বিজ্ঞাপন

হজ্বে ইবাদত নাকি ‘সেলফি সংস্কৃতি’? ডিজিটাল যুগে হজ্ব পালনের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

  • ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো হজ্ব।
  • এটি শুধু একটি সফর নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক মহান ইবাদত।
  • কিন্তু ডিজিটাল যুগে দেখা যাচ্ছে, অনেক হাজী পবিত্র হজ্ব পালনের সময় অতিরিক্ত ছবি তোলা, সেলফি দেওয়া ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
হজ্বে ইবাদত নাকি ‘সেলফি সংস্কৃতি’? ডিজিটাল যুগে হজ্ব পালনের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
ছবি: নড়াইল কণ্ঠ

হজ্ব: আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার মহান ইবাদত

হজ্ব ইসলামের এমন একটি ফরজ ইবাদত, যা শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার পালন করা বাধ্যতামূলক। মহান আল্লাহ বলেন—

“মানুষের মধ্যে যার সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য আছে, তার ওপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ ঘরের হজ করা ফরজ।”
— সূরা আলে ইমরান: ৯৭

বিজ্ঞাপন

হজ্ব কেবল আনুষ্ঠানিক কিছু কাজের সমষ্টি নয়। বরং এটি মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ, দুনিয়ামুখিতা ও আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতাকে দমন করার একটি প্রশিক্ষণ। ইহরাম পরিধানের মাধ্যমে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সবাই একই অবস্থানে দাঁড়ায়। এখানে বাহ্যিক চাকচিক্যের কোনো মূল্য নেই; মূল্য হলো তাকওয়া ও আন্তরিকতার।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকল, সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।”
— সহিহ বুখারি

এই হাদিসে হজ্বের মূল শিক্ষা স্পষ্ট—নিজেকে গুনাহ ও অহেতুক কাজ থেকে দূরে রাখা।

ডিজিটাল যুগ ও ‘সেলফি সংস্কৃতি’

বর্তমান যুগে স্মার্টফোন মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেকোনো ঘটনা ঘটলেই মানুষ সেটি ছবি বা ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। হজ্বেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থানগুলোতে আজকাল অনেক হাজীকে দেখা যায়—

  • তাওয়াফের সময় লাইভ ভিডিও করতে
  • সাফা-মারওয়ায় সেলফি তুলতে
  • আরাফাতের ময়দানে রিলস বানাতে
  • ইবাদতের মুহূর্তগুলো সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করতে

কিছু মানুষ আবার হজ্বকে এক ধরনের ‘সামাজিক স্ট্যাটাস’ হিসেবেও উপস্থাপন করেন। এতে হজ্বের মূল উদ্দেশ্য—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

ইসলামে রিয়া (লোক দেখানো আমল) কতটা ভয়াবহ?

ইসলামে ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। যদি কোনো ইবাদতে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা ঢুকে যায়, তাহলে সেটি রিয়া বা লোক দেখানো আমলে পরিণত হয়।

মহান আল্লাহ বলেন—

“তাদেরকে এ ছাড়া আর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।”
— সূরা বাইয়্যিনাহ: ৫

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ছোট শিরক কী?
তিনি বললেন, “রিয়া (লোক দেখানো)।”
— মুসনাদে আহমাদ

হজ্বের সময় যদি কেউ শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ছবি তোলে, স্মৃতি সংরক্ষণ করে বা পরিবারের জন্য কিছু মুহূর্ত রাখে—তাহলে সেটি এক বিষয়। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় মানুষের প্রশংসা অর্জন, অনুসারী বাড়ানো বা নিজেকে ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরা, তাহলে তা অত্যন্ত ভয়ংকর আত্মিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ছবি তোলা কি সম্পূর্ণ হারাম?

ইসলামী স্কলারদের মধ্যে আধুনিক ফটোগ্রাফি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। অধিকাংশ সমসাময়িক আলেম প্রয়োজনীয় ও সীমিত পরিসরের ছবি তোলাকে বৈধ বলেছেন। যেমন—

  • পাসপোর্ট
  • পরিচয়পত্র
  • শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য
  • স্মৃতি সংরক্ষণ

তবে সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন ছবি তোলা ইবাদতের একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়।

হজ্বের সময় একজন মুসলিমের প্রধান কাজ হওয়া উচিত—

  • তাওবা করা
  • বেশি বেশি দোয়া করা
  • কোরআন তিলাওয়াত
  • জিকির
  • কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া

কিন্তু যদি পুরো সময় মোবাইল স্ক্রিন, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও পোস্ট আপলোড নিয়েই ব্যস্ততা থাকে, তাহলে হজ্বের আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাওয়াফের সময় সেলফি: কতটা অনুচিত?

কাবা শরিফ মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। এখানে তাওয়াফের সময় মানুষের উচিত গভীর বিনয় ও মনোযোগের সাথে আল্লাহকে স্মরণ করা।

আজকাল দেখা যায় কেউ কেউ তাওয়াফের সময়—

  • ভিডিও ব্লগ তৈরি করছেন
  • বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করছেন
  • লাইভ স্ট্রিম করছেন
  • ভিড়ের মাঝেও সেলফি তোলার চেষ্টা করছেন

এটি শুধু নিজের ইবাদতের ক্ষতিই করে না; বরং অন্য হাজীদেরও কষ্ট দেয়। কখনও কখনও সেলফি তুলতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি পর্যন্ত হয়।

রাসূল ﷺ বলেছেন—

“মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।”
— সহিহ বুখারি

অতএব, নিজের আনন্দ বা অনলাইন কনটেন্ট তৈরির জন্য অন্য হাজীদের কষ্ট দেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।

সামাজিক মাধ্যমে হজ্ব প্রচার: দাওয়াহ নাকি আত্মপ্রদর্শন?

অনেকে যুক্তি দেন, হজ্বের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করলে মানুষ ইসলামের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়। সত্যি বলতে, নিয়ত বিশুদ্ধ থাকলে কিছু ক্ষেত্রে এটি দাওয়াহর মাধ্যম হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ—

  • হজ্বের নিয়ম শেখানো
  • ঐতিহাসিক স্থান পরিচিত করা
  • মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করা
  • ইসলামী শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করা

এসব ভালো কাজ হতে পারে। তবে এর মধ্যেও আত্মপ্রদর্শনের ঝুঁকি থাকে।

ইমাম ইবনেুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন—

“মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ইবাদতের সবচেয়ে সূক্ষ্ম রোগগুলোর একটি।”

তাই প্রতিটি পোস্ট দেওয়ার আগে একজন মুসলিমের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—

  • আমি কি আল্লাহর জন্য এটি করছি?
  • নাকি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য?
  • যদি কেউ না দেখত, তবুও কি আমি এটি করতাম?

    হজ্বের সময় মোবাইল আসক্তির ক্ষতি

১. ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট হয়

হজ্ব জীবনে একবার আসা একটি বিরল সুযোগ। কিন্তু মোবাইলে ব্যস্ত থাকলে হৃদয়ের খুশু-খুজু কমে যায়।

২. দোয়া ও জিকির কমে যায়

আরাফাতের দিন, মুজদালিফার রাত—এসব সময় আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করার মুহূর্ত। অথচ অনেকে এগুলো ভিডিও ধারণে ব্যস্ত থাকেন।

৩. রিয়া তৈরি হয়

মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে আমলকে নষ্ট করে দেয়।

৪. অন্য হাজীদের বিরক্তি সৃষ্টি হয়

সেলফি তুলতে গিয়ে ভিড় বাড়ে, ধাক্কাধাক্কি হয়।

৫. আত্মিক অনুভূতি হারিয়ে যায়

যখন একজন হাজী প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দি করতে ব্যস্ত থাকে, তখন সে বাস্তব অনুভূতির গভীরতা হারিয়ে ফেলতে পারে।

কোরআনের আলোকে বিনয় ও সংযম

আল্লাহ বলেন—

“রহমানের বান্দারা পৃথিবীতে বিনয়ের সাথে চলাফেরা করে।”
— সূরা ফুরকান: ৬৩

হজ্ব হলো বিনয়ের চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ। এখানে অহংকার, প্রদর্শন ও আত্মপ্রচারের কোনো স্থান নেই।

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন—

“তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।”
— সূরা আরাফ: ৩১

হজ্বের সময় অতিরিক্ত ছবি, ভিডিও ও সামাজিক মাধ্যমের পেছনে সময় ব্যয় করাও এক ধরনের মূল্যবান সময়ের অপচয় হতে পারে।

হজ্বের প্রকৃত সৌন্দর্য কোথায়?

হজ্বের প্রকৃত সৌন্দর্য ক্যামেরার ফ্রেমে নয়; বরং—

  • চোখের অশ্রুতে
  • তাওবার কান্নায়
  • কাবার সামনে বিনয়ের মুহূর্তে
  • আরাফাতের ময়দানে হাত তুলে দোয়া করার দৃশ্যে

এসব অনুভূতি হৃদয়ে ধারণ করার বিষয়, প্রদর্শনের নয়।

অনেক সাহাবি ও সালাফে সালেহিন আমল গোপন রাখতে ভালোবাসতেন। কারণ তারা ভয় করতেন—মানুষের প্রশংসা যেন তাদের আমল নষ্ট না করে দেয়।

হজ্ব পালনের সময় করণীয়

১. নিয়ত বিশুদ্ধ করা

হজ্ব শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত।

২. মোবাইল ব্যবহার সীমিত রাখা

প্রয়োজন ছাড়া ফোন ব্যবহার না করাই উত্তম।

৩. ছবি তুললেও সংযত থাকা

অতিরিক্ত সেলফি বা প্রদর্শনমূলক পোস্ট থেকে বিরত থাকা উচিত।

৪. ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া

তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাত—প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতের সুযোগ হিসেবে নেওয়া।

৫. সামাজিক মাধ্যমের বদলে দোয়ার দিকে মনোযোগ

কারণ এই সময়ের দোয়া অত্যন্ত মূল্যবান।

হজ্ব শুধু ভ্রমণ নয়, আত্মপরিবর্তনের সফর

আজকের পৃথিবীতে হজ্ব কখনও কখনও “ধর্মীয় ট্যুরিজমে” পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। অথচ হজ্বের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে বদলে দেওয়া।

একজন হাজী যখন হজ্ব শেষে ফিরে আসবেন, তখন তার ভেতরে পরিবর্তন দেখা উচিত—

  • চরিত্রে নম্রতা
  • জীবনে তাকওয়া
  • গুনাহ থেকে দূরে থাকা
  • মানুষের প্রতি সহমর্মিতা

যদি হজ্ব শেষে শুধু ছবি ও ভিডিওর অ্যালবামই বড় হয়ে যায়, কিন্তু আত্মা পরিবর্তিত না হয়—তাহলে হজ্বের মূল শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়।

উপসংহার

ডিজিটাল যুগ প্রযুক্তিকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধিতা করে না; বরং প্রযুক্তির সঠিক ও সংযত ব্যবহারের শিক্ষা দেয়। হজ্বের সময় সীমিত পরিসরে ছবি তোলা বা স্মৃতি সংরক্ষণ করা দোষের নয়। তবে যখন সেটি ইবাদতের মনোযোগ নষ্ট করে, রিয়া সৃষ্টি করে এবং আত্মপ্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে যায়—তখন তা ইসলামের আত্মিক শিক্ষার পরিপন্থী হয়ে পড়ে।

হজ্ব এমন একটি ইবাদত, যেখানে মানুষ আল্লাহর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় ও বিনয়ী বান্দা হিসেবে উপস্থাপন করে। তাই কাবার সামনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো হৃদয়ের কান্না, আন্তরিক তাওবা ও আল্লাহর স্মরণ—ক্যামেরার সামনে নিখুঁত হাসি নয়।

লেখক: কাজী হাফিজুর রহমান, সম্পাদক, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ। ২১ মে ২০২৬। বৃহস্পতিবার।

বিজ্ঞাপন