নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়ায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। মাত্র ১৫ মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাতবার সময় বৃদ্ধি করেও ভবনটি আজও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা যায়নি। ফলে নড়াইল, মাগুরা ও যশোর জেলার সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ প্রয়োজনীয় মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—কেন একটি তুলনামূলক ছোট স্বাস্থ্য প্রকল্প শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় লাগলো এবং এর দায়ভার কে নেবে?
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ৯ অক্টোবর প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার প্রাক্কলন অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে ১৭ অক্টোবর ফরিদপুরের মেসার্স শ্রাবণী কনস্ট্রাকশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন হয়নি। এরপর একের পর এক সময় বৃদ্ধি করা হয়। অফিস সূত্র মতে, ৩০ মে ২০২২ থেকে ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত মোট সাতবার সময় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রকল্পটি। তারপরও কাজ শেষ হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘ সময়েও কাজ শেষ না হওয়ায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর একাধিকবার সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে। কাজে গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশও করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সাতবার সময় বৃদ্ধি এবং একাধিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও কেন কার্যকর ফল পাওয়া গেল না? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও এখন আলোচনায় এসেছে।
অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ভবনের প্রায় ৮৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩ কোটি ১৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৩ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের আর্থিক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মূল প্রকল্পের বিপরীতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা এখনও জনগণের কাছে পৌঁছায়নি।
এদিকে সাতবার সময় বৃদ্ধি করেও কাজ শেষ না হওয়ায় নতুন করে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। গত ৪ জুন দরপত্র খোলা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে কাজ ২০২২ সালেই শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি ২০২৬ সালেও অসম্পন্ন থাকায় সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন কেন হলো? এর দায় কি শুধুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের, নাকি প্রকল্প তদারকিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরেরও ব্যর্থতা রয়েছে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই দপ্তরের অধীনে একই ধরনের আরেকটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কাজ লোহাগড়ায় পরবর্তীতে শুরু হয়ে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। অথচ লাহুড়িয়ার প্রকল্পটি বছরের পর বছর ধরে অসম্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন উঠেছে—একই ধরনের দুটি প্রকল্পের মধ্যে এমন বৈষম্যের কারণ কী?
লাহুড়িয়া পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা রাহিলা বলেন, “আমাগের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। হাসপাতালটা চালু হলে মেয়ে-বউদের নিয়ে নড়াইল, মাগুরা কিংবা যশোরে যাতি হবি না। রাত-দিন সব সময় এখানেই চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যেত। হাসপাতালটি দ্রুত শেষ করার দাবি জানাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ হাসান আলী বলেন, “এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা হলে তিনটি জেলার মানুষ উপকৃত হতো। আমরা হাসপাতালটির দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি করছি।”
কালিশংকরপুর গ্রামের নূর ইসলাম বলেন, “বহু বছর ধরে ভবনটি অসম্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। জনগণের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত কাজ শেষ করা জরুরি।”
লাহুড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাফিয়া ও ওজিফা খানম নড়াইলকণ্ঠকে বলেন, “লাহুড়িয়ায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর আমরা খুব আশাবাদী হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল এই জনপদের মা ও শিশুরা সহজেই স্বাস্থ্যসেবা পাবে। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় আমরা চরম হতাশ।
বর্তমানে চিকিৎসাসেবা নিতে লোহাগড়া উপজেলা সদরে যেতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং নড়াইল জেলা সদর হাসপাতালে যেতে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। জরুরি সময়ে গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও শিশুদের নিয়ে এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা অত্যন্ত কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
একটি হাসপাতালের জন্য এত বছর অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে হাসপাতালটি চালু করা হোক, যাতে এই অঞ্চলের মা ও শিশুরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতভাবে পেতে পারে।”
লাহুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমার জানা মতে ২০২০ সালে হাসপাতালটির কাজ শুরু হয়, কিন্তু আজও শেষ হলো না। এর জন্য দায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। লাহুড়িয়া মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির অসম্পন্ন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য আমি সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত গেছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যবহারে অদক্ষতা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দীর্ঘসূত্রিতা, পুনঃদরপত্র এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয়ের কারণে সরকারের প্রায় দেড় কোটি টাকারও বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, জনগণ প্রত্যাশিত সেবা থেকেও বঞ্চিত হয়। লাহুড়িয়ার এই প্রকল্পটি তার একটি বাস্তব উদাহরণ। একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় প্রসূতি মা, নবজাতক ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণে অতিরিক্ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি) নড়াইলের সহকারী প্রকৌশলী অশোক কুমার দত্ত জানান, “লাহুড়িয়া ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণাধীন ছিল। সাত সাত বার কাজের মেয়াদ বৃদ্ধির পর বিগত ২০২৪ সালের জুনে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ইতোমধ্যে আগের ঠিকাদারের কার্যাদেশপত্র বাতিল করা হয়েছে। পরে এই প্রকল্পের বাকি কাজটুকু শেষ করার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এই মুহূর্তে ঠিকাদার যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। আশা করছি আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে জনসাধারণের জন্য হাসপাতালটি উন্মুক্ত করে দেওয়া যাবে। এতে এলাকাবাসী চিকিৎসা সুবিধা পাবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও অনিয়ম এতটাই স্পষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে সাতবার সময় বৃদ্ধি দেওয়া হলো কেন? কেন আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? আর দীর্ঘদিন ধরে জনগণ যে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তার দায়ভার কে বহন করবে?
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দায় নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দ্রুত কাজ সম্পন্ন করে হাসপাতালটি চালু করা হবে। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিনের মতোই জনগণের জন্য অপূর্ণ স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে।