• 13 Apr, 2026

ফেসবুক কে নিরাপদ করতে সরকারের কাছে টিক্যাবের ৫ দাবি

ফেসবুক কে নিরাপদ করতে সরকারের কাছে টিক্যাবের ৫ দাবি

নিজস্ব প্রতিনিধি: ফেসবুক এখন নাগরিকদের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত তথ্য ও মানসিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুয়া প্রোফাইল, পরিচয় চুরি, সাইবার বুলিং, নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর পক্ষে প্রোপাগান্ডা, প্রতারণামূলক লিংক, এআই দিয়ে বানানো ডিপ ফেইক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষের দুর্বল মনিটরিং ও আমাদের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির অভাবে ব্যবহারকারীরা সহজেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে প্রতারণার নতুন কৌশল (যেমন ফিশিং, ম্যালওয়্যার লিংক, নকল অফার) ব্যবহার করে অর্থ ও তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় ১১ এপ্রিল’২৬ (শনিবার) সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে “ফেসবুক কে নিরাপদ করতে সরকারের করণীয়” জানাতে “উন্মুক্ত আলোচনা সভার” আয়োজন করে “টেলি কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিক্যাব)”।

আলোচনা সভায় টিক্যাবের সভাপতি মুর্শিদুল হক (বিদ্যুৎ) ৫টি দাবি তুলে ধরে বলেন-
১. বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোগো ও ফটোকার্ডের আলোকে ক্লোন পেইজ তৈরি করে ভুয়া প্রোপাগান্ডামূলক ফটোকার্ড ছড়ানো ফেসবুক পেইজ ও ভুয়া ফেসবুক আইডিগুলো বন্ধ করতে হবে এবং এর সাথে জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
২. দেশের ৬০%-এর বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ফেসবুক ব্যবহার করায় এখানে অপরাধের হার বেশি। কিন্তু মোট ভিকটিমের ৮০% আইনি পদক্ষেপ নেন না। যারা অভিযোগ করেন, তাদের মধ্যে মাত্র ১৯% ইতিবাচক ফল পান। তাই ভিকটিমের কনফিডেন্স বাড়াতে দেশের প্রচলিত আইনি ব্যবস্থাতেই অভিযোগ দাখিলের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সরকারকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি করে অপরাধ দমনে নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে ফেসবুক কে বাধ্য করতে হবে।
৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে নিরাপদ ফেসবুক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ ও গণমাধ্যমে প্রচারাভিযান চালাতে হবে।
৫. সাইবার বুলিং, কুরুচিপূর্ণ অসামাজিক  অশ্লীল কন্টেন্ট ক্রিয়েশন বন্ধ, ই-কমার্স পেইজের প্রতারণাসহ সাইবার অপরাধ দমনে হটলাইন ও বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে জাতীয় হটলাইন চালু এবং জেলা ও থানা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত টিম গঠন করে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলু বলেন- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম Facebook-এ ভুয়া তথ্য, প্রোপাগান্ডা, প্রতারণামূলক লিংক এবং এআই-নির্ভর ডিপফেক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় এটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমাদের মতে শুধু প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

প্রথমত একটি শক্তিশালী আইনগত কাঠামো প্রয়োজন। বিদ্যমান Digital Security Act-এর মতো আইনগুলোকে আধুনিকায়ন করে ডিপফেক, ভুয়া তথ্য ও অনলাইন প্রতারণার জন্য স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে। এতে অপরাধ শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকারকে একটি বিশেষায়িত সাইবার মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যা সার্বক্ষণিকভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো সন্দেহজনক কনটেন্ট শনাক্ত করবে। আমরা মনে করি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দ্রুত ডিপফেক শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। কারণ Meta Platforms-এর মতো বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় ছাড়া দ্রুত কনটেন্ট অপসারণ বা অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য আনুষ্ঠানিক চ্যানেল শক্তিশালী করা প্রয়োজন ।

চতুর্থত, জনসচেতনতা বাড়ানোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। সাধারণ ব্যবহারকারীরা যদি ভুয়া খবর, প্রতারণামূলক লিংক বা ডিপফেক ভিডিও চিনতে পারেন, তাহলে এর বিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভব। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে ডিজিটাল লিটারেসি কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানাচ্ছি।

এছাড়া, ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং দ্রুত ভুয়া তথ্য যাচাই করে প্রচারের ব্যবস্থা করাও জরুরি বলে মনে করছি ।

পরিশেষে বলতে চাই ফেসবুককে নিরাপদ করতে একক কোনো সমাধান যথেষ্ট নয়। আইন, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা—এই চারটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারলেই অনলাইন বিভ্রান্তি ও প্রতারণা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন টিক্যাবের উপদেষ্টা ও  জাতীয় সাহিত্য অধিদপ্তর বাস্তবায়ন পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক ছাবের আহাম্মদ (কাজী ছাব্বীর), টিক্যাবের উপদেষ্টা ও  বাস্তুহারা দল কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, টিক্যাবের উপদেষ্টা ও  সবুজ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান বাপ্পি সরদার, টিক্যাবের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা,  জাতীয়তাবাদী কৃষকদল কেন্দ্রীয় সংসদের যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন বেপারী, টিক্যাবের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মুসা ফরাজী, টিক্যাবের উপদেষ্টা ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি)’র মহাসচিব হারুন আল রশিদ খান, টিক্যাবের সম্মানিত সদস্য ও বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির, ইসলামি ঐক্যজোটের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আমিন, সিএলএনবি’র চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশ সমতা পার্টির সভাপতি হানিফ বাংলাদেশী, বাংলাদেশ জনজোট পার্টি (বাজপা)’র চেয়ারম্যান মুজাম্মেল মিয়াজী, ভিশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোরসালিন ইসলাম বাবু, টিক্যাবের কেন্দ্রীয় নেতা হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম, সোহেল মিয়া, মো. ফারুক প্রমুখ।