দখল-দূষণে বিপর্যস্ত চিত্রা: ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার নদী এখন সংকটে
পর্যটন সম্ভাবনাময় নড়াইল জেলার ব্র্যান্ডিংয়ের অন্যতম নিয়ামক চিত্রা নদী। জেলার স্লোগান— “ক্রীড়া, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ—চিত্রার কোলে নড়াইল সমৃদ্ধ”—এই নদীকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে অসংখ্য ছোট-বড় নদীর মধ্যে সৌন্দর্যে চিত্রার তুলনা খুব কমই মেলে।
প্রগাঢ় সবুজে ঘেরা, শ্যামল আল্পনায় বেষ্টিত, আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে কাকচক্ষুর মতো স্বচ্ছ জলের শান্ত প্রবাহ—এই ছিল চিত্রার রূপ। নদীর দুই পাড়জুড়ে সাজানো বৃক্ষরাজি, ছায়াঘেরা পরিবেশ, পটে আঁকা ছবির মতো সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে চিত্রা ছিল নড়াইলের প্রাণ।
এই পললভূমিতেই বেড়ে উঠেছেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ, বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতান, জারী সম্রাট মোসলেম উদ্দিন, চারণকবি বিজয় সরকার, উপমহাদেশের বিখ্যাত সেতারবাদক রবি শংকর, নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর, কথাসাহিত্যিক ড. নিহার রঞ্জন গুপ্ত, সুরকার কমল দাশগুপ্ত এবং ক্রীড়া জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। অর্থাৎ নড়াইলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার সঙ্গে চিত্রার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
চিত্রার উৎস, প্রবাহ ও সংযোগস্থল
চিত্রা নদীর উৎপত্তি চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে। সেখান থেকে ঝিনাইদহ ও মাগুরা অতিক্রম করে নড়াইল সদরের গড়েরঘাট হয়ে গোড়াখালী সংযোগস্থলে এসে চিত্রা মিলিত হয়। এরপর পৌরসভা এলাকা, আউড়িয়া, হবখালী, চন্ডিবরপুর, শিংগাশোলপুর এবং কালিয়া উপজেলার পুরুলিয়া, পাঁচগ্রাম ও পেড়লী ইউনিয়নের অংশ ঘেঁষে হামিদপুর বা গাজিরহাটে নবগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে শেষ হয়।
একসময় এই নদীপথ ছিল বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম। পাশ্ববর্তী ভারত থেকেও নৌপথে বাণিজ্য চলতো। এখন সেই স্মৃতি ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।
১৩৯ অবৈধ দখলদার: কাগজে-কলমে উচ্ছেদ, বাস্তবে স্থবিরতা
সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্যমতে, সদরের আউড়িয়া অংশে ৯৯ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত হয়েছে। এসব দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা বিজ্ঞ সদর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
হবখালী অংশে ৩১ জন চিহ্নিত দখলদারের কেস নথি সৃজনের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি), নড়াইল সদরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কালিয়ার পেড়লী অংশে ৯ জন অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ৭ এপ্রিল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
নদী সুরক্ষা আইনের আওতায় গঠিত নদী কমিশন নদীর নামকরণ, উৎপত্তিস্থল ও সংযুক্তস্থল চিহ্নিত করে এসি ল্যান্ড ও সার্ভেয়ার দিয়ে নদীর পেরিফেরি নির্ধারণ করেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মোট অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ১৩৯ জন।
লীজের আড়ালে দখল: দীর্ঘ ৩০-৪০ বছরের বাস্তবতা
নদীর পেরিফেরি যথাযথভাবে চিহ্নিত না হওয়ায় বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী মহল অফিস ‘ম্যানেজ’ করে নদীর জমি লীজ নিয়েছে। দেখা গেছে, সরকার এক শতক জায়গা লীজ দিলেও লীজগ্রহীতা আরও ৩-৪ শতক নদীর পেরিফেরি দখল করে স্থায়ী দালান-কোঠা নির্মাণ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক শতক লীজের ভিত্তিতে দখলকৃত অতিরিক্ত জমির দাবি করে অনেকেই দেওয়ানি মামলা দিয়ে প্রায় ৪০-৫০ বছর ধরে বসবাস করছেন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছেদ তালিকা তৈরির তোড়জোড় দেখা গেলেও কিছুদিন পর কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে যায়—এমন অভিযোগ সচেতন মহলের।
সেতু, ঘাট ও দূষণ: নদীর বুকেই চাপ
ঘোড়াখালী থেকে পেড়লী পর্যন্ত অংশে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ হয়েছে—চিত্রা সেতু, এস এম সুলতান সেতু (মাছিমদিয়া-আউড়িয়া পয়েন্ট) এবং সিংশোলপুর-রঘুনাথপুর পয়েন্টে আরেকটি সেতু।
কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি বেড়েছে দূষণ। বিশেষ করে রূপগঞ্জ বাজারের আবর্জনা ও পয়ঃনিষ্কাশন সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। মানুষের বিলাসবিনোদনের জন্য শতাধিক ইটের পাকা ঘাট নির্মাণ হয়েছে। অনেক স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা নদীর পেরিফেরির ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।
জোয়ার-ভাটা নেই, নেই স্রোত: জেলেদের হাহাকার
একসময় এই নদী ছিল জেলেদের আয়ের একমাত্র উৎস। এখন জোয়ার-ভাটা না থাকায় ও পানির স্বল্পতায় মাছের প্রজাতি কমে গেছে।
জেলেদের ভাষ্যে:
“এই নদীতে এক সময় আমরা চাইপলে মাছ, বিভিন্ন প্রকার চিংড়ি, ট্যাংরা, পুটি, বাইলে সহ অনেক প্রজাতির মাছ ধরেছি—আহনে সামান্য কিছু ভুষি ইচে চিংড়ি পাই, তাতে সংসার চলে না। মাছ না হওয়ার কারণ—নদীতে আগের মতো জোয়ার-ভাটা নেই, পানি নেই। এই নদী কাটলিও জল আসবে না। নদী যদি কাটে ১০ হাত, ভরন পড়তিছে ১৫ হাত। গাংগে নেই সোত।”
নদীতীরবাসী ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
নদীতীরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা জানান: “এই নদীতে এখন বড় বড় কার্গো চলতে পারে না। এখন তো চিত্রানদী শেষপ্রান্তে। বাঁধ আর নদীতে আবর্জনা ফেলে নদীটারে শেষ করে ফেলতেছে।”
রূপগঞ্জ বাজারের কিছু ব্যবসায়ী স্বীকার করেন:
“আমরা নিজেরাই বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলে নদী দূষণ ও ভরাট করে ফেলতেছি। নদী রক্ষার জন্য নিজেদেরকেও সচেতন হতে হবে। শুধু আইন ও প্রশাসন দিয়ে নদীর দূষণ ও দখল বন্ধ করা যাবে না।”
প্রবীণ নৌপথ ব্যবহারকারীর স্মৃতিচারণ
৫০-৬০ বছর আগে এই নদী দিয়ে লঞ্চ, স্টিমার, টাবুইরা নৌকা, গয়না নৌকা চলাচল করতো। এখনও কিছু ইঞ্জিনচালিত ট্রলার পণ্য পরিবহন করে।
এক প্রবীণ নৌপথ ব্যবহারকারী বলেন, “এই নদীপথেই আমার সারা জীবন কাটায় দিলাম। আমি দেখিছি এই নদীতে স্টিমার, লঞ্চ চলিছে। তখন স্রোতের আবহাওয়া ছিল বেশি। এখন স্রোত নেই, নদীতে চরা। নদীতে স্রোত না থাকলে নদী ভরাট তো এমনিতেই হবে।”
পরিবেশ কর্মীদের অভিযোগ
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইল জেলার সভাপতি শাহ্ আলম বলেন, “এই চিত্রানদী এখন দখল ও দূষণে প্রায় মৃত! এখানকার প্রভাবশালী একটা মহল নদীটা দখল করে বাড়িঘর বানাচ্ছে। এইসব দখল প্রশাসনের পরোক্ষ সহযোগিতায় হইছে বলে আমি করি। আমরা বারবার সরকারের কাছে আবেদন করেছি নদী দখলমুক্ত করার জন্য। মাঝে মধ্যে প্রশাসন উদ্যোগও নেয়, কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে কেচ-কারবার দেখাইয়ে কাজগুলো বন্ধ হয়ে যায়—কিন্তু নদী আর দখলমুক্ত হয় না।”
সচেতন নাগরিক যাযাবর মনির বলেন, “এই চিত্রানদীকে আমরাই নষ্ট করে ফেলেছি। চিত্রার পাড় দখল হয়ে চিত্রানদীর গতিপথ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রত্যেকটা সরকার আমলে শুনি দখলমুক্ত করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দখলমুক্ত হয় না, বরং আরও দখল হয়।”
শরীফ মুনির হোসেন বলেন, “প্রায় ৩০-৪০ বছর ধরে এই চিত্রানদীকে দূষণ ও দখলমুক্ত করার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায়নি। কোন এক অজানা কারণে থেমে যায় নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার কাজ।”
নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, “এই চিত্রানদীর মাধ্যমে নড়াইল জেলাটা সকলের কাছে পরিচিত। এই চিত্রাকে সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা খতিয়ে দেখছি এখানে কোন অবৈধ স্থাপনা আছে কিনা। অবৈধ স্থাপনার তালিকা করে আপনাদের সমন্বয়ে আমাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবো। যদি কোন অবৈধ স্থাপনা পাওয়া যায়, সেই তালিকা অনুযায়ী পরিকল্পনা করছি—আপনারা শিগগিরই দেখতে পাবেন।”
উপসংহার: চিত্রা বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
চিত্রা নদী শুধু একটি জলধারা নয়—এটি নড়াইলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পরিচয়ের অংশ। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল, দূষণ ও স্রোতহীনতার কারণে নদীটি আজ অস্তিত্ব সংকটে।
প্রশাসনিক উদ্যোগ, আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক সচেতনতা—সবকিছুর সমন্বয় ছাড়া চিত্রাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। নড়াইলের ব্র্যান্ডিংয়ের প্রাণ যদি চিত্রা হয়, তবে সেই প্রাণকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।