বিজ্ঞাপন

২৬ সেপ্টেম্বর: রাজমুকুট থেকে মহাকাশ—এক দিনের হাজার বছরের ইতিহাস

  • ২৬ সেপ্টেম্বর ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে এক বিস্ময়কর তারিখ।
  • ১০৮৭ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন উইলিয়াম দ্বিতীয়; ১৫৮০ সালে পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষে ফেরেন ফ্রান্সিস ড্রেক; ১৭৭৭ সালে ব্রিটিশরা ফিলাডেলফিয়া দখল করে; ১৯৬০ সালে প্রথম টেলিভিশন প্রেসিডেন্ট বিতর্ক, ১৯৮৩ সালে পারমাণবিক সতর্কতার সংকট এবং ২০২২ সালে NASA-এর DART মিশন ইতিহাস গড়ে।
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে এক বিস্ময়কর তারিখ। ১০৮৭ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন উইলিয়াম দ্বিতীয়; ১৫৮০ সালে পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষে ফেরেন ফ্রান্সিস ড্রেক; ১৭৭৭ সালে ব্রিটিশরা ফিলাডেলফিয়া দখল করে; ১৯৬০ সালে প্রথম টেলিভিশন প্রেসিডেন্ট বিতর্ক, ১৯৮৩ সালে পারমাণবিক সতর্কতার সংকট এবং ২০২২ সালে NASA-এর DART মিশন ইতিহাস গড়ে।
২৬ সেপ্টেম্বর: রাজমুকুট থেকে মহাকাশ—এক দিনের হাজার বছরের ইতিহাস
এক হাজার বছরের ইতিহাসে একই তারিখে বদলে গেছে রাজনীতি, যুদ্ধ, যোগাযোগ, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও মহাকাশ গবেষণার গতিপথ

একটি তারিখ, বহু শতাব্দীর গল্প

ইতিহাসকে আমরা প্রায়ই যুদ্ধ, রাজা-বাদশাহ, বিপ্লব কিংবা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখি। কিন্তু ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে কিছু তারিখ আছে, যেগুলো যেন সময়ের বিভিন্ন অধ্যায়কে একই সুতোয় গেঁথে রাখে। ২৬ সেপ্টেম্বর তেমনই একটি দিন।

প্রায় এক হাজার বছর আগে এই দিনে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেছিলেন উইলিয়াম দ্বিতীয়। কয়েক শতাব্দী পর একই তারিখে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষে ইংল্যান্ডে ফিরেছিলেন ফ্রান্সিস ড্রেক। আবার ১৭৭৭ সালে এই দিনেই আমেরিকান বিপ্লবের উত্তাল সময়ে ব্রিটিশ বাহিনী ফিলাডেলফিয়া দখল করে।

বিজ্ঞাপন

সময়ের স্রোত আরও এগিয়ে নিয়ে যায় আমাদের ১৯৬০ সালে—যখন রাজনীতির মঞ্চে টেলিভিশনের নতুন যুগের সূচনা হয়। ১৯৮৩ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় বিশ্ব দাঁড়িয়েছিল এক বিপজ্জনক মুহূর্তের সামনে। আর ২০২২ সালে একই তারিখে মানুষ মহাকাশে একটি গ্রহাণুর গতিপথ ইচ্ছাকৃতভাবে বদলে দেওয়ার প্রযুক্তি পরীক্ষা করে।

অর্থাৎ, ২৬ সেপ্টেম্বর যেন মানবসভ্যতার পরিবর্তনের একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি—রাজতন্ত্র থেকে সাম্রাজ্য, যুদ্ধ থেকে গণমাধ্যম, শীতল যুদ্ধ থেকে গ্রহাণু প্রতিরক্ষা।

১০৮৭: ইংল্যান্ডের সিংহাসনে উইলিয়াম দ্বিতীয়

২৬ সেপ্টেম্বর ১০৮৭। নরম্যান বিজয়ের দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এই দিনে উইলিয়াম দ্বিতীয়, যিনি উইলিয়াম দ্য কনকারারের তৃতীয় পুত্র, ইংল্যান্ডের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। তাঁর রাজত্ব চলে ১১০০ সাল পর্যন্ত।

উইলিয়াম দ্বিতীয়ের সিংহাসনে আরোহণ ছিল নরম্যান শাসনের ধারাবাহিকতার অংশ। তাঁর পিতা উইলিয়াম দ্য কনকারার ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ড জয় করে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনেন। তাঁর মৃত্যুর পর ভূখণ্ড ও ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২৬ সেপ্টেম্বরের অভিষেক শুধু একজন রাজার ক্ষমতা গ্রহণের ঘটনা ছিল না; এটি নরম্যান শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতারও প্রতীক।

১৫৮০: পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষে ড্রেকের প্রত্যাবর্তন

প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে, ১৫৮০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, ইংল্যান্ডের প্লাইমাউথ বন্দরে ফিরে আসে Golden Hind। জাহাজটির নেতৃত্বে ছিলেন ইংরেজ নাবিক স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক। তিনি পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরেছিলেন।

ড্রেকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৫৭৭ সালের ডিসেম্বরে পাঁচটি জাহাজ নিয়ে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় ঝড়, জাহাজ হারানো এবং নানা বিপদের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত শুধু Golden Hind পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ইংল্যান্ডে ফেরে।

অভিযানটি ছিল শুধু ভৌগোলিক অনুসন্ধান নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ইংল্যান্ড ও স্পেনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সমুদ্রবাণিজ্য, সামরিক অভিযান এবং নতুন ভূখণ্ডে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা।

ড্রেকের প্রত্যাবর্তন তাই ইউরোপীয় সামুদ্রিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। পরবর্তীতে ১৫৮১ সালে রানি প্রথম এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধি দেন।

১৭৭৭: ফিলাডেলফিয়ায় ব্রিটিশ বাহিনীর প্রবেশ

২৬ সেপ্টেম্বর ১৭৭৭। আমেরিকান বিপ্লব তখন তীব্র পর্যায়ে। এই দিনে ব্রিটিশ বাহিনী ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে এবং শহরটি দখল করে। তখন ফিলাডেলফিয়া ছিল আমেরিকান বিপ্লবের রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোর একটি।

ব্রিটিশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার আগে দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসকে শহর ছাড়তে হয়। কংগ্রেস প্রথমে ল্যাঙ্কাস্টারে এবং পরে ইয়র্কে বৈঠক করে। ব্রিটিশরা পরের বছরের জুনে ফিলাডেলফিয়া ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত শহরটি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

এই ঘটনা আমেরিকান বিপ্লবের সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একটি শহর দখল করা মানেই যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়া নয়—ফিলাডেলফিয়ার ঘটনাপ্রবাহ সেটিই দেখায়।

১৯৬০: রাজনীতির মঞ্চে টেলিভিশনের প্রবেশ

এরপর ইতিহাসের ক্যালেন্ডার আমাদের নিয়ে যায় ১৯৬০ সালে। ২৬ সেপ্টেম্বর শিকাগোর একটি স্টুডিওতে মুখোমুখি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রধান প্রার্থী জন এফ. কেনেডি ও রিচার্ড নিক্সন।

এটি ছিল মার্কিন ইতিহাসে প্রধান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের প্রথম সরাসরি টেলিভিশন বিতর্ক। আলোচনার বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যু।

এই বিতর্ক শুধু একটি নির্বাচনী অনুষ্ঠান ছিল না। এটি দেখিয়ে দেয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি একজন নেতার ক্যামেরার সামনে উপস্থিতি ও উপস্থাপনাও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সেই সময় টেলিভিশন দ্রুত আমেরিকান পরিবারের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছিল। ফলে রাজনীতিবিদদের জনগণের কাছে পৌঁছানোর পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬০-এর সেই বিতর্ককে তাই আধুনিক টেলিভিশননির্ভর রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়।

১৯৮৩: পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার সেই রাত

২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩-এর ঘটনা আরও ভিন্ন। এটি ছিল শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্ষেপণাস্ত্র আসার সতর্কসংকেত দেখা যায়।

দায়িত্বে থাকা সোভিয়েত কর্মকর্তা স্টানিস্লাভ পেত্রভ সংকেতটিকে বাস্তব হামলা হিসেবে ধরে নেওয়ার পরিবর্তে সেটি ভুল সংকেত হতে পারে বলে সন্দেহ করেন। পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেটি প্রকৃত হামলা ছিল না। ২৬ সেপ্টেম্বরের এই ঘটনা শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত পারমাণবিক সতর্কতা সংকটগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

এই ঘটনার গুরুত্ব এখানেই যে, পারমাণবিক যুগে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, ভুল সংকেত বা ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকি কতটা গুরুতর হতে পারে—এটি সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।

২০২২: মহাকাশে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২। এবার পৃথিবীর কোনো শহর নয়, ঘটনাস্থল ছিল কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের মহাকাশ।

NASA-এর Double Asteroid Redirection Test বা DART মহাকাশযান ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রহাণু-উপগ্রহ Dimorphos-এর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। উদ্দেশ্য ছিল, একটি মহাকাশযানের আঘাতে কোনো গ্রহাণুর গতিপথ কতটা পরিবর্তন করা যায়, তা পরীক্ষা করা।

DART-এর আঘাতের আগে Dimorphos তার বড় সঙ্গী Didymos-কে প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ১১ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট সময় নিত। সংঘর্ষের পর তার কক্ষপথের সময় প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩২ মিনিট কমে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে NASA; পরবর্তী পর্যবেক্ষণে পরিবর্তনটি প্রায় ৩৩ মিনিট হিসেবে নির্ধারিত হয়।

এটি ছিল মানবজাতির প্রথম সফল পরীক্ষা, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি মহাজাগতিক বস্তুর গতি পরিবর্তন করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে পৃথিবীর দিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক গ্রহাণু এলে সেগুলোর গতিপথ পরিবর্তনের প্রযুক্তি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

এখানে ২৬ সেপ্টেম্বরের ইতিহাস যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করে—১০৮৭ সালে রাজসিংহাসন থেকে শুরু করে ২০২২ সালে মানুষের মহাকাশে প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ পর্যন্ত।

একই তারিখে ইতিহাসের এত বৈচিত্র্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

২৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—ইতিহাস শুধু যুদ্ধ বা রাজাদের গল্প নয়। মানুষের পরিবর্তনের গল্পও ইতিহাস।

১০৮৭ সালের রাজতন্ত্র আমাদের দেখায় ক্ষমতার উত্তরাধিকার কীভাবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করত। ১৫৮০ সালের ড্রেকের অভিযান দেখায় সমুদ্র কীভাবে সাম্রাজ্য বিস্তারের নতুন পথ খুলেছিল। ১৭৭৭ সালের ফিলাডেলফিয়া মনে করিয়ে দেয়, একটি শহর দখল রাজনৈতিক সংগ্রামের গতিপথে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

১৯৬০ সালের টেলিভিশন বিতর্ক দেখায় প্রযুক্তি কীভাবে রাজনীতির ভাষা বদলে দেয়। ১৯৮৩ সালের পেত্রভ-ঘটনা দেখায়, পারমাণবিক যুগে একটি সতর্কসংকেত কত বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আর ২০২২ সালের DART মিশন দেখায়, মানুষ এখন শুধু মহাকাশ পর্যবেক্ষণেই সীমাবদ্ধ নেই—প্রয়োজনে মহাজাগতিক বস্তুর গতিপথ পরিবর্তনের প্রযুক্তিও পরীক্ষা করছে।

একটি ক্যালেন্ডারের পাতায় তাই একসঙ্গে দেখা যায় রাজমুকুট, সমুদ্রযাত্রা, যুদ্ধ, গণমাধ্যম, পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং মহাকাশ বিজ্ঞান।

২৬ সেপ্টেম্বরের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—সময় এগিয়ে যায়, প্রযুক্তি বদলে যায়, রাষ্ট্রের সীমারেখা বদলে যায়; কিন্তু প্রতিটি যুগের সিদ্ধান্তই পরবর্তী ইতিহাসের জন্য কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে যায়।


বি:দ্র: সংগৃহীত তথ্য সমন্বয় তৈরি করা- সম্পাদক, নড়াইলকণ্ঠ.কম

বিজ্ঞাপন