বিজ্ঞাপন

সংস্কারের চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি: সূচকে স্বস্তি এলেও সাধারণের রান্নাঘরে কবে মিলবে সমাধান?

  • একটি গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি।
  • ডলার সংকটের ধাক্কা সামলে মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্থিতি ফেরাতে এবং আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষত সারাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় দফায় দফায় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
  • সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে ইতিবাচক সংকেত দিলেও, তার সুফল এখনো সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছায়নি।
সংস্কারের চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি: সূচকে স্বস্তি এলেও সাধারণের রান্নাঘরে কবে মিলবে সমাধান?
সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও ডলার দরের স্থিতিশীলতায় সামষ্টিক স্বস্তির আভাস; তবে বাজার সিন্ডিকেট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সাধারণ ভোক্তার পিছু ছাড়ছে না

সামষ্টিক অর্থনীতিতে সংস্কারের চাপ ও মুদ্রানীতির কঠোরতা
​মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টানতে ধারাবাহিক নীতি সুদহার বাড়িয়ে দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমেছে। তাত্ত্বিকভাবে বাজারে অর্থের সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এই চেষ্টা চালানো হলেও, মাঠপর্যায়ে উৎপাদনশীল ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা (SME) এখন বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছেন।

​অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে বেঁধে রাখা ডলার দর থেকে সরে বাজারভিত্তিক ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি কার্যকরের ফলে ডলারের আনুষ্ঠানিক লেনদেন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দ্রুত ক্ষয় কিছুটা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। তবে জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন খাত এখনও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে।

​রান্নাঘরের বাস্তবতা:

বিজ্ঞাপন

বাজার সিন্ডিকেট ও ভোক্তা অধিকারের ফাঁকফোকর
​সামষ্টিক সূচকের পরিসংখ্যান যাই বলুক, সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের চাল-ডাল-তেল ও কাঁচাবাজারের হিসাব একেবারেই ভিন্ন। মাঠপর্যায়ে কৃষক যে দামে সবজি বা ফসল বিক্রি করছেন, রাজধানী বা জেলা সদরের খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সেই পণ্যের দাম অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তিনগুণে দাঁড়াচ্ছে।

​বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই সংকটের পেছনে তিনটি মূল কারণ সক্রিয়:
​মোকাম ও আড়তের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ: পাইকারি আড়তগুলোতে মূল্যতালিকা প্রদর্শনের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। হাতে গোনা কয়েকটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম ওঠানামা করাচ্ছে।

​চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্য: পণ্য পরিবহনের প্রতিটি ধাপে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন এবং আড়তদারদের বাড়তি কমিশন সরাসরি সাধারণ ভোক্তার পকেট কাটছে।

​ভ্রাম্যমাণ আদালতের সীমাবদ্ধতা: বাজারে সাময়িক জরিমানা করে স্থায়ী সমাধান আসছে না। প্রয়োজন সরবরাহ চেইনের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল নজরদারি এবং কৃষকের সাথে সরাসরি ভোক্তার সংযোগ স্থাপন।

​ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদান, ভুয়া নথিপত্র এবং প্রভাবশালী মহলের পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি দূর করতে বর্তমান প্রশাসন বেশ কিছু কাঠামোগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে:

দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন: তারল্য সংকটে ভোগা ব্যাংকগুলোতে নতুন পর্ষদ বসিয়ে বিশেষ অডিটের মাধ্যমে অনিয়মের তদন্ত শুরু হয়েছে।

​লুকানো ঋণের বাস্তব হিসাব প্রকাশ: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে খেলাপি ঋণের বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে আনা হচ্ছে, যা আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ফেরাতে প্রথম শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

​একীভূতকরণের ঝুঁকি এড়িয়ে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি: ব্যাংকগুলোকে দ্রুত চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের বদলে কাঠামোগত ত্রুটি দূর করে নিজস্ব সক্ষমতায় দাঁড় করানোর পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।

​এক নজরে প্রধান অর্থনৈতিক সূচক
​মূল্যস্ফীতি: ৯ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে আটকে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত।

​রেমিট্যান্স: ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সঠিক দর মেলায় বৈধ পথে প্রবাসীদের আয় পাঠানোর হার ঊর্ধ্বমুখী।
​বৈদেশিক রিজার্ভ: অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারায় গ্রস রিজার্ভ স্থিতিশীলতার পথে।

​রাজস্ব আদায়: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের গতি শ্লথ হওয়ায় এবং অটোমেশনের অভাবে রাজস্ব ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
​বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি: চড়া সুদের হারের কারণে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবসায়ীদের সতর্ক অবস্থান।
​উত্তরণের উপায়: নীতিগত অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

​অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ক্রান্তিকাল পার হতে হলে জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে:
​বিকল্প বাজার ও আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ: জেলা পর্যায়ে কৃষিপণ্য সংরক্ষণে মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে সরাসরি 'কৃষক বাজার' নেটওয়ার্ক তৈরি।

​বাজারভিত্তিক ডলার দর অব্যাহত রাখা: মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে (৬-৭%) নেমে না আসা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি সতর্ক ও কঠোর রাখা।

​কর ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন: সাধারণ করদাতাদের ওপর নতুন চাপ না বাড়িয়ে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অটোমেশনের মাধ্যমে নতুন করদাতা চিহ্নিত করা।
​অর্থপাচার ও ব্যাংক লুটেরাদের বিচার: ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা ফেরাতে আর্থিক অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ও আইনের দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন