স্টাফ রিপোর্টার : নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা, নাকি কমিশন (পিসি) আদায়ের দ্বন্দ্ব-এই প্রশ্নকে ঘিরে প্রায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ছয়তলা একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজে। প্রায় ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ঠিকাদার ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে প্রকল্পটি এখন কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের এই দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী।
প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঢাকাস্থ দারুস ছালাম সাউথ কল্যানপুরের মেসার্স মিরণ এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানটির নামে স্থানীয় মেসার্স ইডেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো: রেজাউল আলম কাজটি বাস্তবায়ন করছেন। তিনি সাংবাদিকদের অভিযোগ করে বলেন, তারা নির্ধারিত মান অনুযায়ী বালু ও পাথর সরবরাহ করলেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেজমেন্ট ঢালাইয়ের অনুমতি দিচ্ছেন না।
প্রকল্পটির মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঢাকার দারুস সালাম এলাকার সাউথ কল্যাণপুরের মেসার্স মিরণ এন্টারপ্রাইজ। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে স্থানীয়ভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করছেন মেসার্স ইডেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রেজাউল আলম। তিনি অভিযোগ করেন, নির্ধারিত মান অনুযায়ী বালু ও পাথর সরবরাহ করা হলেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অযৌক্তিকভাবে বেজমেন্ট ঢালাইয়ের অনুমতি দিচ্ছেন না। তার দাবি, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৫ থেকে ৭ শতাংশ কমিশন (পিসি) না দেওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে নির্মাণকাজে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং অকারণে দীর্ঘসূত্রিতা করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "আমরা সম্পূর্ণ মানসম্মত বালু ও পাথর সরবরাহ করেছি। তারপরও বেজমেন্ট ঢালাইয়ের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। কমিশন না দেওয়ায় বিভিন্ন অজুহাতে কাজ আটকে রাখা হয়েছে। যদি কোনো নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রকৌশল বিভাগের আপত্তি থাকে, তবে পরীক্ষার মাধ্যমে তা প্রমাণ করা হোক। প্রয়োজন হলে আমরা সেই সামগ্রী পরিবর্তন করতেও প্রস্তুত।"
অন্যদিকে ঠিকাদারের আনা কমিশন দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
নড়াইল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অরুনাভ রায় বলেন, “কাজের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। ঠিকাদার যে বালু ও পাথর সরবরাহ করেছেন, তা নির্ধারিত মানের নয়। নিয়ম অনুযায়ী মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ না করলে দ্রুত তার কার্যাদেশ বাতিল করা হবে এবং নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
তার দাবি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কোনোভাবেই নির্মাণকাজ চালানোর সুযোগ নেই। দুই পক্ষের বিরোধের কারণে বিদ্যালয়জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম অচলাবস্থা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের অধিকাংশ জায়গাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বালু ও পাথর। ফলে বিদ্যালয়ের নিয়মিত প্রারম্ভিক সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া মাঠ ব্যবহার করতে না পারায় শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সামান্য বাতাসেই পুরো মাঠ ধুলায় ছেয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন ধুলাবালির ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। নতুন ভবনের বেজমেন্ট নির্মাণের জন্য খনন করা বিশাল গর্তে বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী জলাশয়।
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে ছোট শিক্ষার্থীদের দুর্ঘটনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন বেড়েছে, তেমনি জমে থাকা পানি মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। এমন অবস্থায় দ্রুত প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মহিউদ্দিন বলেন, “কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারের এই অচলাবস্থার কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মাঠের অধিকাংশ জায়গা দখল হয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করতে পারছে না, সমাবেশও করা যাচ্ছে না। আমরা চাই দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হোক এবং নির্মাণকাজ আবার শুরু হোক।”
স্থানীয়দের মতে, প্রকল্পে সত্যিই যদি কমিশন দাবির ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আবার ঠিকাদারের সরবরাহ করা নির্মাণসামগ্রী যদি নিম্নমানের হয়ে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
তাদের মতে, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের এই লড়াইয়ের কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশ্ন এখন একটাই-কমিশনের অভিযোগ সত্য, নাকি সত্যিই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে-তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত সত্য উদঘাটন এবং প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করার দাবি জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।