বিজ্ঞাপন

আফরা নদীর ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে শেখহাটি: কবরস্থান, বাজার ও দুই শতাধিক পরিবারের জীবন-জীবিকা রক্ষায় স্থায়ী বাঁধের দাবি

  • নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নে আফরা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে দুই শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও বাগান হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
  • ঐতিহ্যবাহী শেখহাটি বাজারের বড় অংশ এবং কবরস্থানের বিস্তীর্ণ এলাকা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
  • ভুক্তভোগীরা মানববন্ধন করে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
আফরা নদীর ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে শেখহাটি: কবরস্থান, বাজার ও দুই শতাধিক পরিবারের জীবন-জীবিকা রক্ষায় স্থায়ী বাঁধের দাবি
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

স্টাফ রিপোর্টার : নড়াইল জেলার সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নে আফরা নদীর অব্যাহত ভাঙন এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের বাসস্থান, জীবিকা, মর্যাদা ও মৃত স্বজনদের সমাধিস্থল রক্ষার মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর আশ্বিন-কার্তিক মাস এলেই নদীর পূর্ব তীরজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ ভাঙন। এতে ঐতিহ্যবাহী শেখহাটি বাজার, কবরস্থান, বসতভিটা, বাগান ও শত শত মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে বৈরাগির ঘাট থেকে তপনবাগ কাঠালিয়ার ঘাট পর্যন্ত নদীতীরে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন থেকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হয়।

আফরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অভ্যন্তরীণ নদী। নদীটি নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের চিত্রা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নে ভৈরব নদীতে মিলিত হয়েছে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীতে জোয়ার-ভাটার প্রভাব রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বেশি ভাঙনের শিকার হচ্ছে নড়াইল সদরের শেখহাটি ইউনিয়নের বৈরাগির ঘাট থেকে তপনবাগ কাঠালিয়ার ঘাট পর্যন্ত প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার এলাকা। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত শেখহাটি বাজারসহ প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি নদীভাঙনের শিকার হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর তীরে অবস্থিত কবরস্থানের উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত ভাঙনের কারণে নতুন নতুন অংশ নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ভাঙন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মৃত ব্যক্তিদের দাফনের জায়গাও অবশিষ্ট থাকবে না।

এলাকার বহু বছরের পুরোনো শেখহাটি বাজারেরও বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারটি শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
“পৈত্রিক ভিটা রক্ষার জন্য সরকারের সহযোগিতা চাই”

মানববন্ধনে অংশ নিয়ে ভুক্তভোগী মিজান শেখ বলেন, “আমাদের বসতভিটা, বাগানের গাছপালা একের পর এক নদীতে চলে যাচ্ছে। সরকার যদি দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেয়, তাহলে অন্তত আমাদের পৈত্রিক ভিটা রক্ষা পাবে।”
নদীভাঙনের শিকার শিরিন আক্তার বলেন, “নদীর পাড়ে আমাদের কবরস্থান ভাঙতে ভাঙতে প্রায় সবটাই নদীতে চলে গেছে। এরপর কেউ মারা গেলে দাফনের জায়গাটুকুও থাকবে না। সরকার যেন দ্রুত বাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা করে।”

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর লতিফ বলেন, “আশ্বিন-কার্তিক এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। প্রতিবছর একটু একটু করে বসতভিটা, বাগান, জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। দেড় থেকে দুই শত পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।”

ভুক্তভোগী হাফিজুর রহমান সরদার জানান, দীর্ঘদিন ধরে নদীপাড়ের মানুষ ভাঙনের দুর্ভোগ বয়ে বেড়াচ্ছেন। একইভাবে তারিকুল ইসলাম, মৃত্যুঞ্জয় ধর ও কৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাদের বসতভিটা ও সম্পদ হারানোর আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি জানান— ভাঙনপ্রবণ এলাকায় অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ; বৈরাগির ঘাট থেকে তপনবাগ কাঠালিয়ার ঘাট পর্যন্ত স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প গ্রহণ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজীত কুমার সাহা বলেন, বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। যদি এটি জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পড়ে, তাহলে সাময়িক বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প (ডিপিপি) প্রণয়ন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

আফরা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, এটি শুধু নদীতীর রক্ষার বিষয় নয়; বরং নিরাপদ বাসস্থান, জীবিকা, সম্পদ ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। স্থানীয়দের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শেখহাটি ইউনিয়নের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। 

বিজ্ঞাপন