নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালুখালী গ্রাম—নিরিবিলি, সাধারণ মানুষের বসতি। দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসফেরত শ্রমিক, ইজিবাইকচালক—এমন মানুষদের জীবন-সংগ্রামের গল্পেই ভরা এই জনপদ। সেখানেই গত সপ্তাহে ঘটেছে এক বিরল ও হৃদয়বিদারক ঘটনা।
দশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর সন্তানপ্রাপ্তির অপেক্ষায় ছিলেন মহসিন মোল্যা ও সালমা বেগম দম্পতি। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, চিকিৎসা, মানসিক চাপ—সবকিছুর ভেতর দিয়ে অবশেষে তারা জানতে পারেন, সালমার গর্ভে একাধিক সন্তান রয়েছে। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি রিপোর্টে ছয় সন্তানের কথা জানা গেলেও বাস্তবে জন্ম নেয় সাতটি নবজাতক—চার ছেলে ও তিন মেয়ে।
খবরটি গ্রামে পৌঁছাতেই কৌতূহল আর বিস্ময়ে ভরে ওঠে চারপাশ। কেউ বলেছে, “এ তো আল্লাহর বিশেষ রহমত”, কেউ আবার শঙ্কিত কণ্ঠে বলেছে, “এতগুলো সন্তান একসঙ্গে—মা কি সামলাতে পারবে?” প্রত্যাশা আর উদ্বেগের মাঝামাঝি অবস্থায় দিন গুনছিল পরিবার।
কিন্তু নিয়তির নির্মমতায়, আনন্দের সেই সম্ভাবনা শোকে পরিণত হয় খুব দ্রুতই।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস আগে প্রসববেদনা শুরু হয়। গভীর রাতে সালমাকে যশোরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে দুই নবজাতক ভূমিষ্ঠ হয়। এরপর একে একে জন্ম নেয় আরও পাঁচটি শিশু। প্রতিটি নবজাতকের ওজন ছিল মাত্র প্রায় ২০০ গ্রাম। চিকিৎসকদের ভাষায়, তারা ছিল অত্যন্ত অপরিপক্ক।
চিকিৎসকরা জানান, এত কম সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন। প্রত্যেকটির হৃদস্পন্দন ছিল, কিন্তু শারীরিক পরিপক্কতা না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধা দিয়েও তাদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিভে যায় সাতটি প্রাণের আলো।
এই ঘটনার পর কালুখালী গ্রামে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। যে কৌতূহল ছিল, তা রূপ নেয় গভীর সহমর্মিতায়। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সাত নবজাতককে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ছোট ছোট সাতটি কবর—একই সারিতে—গ্রামের মানুষের মনে এক অমোচনীয় দাগ রেখে যায়।
দাদা আব্দুল লতিফ মোল্যার কণ্ঠে ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল শুধু হাহাকার। তিন বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালান তার ছেলে মহসিন। দীর্ঘ দশ বছর পর যখন ঘরে সন্তানের আগমনের খবর এল, তখন যেন নতুন করে স্বপ্ন বোনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো কবরস্থানের মাটিতে শুয়ে আছে—এই বাস্তবতা মানা কঠিন।
নবজাতকদের দাদী মঞ্জুরা খাতুন জানান, প্রসববেদনা উঠতেই দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। তার ভাষায়, “একসঙ্গে সাতটা বাচ্চা হবে শুনে সবাই খুশি হয়েছিল। এখন সেই জায়গাটাই ফাঁকা।”
গ্রামের এক শিক্ষক বলেন, খবরটি শোনার পর গ্রামের মানুষ হাসপাতালে খোঁজ নিতে শুরু করে। অনেকেই সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউই ভাবেননি, এমন পরিণতি অপেক্ষা করছে।
চিকিৎসা-পরিসংখ্যান বলছে, একাধিক সন্তানের গর্ভধারণ (multiple pregnancy) স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে পর্যাপ্ত চিকিৎসা-পর্যবেক্ষণ ও পুষ্টির অভাব থাকলে জটিলতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রি-ম্যাচিউর বা অপরিপক্ক জন্মের ক্ষেত্রে নবজাতকের ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত না হওয়ায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই ঘটনার সামাজিক দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকা দম্পতিদের ওপর গ্রামীণ সমাজে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা অনেক সময় অদৃশ্য ক্ষতের মতো। সন্তানপ্রাপ্তির খবর সমাজে যেমন আনন্দ আনে, তেমনি তার বিপর্যয় পুরো সম্প্রদায়কে শোকাহত করে।
কালুখালীর মানুষ এখন শুধু একটি প্রার্থনাই করছেন—সালমা বেগম যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। সাত সন্তানের হারানোর শোক যে সহজে কাটবে না, তা বলাই বাহুল্য। তবে জীবনের বাস্তবতা হলো, শোকের মধ্য দিয়েও মানুষকে বাঁচতে হয়, আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে হয়।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন কেবল আনন্দের নয়, অনিশ্চয়তারও নাম। প্রত্যাশা কখনো কখনো আমাদের দূরে নিয়ে যায়, আবার বাস্তবতা আমাদের মাটিতে নামিয়ে আনে। তবুও মানুষ আশা ছাড়ে না। হয়তো এই পরিবারও একদিন নতুন আলো দেখবে—অন্য কোনো পথে, অন্য কোনোভাবে।
সাতটি ছোট্ট কবর আজ কালুখালীর মানুষের কাছে শুধু শোকের স্মারক নয়, বরং জীবন কতটা ভঙ্গুর—তার নীরব স্মারক।