• 15 Jun, 2024

ভোট প্রস্তুতির চূড়ান্ত বার্তা দেবেন শেখ হাসিনা

ভোট প্রস্তুতির চূড়ান্ত বার্তা দেবেন শেখ হাসিনা

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। তাই এই নির্বাচন হবে অত্যন্ত কঠিন-এমন একটি বার্তা দিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ থাকছে রোববার (৬ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সভায় দলীয় ঐক্য সুসংহত করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেবেন বলে জানা গেছে।

সেই লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তার বক্তৃতা সাজিয়েছেন। গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র  এই তথ্য জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বৃহস্পতিবার  বলেন, আসলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের বিশেষ এই বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিকনির্দেশনামূলক বার্তা দেবেন। সেখানে নির্বাচনের প্রস্তুতি ছাড়াও দলীয় ঐক্য সুসংহত ও সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয় রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বৃহস্পতিবার রাতে  বলেন, বর্তমান সময়ে ডাকা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে শেখ হাসিনা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। সেই নির্বাচনে সব দলীয় কোন্দল বা রেষারেষি পরিহার করে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে পারলে বিজয় আসবে বলে দল মনে করছে। এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূল পর্যন্ত ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও জনগণের দোরগোড়ায় বারবার গিয়ে ভোট প্রার্থনা করা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অব্যাহত রেখে বিজয় সুনিশ্চিত করার জন্য দলের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা প্রদান করবেন এবং আওয়ামী লীগের তৃণমূলের পরামর্শ শুনবেন।

সূত্র জানায়, সারা দেশ থেকে আওয়ামী লীগের প্রায় তিন হাজার নেতা, সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধি বিশেষ বর্ধিত সভায় উপস্থিত থাকবেন। সকাল সাড়ে দশটায় এই সভা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতা করবেন। অন্য সময়ের চেয়ে এবার তৃণমূল নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তৃতার সুযোগ কম থাকছে বলে জানা গেছে। এক নেতা আরেক নেতার সমালোচনা, দলীয় এমপি অথবা জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে তোপ দাগবেন সেই পরিস্থিতি এড়ানোর চেষ্টা করবে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড। সে কারণে এবার তৃণমূলের কমসংখ্যক প্রতিনিধিকে বক্তৃতার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

দলীয় ঐক্য সুসংহত করে সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলার তাগিদও থাকছে আওয়ামী লীগের এই বিশেষ বর্ধিত সভায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড মনে করছে, বিএনপির চলমান আন্দোলন প্রতিরোধে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিগুলোতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেলেও এতে অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপি সম্পৃক্ত নন। দলের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করেও তারা (মন্ত্রী-এমপিরা) রাজপথে নেই। সে কারণে এই বিশেষ বর্ধিত সভায় সতর্ক করা হবে মন্ত্রী-এমপিদের। দলের কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। হুঁশিয়ার করে দেওয়া হতে পারে, এর ব্যত্যয় হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দলীয় মনোনয়নে।

আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিশেষ বর্ধিত সভায় উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। জেলা বা মহানগর এবং উপজেলা বা থানা বা পৌর (জেলা সদরে অবস্থিত পৌরসভা) আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা এ সভায় উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের বর্ধিত সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর বাইরে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আওয়ামী লীগের সব সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত দলীয় চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার দলীয় মেয়রদের।

প্রথমে ৩০ জুলাই বর্ধিত সভার তারিখ নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু পরে তারিখ পরিবর্তন করে ৬ আগস্ট বিশেষ বর্ধিত সভার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের এ ধরনের বিশেষ বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয় ছয় বছর আগে ২০১৭ সালের ২৩ জুন। সেবারও সামনে ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের ওই বর্ধিত সভায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে কথা বলেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সারা দেশ থেকে আসা নেতারা। বর্ধিত সভায় শেখ হাসিনার নির্দেশ ছিল ব্যক্তি নয়, নৌকা প্রতীক দেখে ভোট দিতে হবে। আলোচিত-সমালোচিত ওই সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় যাওয়ার টিকিট পায় আওয়ামী লীগ। 

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে তার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। স্যাটেলাইট, টানেল ও মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। লোডশেডিংয়ের ধকল কাটিয়ে দেশের মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেয়েছে। রাস্তাঘাট, রেল যোগাযোগ ও অবকাঠামোর প্রভূত উন্নতি হয়েছে। মহামারি করোনার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্ধিত সভায় আওয়ামী লীগ এবং দলের নেত্রী শেখ হাসিনার এই সাফল্যের সংবাদ আগামী নির্বাচনের আগে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এই কাজটিকে যে আওয়ামী লীগ বিশেষ গুরুত্ব দেবে তা জানাবেন শেখ হাসিনা। এজন্য দলীয় নেতা, সংসদ সদস্য এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হবে সরকার ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রকাশনা। দেওয়া হবে সরকারের উন্নয়ন নিয়ে তৈরি প্রামাণ্য চিত্রের সিডি। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের এই চিত্র যদি ভালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়, তাহলে বিএনপির অপপ্রচারে জনগণ বিভ্রান্ত হবে না এবং নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে-সে বিষয়ে আশ্বস্ত করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক জানিয়েছেন, বিশেষ এই বর্ধিত সভার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা, সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের মনের মধ্যকার ভীতি দূর করার চেষ্টা থাকবে। র‌্যাব-পুলিশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন ভিসানীতি এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের তৎপরতা, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিসহ তাদের মিত্র দলগুলোর একদফার আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল মাধ্যমে সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চলছে, সে নিয়েও উদ্বিগ্ন ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীরা। এসব প্রতিবন্ধকতা ও অপপ্রচার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না-বর্ধিত সভায় এমন আশ্বাস দিয়ে তৃণমূল নেতাদের মনোবল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা থাকবে।