বিজ্ঞাপন

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বকে প্রধানমন্ত্রীর নয় দফা আহ্বান

  • জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নয়টি প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
  • নিউইয়র্কে জাতিসংঘের দুটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি অর্থায়ন, প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
  • পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে কৃষি, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেন।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বকে প্রধানমন্ত্রীর নয় দফা আহ্বান
নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক:  জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ঠেকানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ ০.৫ শতাংশেরও কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

জলবায়ু মোকাবিলায় পাঁচ প্রস্তাব:

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি বিষয়ে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান। এগুলো হলো—

১. বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানো।
২. জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমে সহজলভ্য ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
৩. জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
৪. অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
৫. ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল কার্যকর করা এবং নিয়মিত অর্থ পুনঃপূরণের ব্যবস্থা করা।

প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি, পাটজাত পণ্য ও সার্কুলার অর্থনীতির মতো সবুজ উদ্যোগ সম্প্রসারণের কাজ চলছে। জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে চার আহ্বান:

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ এবং দেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতি উপকূলীয় এলাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের বসতবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি ও উপকূলীয় সুরক্ষায় বিনিয়োগ করছে। আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণে পদ্মা ব্যারেজ উদ্যোগ, তিস্তা ব্যারেজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তিনি চারটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেন—বিশ্বব্যাপী নিঃসরণ দ্রুত কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন অর্থায়ন নিশ্চিত করা, উপকূলীয় দেশগুলোকে প্রযুক্তি ও তথ্য-উপাত্তে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈঠক:

জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, ‘স্মার্ট ফার্মার কার্ড’, দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ-ক্রোয়েশিয়া সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন তারেক রহমান।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে আটকে থাকা জাহাজ ও কনটেইনার নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে দুই দেশের সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তি:

জাতিসংঘ অধিবেশনের সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর আগে ৩০ এপ্রিল আরও ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছিল। দুটি চুক্তি মিলিয়ে বিমানের বহরে মোট ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে নিউইয়র্ক সফরে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বিমান পরিবহন খাতে একাধিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন