বিজ্ঞাপন

গ্রহ নয়,চাঁদও নয়:ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করা রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু

  • মহাবিশ্বে এমন এক অদ্ভুত জগতের সন্ধান মিলেছে, যার পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বৈজ্ঞানিক কৌতূহল।
  • এটি একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করছে, অথচ এর ভর বৃহস্পতির কাছাকাছি।
  • গ্রহ, চাঁদ নাকি ভিন্ন কোনো মহাজাগতিক শ্রেণি—এই রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীরা এখন নির্ভর করছেন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ওপর।
গ্রহ নয়,চাঁদও নয়:ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করা রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু
ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণকারী বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের এক রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু নতুন করে প্রশ্ন তুলছে গ্রহ ও উপগ্রহের সংজ্ঞা নিয়ে।

বিজ্ঞান ও মহাকাশ | বিশেষ ফিচার

মহাবিশ্বের পরিচিত শ্রেণিবিন্যাসকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে CD-35 2722 নক্ষত্রব্যবস্থার এক অদ্ভুত মহাজাগতিক বস্তু। বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের এই বস্তুটি প্রদক্ষিণ করছে একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফকে, আর সেই ব্রাউন ডোয়ার্ফ ঘুরছে আরেকটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে। এটি কি এক বিশাল উপগ্রহ, নাকি অস্বাভাবিক কক্ষপথে থাকা একটি গ্রহ? ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণাটি এমন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যার উত্তর শুধু একটি নতুন জগতের পরিচয় নয়, বরং গ্রহ, উপগ্রহ ও নক্ষত্রের মধ্যকার সীমারেখা বুঝতেও গুরুত্বপূর্ণ। 

রাতের আকাশে পৃথিবী থেকে তাকালে মহাবিশ্বকে বেশ সুশৃঙ্খল বলেই মনে হয়। কোথাও নক্ষত্র জ্বলছে, কোথাও গ্রহ তাদের চারপাশে ঘুরছে, আবার কোনো গ্রহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে উপগ্রহ। সৌরজগতের পরিচিত উদাহরণগুলো আমাদের এই ধারণাকে দৃঢ় করেছে। পৃথিবীর চারপাশে চাঁদ, বৃহস্পতির চারদিকে ইউরোপা ও গ্যানিমিড, শনির চারপাশে টাইটান—প্রতিটি বস্তুর জন্য যেন আলাদা একটি পরিচয় রয়েছে। কিন্তু মহাবিশ্বের সব ব্যবস্থা যে আমাদের সৌরজগতের অনুরূপ হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। দূরবর্তী নক্ষত্রব্যবস্থায় এমন বস্তু ও কক্ষপথ থাকতে পারে, যেগুলো পরিচিত সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। CD-35 2722 ব্যবস্থায় পাওয়া নতুন উপগ্রহসদৃশ বস্তুটি সেই বাস্তবতারই এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২৬ সালের ২২ জুলাই ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO) এই আবিষ্কারের প্রমাণ প্রকাশ করে; গবেষণাটি একই সময়ে Nature সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়। তবে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন: বিজ্ঞানীরা এখনো বস্তুটিকে নিশ্চিতভাবে বহির্জাগতিক চাঁদ বা এক্সোমুন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। তাঁরা এর অস্তিত্বের পক্ষে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ পেয়েছেন, আর সেই প্রমাণই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 

বিজ্ঞাপন

এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে CD-35 2722 নামের একটি নক্ষত্র। সূর্যের তুলনায় এর ভর প্রায় অর্ধেক। নক্ষত্রটির চারপাশে ঘুরছে CD-35 2722 B নামের একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ বা বাদামি বামন। ব্রাউন ডোয়ার্ফকে অনেক সময় ব্যর্থ নক্ষত্র বলা হয়, যদিও কথাটি পুরোপুরি নির্ভুল বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নয়। সাধারণ নক্ষত্রের মতো এর কেন্দ্রে দীর্ঘস্থায়ী হাইড্রোজেন নিউক্লীয় সংযোজন বজায় রাখার মতো ভর নেই। অন্যদিকে, এটি অধিকাংশ গ্রহের তুলনায় অনেক বেশি ভারী। ফলে ব্রাউন ডোয়ার্ফকে নক্ষত্র ও গ্রহের মাঝামাঝি ভরের একটি বিশেষ শ্রেণির মহাজাগতিক বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ব্যবস্থার ব্রাউন ডোয়ার্ফটির ভর বৃহস্পতির প্রায় ৩৭ গুণ। এর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা আনুমানিক ১ হাজার ৮০০ কেলভিন, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার তুলনায় অনেক কম। তা সত্ত্বেও এটি কোনো শীতল, নিষ্ক্রিয় পাথুরে গ্রহ নয়; বরং নিজস্ব তাপ বিকিরণকারী একটি ভারী উপনাক্ষত্রিক বস্তু। 

কিন্তু বিস্ময়ের আসল জায়গাটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ নিজে নয়। তার চারপাশে আরও একটি বস্তু রয়েছে, যার ভর বৃহস্পতির প্রায় ০.৯ গুণ। অর্থাৎ ভরের হিসাবে এটি আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতির কাছাকাছি। অথচ এর কক্ষপথ একটি সাধারণ নক্ষত্রকে সরাসরি কেন্দ্র করে নয়; এটি আবর্তিত হচ্ছে ব্রাউন ডোয়ার্ফকে ঘিরে। ব্রাউন ডোয়ার্ফটি আবার মূল নক্ষত্র CD-35 2722-কে কেন্দ্র করে ঘুরছে। ফলে পুরো ব্যবস্থাটিকে তিন স্তরের মহাজাগতিক বিন্যাস হিসেবে কল্পনা করা যায়—কেন্দ্রে একটি নক্ষত্র, তার চারপাশে একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ এবং সেই ব্রাউন ডোয়ার্ফের চারপাশে বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের একটি বস্তু। পর্যবেক্ষণভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, বাইরের এই বস্তুটির একটি পূর্ণ কক্ষপথ সম্পন্ন করতে প্রায় ১৭০ দিন লাগে। 

এখানেই প্রচলিত পরিচয়ের সঙ্গে সমস্যাটি তৈরি হয়। কোনো বস্তু যদি একটি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করে, তবে তাকে সাধারণত প্রাকৃতিক উপগ্রহ বা চাঁদ বলা হয়। কিন্তু CD-35 2722 ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় বস্তুটি কোনো প্রচলিত গ্রহ নয়, একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফ। তার ওপর, ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণকারী বস্তুটির ভর এত বেশি যে সেটিকে গ্রহসদৃশ বস্তু বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাহলে কি এটি একই সঙ্গে গ্রহ এবং উপগ্রহ? নাকি এর পরিচয় নির্ধারণ করতে হলে আমাদের কেবল ভরের দিকে না তাকিয়ে কক্ষপথ, উৎপত্তি ও পুরো ব্যবস্থার গঠন বিবেচনা করতে হবে? জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘এক্সোস্যাটেলাইট’ শব্দটি এমন একটি উপগ্রহকে বোঝায়, যা সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু এক্সোমুন বা বহির্জাগতিক চাঁদ বলতে ঠিক কোন ধরনের বস্তুকে বোঝানো হবে, বিশেষত যখন সেটি একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণ করে, তা নিয়ে এখনো সর্বজনস্বীকৃত আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। গবেষণাটির গুরুত্ব এখানেই—এটি শুধু একটি অদ্ভুত বস্তু শনাক্ত করার দাবি নয়, বরং পরিচিত শ্রেণিবিন্যাসের সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে। 

এই অদ্ভুত জগতের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ব্যবহার করে—রেডিয়াল ভেলোসিটি বা দৃষ্টিরেখা বরাবর বেগ পরিমাপ। দূরের কোনো মহাজাগতিক বস্তু আমাদের দিকে এগিয়ে এলে কিংবা দূরে সরে গেলে তার আলোতে ডপলার প্রভাবের কারণে সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়। আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সেই পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারেন। কোনো নক্ষত্রকে একটি গ্রহ প্রদক্ষিণ করলে গ্রহটির মহাকর্ষীয় টানে নক্ষত্রটিও সামান্য সামনে-পেছনে দুলতে থাকে। সেই দোলনের ফলে নক্ষত্রের বর্ণালিতে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন দেখা যায়। একই নীতি প্রয়োগ করা যায় ব্রাউন ডোয়ার্ফের ক্ষেত্রেও। তার চারপাশে একটি ভারী বস্তু ঘুরলে ব্রাউন ডোয়ার্ফটিও নিজের অবস্থান থেকে সামান্য সরে যেতে বাধ্য হয়। দূর থেকে সরাসরি সেই উপগ্রহসদৃশ বস্তুকে আলাদা করে দেখা কঠিন হলেও ব্রাউন ডোয়ার্ফের গতিতে তার মহাকর্ষীয় প্রভাব শনাক্ত করা সম্ভব। 

গবেষকেরা চিলিতে অবস্থিত ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির ভেরি লার্জ টেলিস্কোপের (VLT) CRIRES+ যন্ত্র ব্যবহার করে এই ব্রাউন ডোয়ার্ফের বর্ণালি পর্যবেক্ষণ করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে তাঁরা এর বেগের মধ্যে একটি পর্যায়ক্রমিক সংকেত শনাক্ত করেন। সংকেতটির সঙ্গে ব্রাউন ডোয়ার্ফকে প্রদক্ষিণকারী অন্তত একটি ভারী বস্তুর মহাকর্ষীয় প্রভাবের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। সেরা উপযোগী মডেলে বস্তুটির ন্যূনতম ভর প্রায় ০.৯ বৃহস্পতিভর এবং কক্ষপথের পর্যায় প্রায় ১৭০ দিন। এখানে ‘ন্যূনতম ভর’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। রেডিয়াল ভেলোসিটি পদ্ধতিতে কক্ষপথের প্রবণতা বা দৃষ্টিরেখার তুলনায় কক্ষপথের অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য না থাকলে বস্তুর প্রকৃত ভর নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তাই ০.৯ বৃহস্পতিভরকে এর চূড়ান্ত ও নিখুঁত ভর হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। গবেষকেরা দুটি উপগ্রহের সম্ভাবনাও মডেলে পরীক্ষা করেছেন, কিন্তু সেই বিন্যাস স্থিতিশীলভাবে সমর্থিত হয়নি। ফলে বর্তমানে একটি উপগ্রহসদৃশ বস্তুর মডেলই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। 

তবে এই আবিষ্কারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হলো, বস্তুটি কীভাবে তৈরি হয়েছে। একটি গ্রহসদৃশ বস্তু কি প্রথমে স্বাধীনভাবে গঠিত হয়েছিল, পরে ব্রাউন ডোয়ার্ফের মহাকর্ষীয় প্রভাবে তার কক্ষপথে আবদ্ধ হয়েছে? নাকি ব্রাউন ডোয়ার্ফের জন্মের সময় তার চারপাশের গ্যাস ও ধুলোর চাকতি থেকে বস্তুটি তৈরি হয়েছে? নক্ষত্রের চারপাশে থাকা গ্যাস-ধুলোর চাকতি থেকে গ্রহ তৈরি হওয়ার ধারণা জ্যোতির্বিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ব্রাউন ডোয়ার্ফের মতো একটি বস্তুর চারপাশে বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের উপগ্রহ কীভাবে গঠিত হতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। এর ভর, কক্ষপথ এবং পুরো ব্যবস্থার গঠন বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে গবেষকেরা এসব সম্ভাবনা যাচাই করতে পারবেন। অবশ্য এই নির্দিষ্ট বস্তুটির উৎপত্তি সম্পর্কে এখনই কোনো একটি ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, বস্তুটির পরিবেশ কেমন হতে পারে। বৃহস্পতির কাছাকাছি ভর থাকলেই সেটির গঠন, বায়ুমণ্ডল বা তাপমাত্রা বৃহস্পতির মতো হবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এর প্রকৃত ব্যাসার্ধ, বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক উপাদান কিংবা অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া কোনো নিশ্চিত চিত্র আঁকা সম্ভব নয়। একইভাবে, সেখানে তরল পানি বা প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও বর্তমানে কোনো প্রমাণ নেই। বৈজ্ঞানিক কল্পনায় এই অজানা জগতকে ঘিরে নানা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, কিন্তু পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য আর কল্পনার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখাই এখানে সবচেয়ে জরুরি।

এই গবেষণার আরেকটি বড় তাৎপর্য রয়েছে ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে। এখন পর্যন্ত সৌরজগতের বাইরে কোনো এক্সোমুনের অস্তিত্ব নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রার্থী আলোচনায় এলেও কোনো প্রার্থীকেই সর্বসম্মতভাবে নিশ্চিত বহির্জাগতিক চাঁদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। CD-35 2722 ব্যবস্থার ফলাফল তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও এটি চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের সমতুল্য নয়। আরও দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন তথ্যের মাধ্যমে সংকেত যাচাই এবং উন্নত মডেল ব্যবহার করে এই বস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে, এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে অন্য ব্রাউন ডোয়ার্ফের চারপাশেও অনুরূপ বস্তু খুঁজে বের করার পথ খুলে দিতে পারে। 

মহাবিশ্বের ইতিহাসে বহুবার এমন হয়েছে, নতুন কোনো আবিষ্কার আমাদের পুরোনো ধারণাকে সংশোধন করতে বাধ্য করেছে। একসময় অন্য নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণকারী গ্রহের অস্তিত্বও ছিল পর্যবেক্ষণগতভাবে প্রতিষ্ঠা করার অপেক্ষায় থাকা একটি প্রশ্ন। পরে হাজার হাজার বহির্গ্রহ শনাক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা গেছে, সৌরজগতের গঠনই মহাবিশ্বের একমাত্র নমুনা নয়। CD-35 2722-এর এই নতুন বস্তুটিও হয়তো তেমন একটি পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এই নয় যে বিজ্ঞানীরা অবশেষে আরেকটি অদ্ভুত জগতের নাম পেয়েছেন; বরং এটি দেখিয়েছে, মহাজাগতিক বস্তুর পরিচয় নির্ধারণে ভর, কক্ষপথ এবং গঠনের ইতিহাসকে একসঙ্গে বিবেচনা করা কতটা প্রয়োজনীয়।

শেষ পর্যন্ত CD-35 2722-এর রহস্যের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আরও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ গবেষণায়। বস্তুটি কি একটি প্রকৃত উপগ্রহ, একটি গ্রহসদৃশ সঙ্গী, নাকি এমন কোনো মধ্যবর্তী শ্রেণির প্রতিনিধি, যার জন্য নতুন সংজ্ঞা প্রয়োজন—তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিন্তু এই অনিশ্চয়তাই আবিষ্কারটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কারণ বিজ্ঞান কেবল পরিচিত জিনিসের তালিকা দীর্ঘ করার নাম নয়; পরিচিত ধারণা কোথায় অসম্পূর্ণ, সেটিও শনাক্ত করার প্রক্রিয়া। কোটি কোটি নক্ষত্রের ভিড়ে দূরবর্তী একটি ব্রাউন ডোয়ার্ফের সামান্য দোলন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা যে নতুন প্রশ্নটি সামনে এনেছেন, তার উত্তর হয়তো ভবিষ্যতে গ্রহ ও উপগ্রহের জন্ম, বিবর্তন এবং পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও বিস্তৃত করবে। মহাবিশ্বের এই অদ্ভুত বস্তুটি তাই আপাতত কোনো চূড়ান্ত শ্রেণির প্রতিনিধি নয়—বরং এমন এক বৈজ্ঞানিক সূত্র, যা আমাদের শেখাচ্ছে, প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে বুঝতে কখনো কখনো পরিচিত সংজ্ঞার বাইরেও তাকাতে হয়।

তথ্যসূত্র: Nature-এ প্রকাশিত মূল গবেষণা, ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO) এবং NASA Exoplanet Archive

বিজ্ঞাপন