• 17 Jun, 2024

স্পেশাল অলিম্পিক সাঁতারে স্বর্ণপদক পাওয়া রূপালীকে নড়াইলে ডিসির সংবর্ধনা

স্পেশাল অলিম্পিক সাঁতারে স্বর্ণপদক পাওয়া রূপালীকে নড়াইলে ডিসির সংবর্ধনা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নড়াইলের মেয়ে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী রূপালী খাতুন (১৪) জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিক ওয়ার্ল্ড সামার গেমস-২০২৩-এ সাঁতারে শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগি হিসেবে ১টি স্বর্ণপদক ও ১টি ব্রোঞ্জপদক জিতেছেন।

হতদরিদ্র পরিবারের বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী কিশোরী রূপালী খাতুন ১টি স্বর্ণপদক ও ১টি ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে গত বুধবার ২৮ জুন দেশে ফিরে আসেন। বাড়িতে ফেরার পরপরই বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশফাকুল হক চৌধুরী তার খোঁজখবর নেন। 

শনিবার (০৮ জুলাই) জেলা প্রশাসন ও জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে বিকাল সাড়ে ৪টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। জেলা প্রশাসকের সহর্ধমিণী জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশফাকুল হক চৌধুরী রূপালীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।  

এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, আমি যখনই শুনলাম রূপালী স্বর্ণপদক পেয়েছে। তখনই আমি বলেছি তাকে একটি সংবর্ধনা দেয়ার আয়োজন করবো আমরা। তখন আমি শুনেছিলাম ইতিপূর্বে এ জেলা থেকে যারা এই ধরনের অর্জন করেছে তাদেরকে কখনই এইভাবে সম্মান দেয়া হয়নি। আমি বললাম আগে দেয়া হয়নি তাতে কি হয়েছে। আমরা তাকে (রূপালী) দিয়ে শুরু করি। তাতে আরও প্লেয়ার জন্ম নিবে এবং অন্যরা উৎসাহিত হবে।  

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশফাকুল হক চৌধুরী আরও বলেন, আমি জানলাম বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের মধ্য থেকে রূপালীর আগেও এই জেলা থেকে অনেকে এই ধরণের কৃত্তিত্ব অর্জন করেছেন। তখন তাদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হয়নি। এটা নড়াইল জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার ব্যর্থতা এবং নড়াইলবাসীরও ব্যর্থতা বলে আমি মনে করি।

জেলা প্রশাসকের সহর্ধমিণী জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি শারমিন চৌধুরী বলেন, রূাপালীকে আমরা আজকের এ অনুষ্ঠানে মধ্যমনি হিসেবে পেয়েছি। ওর বাবার কথা আমার খুব ভালো লেগেছে। মেয়ে হিসেবে বাবা-মা’রা মনে করেন মেয়েরা কিছু করতে পারে না। আসলে মেয়েরা চাইলে অনেক কিছু করতে পারে। সে (রূপালী) স্পেশাল চাইন্ড হিসেবে সে এতো যে একটা সুনাম সবার জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে এটা আসলেই গর্বের ব্যাপার।

তিনি আরও বলেন, রূপালীেেক সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য জেলা ক্রীড়া সংস্থা তার সবকিছুতে যেন সহযোগিতা করে আমরাও তার পাশে থাকবো।        

এ সময় বক্তব্য রাখেন, নড়াইল পৌর মেয়র আঞ্জুমান আরা, জেলা ক্রীড়া অফিসার কামরুজ্জামন, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রাবেয়া ইউসুফ, সিকদার ফাউন্ডশনের পরিচালক সিকদার মনজুরুর রহমান পান্নু, রূপালীর গর্বিত পিতা টুকু মিয়া প্রমূখ।

অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ডিডিএলজি জুলিয়া সুকাইন, এডিসি (রাজস্ব) শাশ্বতি শীল, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কোষাধ্যক্ষ আব্দুর রশিদ মন্নু, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতি হোসনে আরা, নির্বাহী কমিটির সদস্য সালমা রহমান কবিতাসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

রূপালীর বাবা টুকু মিয়া বলেন, ‘দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে রূপালী ছোট সন্তান। জন্ম থেকেই রূপালী বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। আমার মেয়ের সফলতার জন্য আমরা গর্বিত। মেয়েটা সোনার মেডেল আনছে ঘরে তো রাখার জায়গা নাই। ঘরডা ভাঙ্গা, মেয়েডা ইশারা দিয়ে দেখায় যে কই রাখবো মেডেল।’ তারপর বুকটা আনন্দে ভওে গেছে। মেয়েটার জন্মদাতা আমি হলেও মেয়েটা আপনাগের। আমার মেয়েটা বিদেশ থেকে যে সুনাম নিয়ে আইছে সেটা দেশের জন্য। আপনারা সকলে ওর জন্যি দোয়া করবেন।

রূপালী খাতুন বরেণ্য ক্রিকেটার নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার পৈত্রিকা বাড়ি নড়াইল সদরের মাইজপাড়া ইউনিয়নের তারাশী গ্রামের মরাচিত্রা নদী পাড়ের দরিদ্র কৃষক টুকু মিয়ার (৫৫) মেয়ে। মাশরাফীর দাদা বাড়িও একেবারে মরাচিত্রা নদীর পাড়ে। রূপালী স্থানীয় বিদ্যারয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রূপালীরা দুই ভাই দুই বোন। ভাই-বোনের মধ্যে সে তৃতীয়। রূপালীর বাবা পরের জমি-জমা চাষবাস করে সংসার চালায়। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জানান যায়, ৬ সদস্যের পরিবারের থাকার একটি মাত্র জরাঝির্ণ ঘর। ঘরে নেই তেমন কোন আসবাপত্রও। একটি ঘরের ভেতরই দুটি সাদা-মাটা খাঁট। তার একটিতে দুই বোন থাকে, অন্যটিতে মা-বাব, আর দুই ভাই মিলে থাকে ওই ঘরের বারান্দায়।        

জানা গেছে, স্পেশাল অলিম্পিক ওয়ার্ল্ড সামার গেইমস-২০২৩ সাঁতার প্রতিযোগিতায় চূড়ান্ত পর্বের নড়াইলের মেয়ে রূপালী খাতুন সবাইকে পিছনে ফেলে ১টি স্বর্ণপদক ও ১টি ব্রোঞ্জপদক জিতে নেয়।

জানা গেছে, জামানির বার্লিনে স্পেশাল অলিম্পিক ওয়ার্ল্ড সামার গেমস শুরু হয় গত ১৭ জুন। এতে বিশ্বের ১৭০টি দেশ থেকে প্রায় ২৫ হাজার ক্রীড়াবিদ, কোচ এবং কর্মকর্তা ওই খেলায় যোগদান করেন।

বাংলাদেশ থেকেও ৮১ জন ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাসহ ১১৩ সদেস্যের একটি প্রতিনিধিদল খেলায় অংশগ্রহণ করতে ১২ জুন ভোর ৫টায় কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমানে করে জার্মানির বার্লিনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। নড়াইলের রূপালী খাতুনও ওই খেলায় অংশগ্রহণকারী নারী সাঁতার দলের একজন সদস্য। ওই গেমসে রূপালী ১টি স্বর্ণ ও ১টি ব্রোঞ্জ পদক পায়।