• 21 May, 2024

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থাপিত দেশের প্রথম ‘অমনি প্রসেসর’ প্রকল্প উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থাপিত দেশের প্রথম ‘অমনি প্রসেসর’ প্রকল্প উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

পরিবেশ বান্ধব, পানি, মাটি ও বায়ু দুষণরোধে কার্যকরী জ্বালানী সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বর্জ্য শোধনে সক্ষম ‘অমনি প্রসেসর’ প্রকল্পটি বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিষ্টা পেয়েছে। নি:সন্দেহে এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে সচেতন মহল আশা পোষণ করেন।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)’র অর্থায়নে বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনেএই প্রকল্পটি প্রতিষ্টা পেয়েছে। সেনেগাল ও ভারতের পর বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে ‘অমনি প্রসেসর’ প্রকল্প কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থাপিত হয়েছে।


এটি (‘অমনি প্রসেসর’ প্রক্রিয়াটি)'র সাহায্যে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, ডিস্ট্রিল্ড ওয়াটার, অ্যাস উৎপাদন করা হয়। জরুরি সহায়তা প্রকল্প (ইএপি) এর অধিনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন কক্সবাজারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

ইতিমধ্যে গত ১১-নভেম্বর, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ১৪টি প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন, তারমধ্যে উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থাপিত জ্বালানীবিহীন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বর্জ্যশোধনে এটিও একটি। জ্বালানী সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষায় এই প্রকল্পটি গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখবেন বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।


এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট তারিখে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে জোরপুর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ। এটি বিশ্বের ঘনবসতিপুর্ণ এলাকার একটিও বটে। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ঘনবসতিপুর্ণভাবে অবস্থান করায় বসবাসরত মানুষের উচ্ছিষ্ট, বর্জ্য, ব্যবহৃত প্লাস্টিক, পলিথিন, পয়ঃনিষ্কাসনের ময়লাগুলো পরিবেশ, বায়ু ও ভৌত অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে দুষিত করছিল। উখিয়া টেকনাফকে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে মুক্তি দিতে এবং সাশ্রয়ীভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানী সাশ্রয়ী ‘অমনি প্রসেসর’ প্রকল্পটি এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক ( এডিবি’র) অর্থায়নে চালু করা হয়। এটির সাহায্যে প্রতিদিন ৩০টন মলমুত্র ছাড়াও পলিথিন,ময়লা আবর্জনা শোধন হবে। এই প্রকল্প থেকে ঘণ্টায় ৬৫ কিলো ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেনেগাল ও ভারতের পরে বাংলাদেশেই এই প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে, যা একটি মাইলফলক বলে অভিহিত করেছেন দেশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারি প্রকৌশলী মো. আবুল মঞ্জুর জানিয়েছেন, কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৪ নম্বর এক্সটেনশন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে। প্রকল্পটির ভারতের অংকুর সাইন্টিফিক ও বাংলাদেশের এসআর করপোরেশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পায়। শতভাগ ভৌত অগ্রগতি শেষে বর্তমানে পরীক্ষামুলক চালু করা হয়েছে। যার অর্থায়ন করেছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
তিনি আরো বলেন, এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের প্রথম এবং বিশ্বের মধ্যে তৃতীয়। পরীক্ষামুলক চালু হওয়া প্রকল্পে প্রতিদিন ৩০ কিউবিট মিটার বা ৬ টন শুকনো পয়ঃ বর্জ্য, ৫ টন জৈব ব্যর্জ, ৫ শত কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে মোট ১১.৫ টন বজ্য পরিশোধ করতে সক্ষম। যা থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়েই মুল প্রকল্পের সকল যন্ত্রপাতি চালু রাখা হয়। ফলে এই প্রকল্পের জন্য কোন প্রকার জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ বা ভিন্ন কোন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না।


ডিপিএইচ, কক্সবাজারের নির্বাহী মোস্তফিজুর রহমান বলেন,’যেখানে আমরা প্লাস্টিক বর্জ্য, অর্গানিক বর্জ্য থেকে একটি পরিকল্পিত পদ্ধতিতে এই ‘অমনি প্রসেসর’ এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যাবতীয় বর্জ্যকে সুষ্টু ও পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বার্ণ করে পরিবেশকে যেমন সংরক্ষণ করা যাবে, তেমনি বিদ্যুৎ উতপাদনের মাধ্যমে এতদএলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা পূরণেও সক্ষম হবে’।

তিনি আরো যোগ করে বলেন, প্রকল্পের বর্জ্য পরিশোধনের পর প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১২ শত লিটার ডিস্ট্রিল্ড ওয়াটার (পানি) উৎপাদন হয়। যে পানিকে কোন আয়ন বা সলিড কোন সল্ট থাকে না, শুধু হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন আয়ন থাকে। ব্যাটারিতে এই পানি আয়নাইজ হয়ে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন আয়ন হয়ে ইলেক্ট্রিসিটি তৈরি করে এবং হাইড্রোজেন গ্যাস হয়ে থাকে। এটি বাজারজাত করা যাবে। একই সঙ্গে প্রকল্প থেকে প্রতিদিন গড়ে উৎপাদিত হচ্ছে ১২ শত থেকে ১৫ শত কেজি অ্যাস। যা সিমেন্ট সহ নানা কাজে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে চুক্তি মতে ভারতের অংকুর সাইন্টিফিক তার নিজস্ব দক্ষ জনবল দ্বারা প্রকল্পটি পরিচালনা করছেন। আগামি ২ বছরের মধ্যে অংকুর বাংলাদেশের এসআর করপোরেশনের নিজস্ব লোককে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলবেন। এরপর প্রকল্পটি এসআরকে বুঝিয়ে দেবেন। খুব অল্প জায়গায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় সুবিধাও রয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সফলতার সাথে এই প্রকল্পটি চালু হলে, এটিকে পাইলট প্রকল্প ধরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও জ্বালানীবিহীন বিদ্যুৎ উতপাদনের লক্ষ্যে এই ‘অমনি প্রসেসর’ প্রযুক্তি প্রসার করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে সুত্রে উঠে এসেছে।