শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও দুটি বিলুপ্ত সংযোগ খাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি হলো মুচিপুল এলাকায় অবস্থিত পুরোনো সংযোগ খাল এবং অন্যটি বর্তমান পাসপোর্ট অফিস ভবনের পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত খাল। স্থানীয়দের মতে, এই দুটি খাল একসময় প্রাকৃতিক পানি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। বর্তমানে উভয় খালই বেদখল, ভরাট বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

এই খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে শুধু শহরের পানি নিষ্কাশন সহজ হবে না, আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিও উপকৃত হবে। কারণ খাল মানে শুধু পানি যাওয়ার রাস্তা নয়—খাল মানে কৃষির প্রাণ, মৎস্য সম্পদের উৎস, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয় এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি।

নড়াইলের বিলাঞ্চলভিত্তিক কৃষি অর্থনীতি এখনও অনেকাংশে জলপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। জলাবদ্ধতা যেমন ফসল নষ্ট করে, তেমনি সঠিক সময়ে পানি না থাকলেও উৎপাদন ব্যাহত হয়। যদি প্রাকৃতিক খালগুলো সচল থাকে, তাহলে বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ—দুইটিই সম্ভব হয়। এতে ধান, পাট, শাকসবজি, ডাল, তেলবীজসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি মাছ চাষ, হাঁস পালন এবং জলজ সম্পদভিত্তিক অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

শুধু কৃষি নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও খাল পুনঃখনন অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে জলাবদ্ধতার কারণে শহরে মশার উপদ্রব বাড়ছে, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে, ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। খাল সচল থাকলে পানি স্থবির থাকবে না, প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত হবে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং নগর জীবনের মান উন্নত হবে।

এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত বিশেষজ্ঞ মতামত। পানি বিশেষজ্ঞ, কৃষি বিশেষজ্ঞ, মৎস্য বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যৌথভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে। সরকারি কাগজপত্রে এসব খালের বর্তমান আইনগত অবস্থান কী, কোথায় সরকারি জমি দখল হয়েছে, কোথায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে—এসব বিষয় জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখতে হবে।

এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, কৃষি বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; তা বাস্তবায়ন, মনিটরিং এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে পরিবেশবাদী সংগঠন, উন্নয়নকর্মী, সিভিল সোসাইটি এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাল দখলকারীদের চিহ্নিত করা, অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে জনমত গঠন, প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি, জনশুনানি এবং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিষয়টিকে জনস্বার্থের ইস্যুতে পরিণত করতে হবে। এডভোকেসি ও লবিং ছাড়া এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বিলুপ্ত ও অকার্যকর খাল পুনঃখননের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুরোনো খাল পুনরুদ্ধার করে জলাবদ্ধতা কমানো এবং কৃষি উন্নয়নের ইতিবাচক উদাহরণ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। নড়াইলেও যদি এই কর্মসূচির আওতায় বিলুপ্তপ্রায় খালগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে জেলার চিত্র বদলে যেতে পারে।

বিশেষ করে শহরের পশ্চিম ও দক্ষিণাংশ, বিলাঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলগুলোতে এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে হাজার হাজার পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে। শুধু শহর নয়, জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও একইভাবে বিলুপ্ত খাল পুনঃখননের মাধ্যমে কৃষি ও বসবাসের পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব।

আজ নড়াইলের প্রয়োজন শুধু উন্নয়নের কথা বলা নয়, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। শহরের সৌন্দর্য শুধু রাস্তা, ভবন বা আলোকসজ্জায় নয়; টেকসই ড্রেনেজ, কার্যকর জলব্যবস্থা, জীবন্ত খাল এবং নিরাপদ বসবাসের মধ্যেই প্রকৃত উন্নয়ন নিহিত।
যে খাল একসময় মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছে, সেই খাল আজ নিজেই বাঁচার জন্য মানুষের সহায়তা চায়। যদি এখনই উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম আরও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, কৃষি সংকট এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।

তাই নড়াইলবাসীর ঐক্যবদ্ধ দাবি হওয়া উচিত—খাল বাঁচাও, শহর বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও। পুনঃখনন, পুনঃসংযোগ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নড়াইলকে আবারও জল, মাটি ও জীবনের সমন্বিত জেলায় রূপান্তর করা সম্ভব। এখন দরকার শুধু সদিচ্ছা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং জনগণের অবিচল দাবি। খাল ফিরলে শুধু পানি নামবে না—ফিরে আসবে কৃষির সম্ভাবনা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানুষের স্বস্তির জীবনও।

লেখক: কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ। ২৯ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি: