বিজ্ঞাপন

চিত্রা থিয়েটারের ৩১ বছর পূর্তি ও ৩২তম বছরে পদার্পণ

  • নড়াইলে চিত্রা থিয়েটারের ৩১ বছর পূর্তি ও ৩২তম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
  • ১৯৯৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা নাট্যকার কচি খন্দকার।
  • কর্মসূচিতে ছিল ফুলেল শুভেচ্ছা, শোভাযাত্রা, শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, পটগান ও ‘নিজের ডাক’ নাট্য পরিবেশনা।
চিত্রা থিয়েটারের ৩১ বছর পূর্তি ও ৩২তম বছরে পদার্পণ
নড়াইলে শোভাযাত্রা, শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা, পটগান ও ‘নিজের ডাক’ নাট্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক : নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন চিত্রা থিয়েটার প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর পূর্ণ করে ৩২তম বছরে পদার্পণ করেছে। এ উপলক্ষে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নড়াইলে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ভোরে শুভানুধ্যায়ীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা, শোভাযাত্রা, সুলতান সমাধি, গণকবর ও বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, পটগান এবং নাট্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়।

১৯৯৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চিত্রা থিয়েটারের যাত্রা শুরু
নড়াইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নাট্যচর্চার অন্যতম পরিচিত সংগঠন চিত্রা থিয়েটার। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যকার কচি খন্দকারের উদ্যোগে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা হয়।

গণ সাহায্য সংস্থা (জিএসএস) নামের একটি এনজিওতে চাকরির সূত্রে কচি খন্দকার নড়াইলে আসেন। কর্মজীবনের পাশাপাশি স্থানীয় নাট্যচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় চিত্রা থিয়েটার।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন কল্লোল রক্ষিত এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ ওসমান আলী।

বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চিত্রা থিয়েটার নড়াইলের নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে। স্থানীয় নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে মঞ্চনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি নড়াইলের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

৩১ বছর পূর্তি, ৩২তম বছরে পদার্পণ
১৯৯৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিত্রা থিয়েটারের পথচলা পূর্ণ করেছে ৩১ বছর। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনটি ৩২তম বছরে পদার্পণ করেছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সংখ্যা নিয়ে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংগঠনের প্রতিষ্ঠার দিন থেকে পরবর্তী একই তারিখ পর্যন্ত একটি পূর্ণ বছর সম্পন্ন হয়। সে হিসাবে ১৯৯৫ থেকে ২০২৬—মোট ৩১ বছর। তাই এ আয়োজনকে “চিত্রা থিয়েটারের ৩১ বছর পূর্তি ও ৩২তম বছরে পদার্পণ” হিসেবে উল্লেখ করাই যথাযথ।

চিত্রা থিয়েটারের পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদনও এই হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ১৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রফেসর মুন্সি হাফিজুর রহমান ছিলেন আজীবন সভাপতি
চিত্রা থিয়েটারের দীর্ঘ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মুন্সি হাফিজুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি সংগঠনটির আজীবন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘদিন চিত্রা থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তিনি সংগঠনটির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নাট্যচর্চায় অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা চিত্রা থিয়েটারের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

২০২৬ সালের ২৪ এপ্রিল বার্ধক্যজনিত কারণে প্রফেসর মুন্সি হাফিজুর রহমানের মৃত্যু হয়। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় বয়সজনিত জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর মৃত্যুতে চিত্রা থিয়েটার হারিয়েছে দীর্ঘদিনের একজন অভিভাবককে। তাঁর স্মরণে ২০২৬ সালের এপ্রিলে সুলতান মঞ্চে চিত্রা থিয়েটারের উদ্যোগে স্মরণসভাও অনুষ্ঠিত হয়।

ভোরে ফুলেল শুভেচ্ছায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সূচনা
চিত্রা থিয়েটারের ৩১ বছর পূর্তি ও ৩২তম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে নেওয়া হয় দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি।

দিনের শুরুতে সকাল ৬টায় চিত্রা থিয়েটারের কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রভাতী ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সকালে শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে এই শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা।

সুলতান মঞ্চ থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা
এরপর সকাল ৯টায় সুলতান মঞ্চ চত্বর থেকে বের হয় শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি নড়াইল শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

এতে চিত্রা থিয়েটারের সদস্য, নাট্যকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন। শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে নড়াইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চিত্রা থিয়েটারের দীর্ঘ পথচলার বার্তাও তুলে ধরা হয়।

শোভাযাত্রা শেষে এস এম সুলতানের সমাধি, গণকবর ও বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশের জন্য আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণ করেন চিত্রা থিয়েটারের সদস্য ও অংশগ্রহণকারীরা।

সুলতান মঞ্চে আলোচনা সভা
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল আয়োজনের অংশ হিসেবে বিকেল ৫টায় সুলতান মঞ্চ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। আলোচনায় চিত্রা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, তিন দশকের নাট্যচর্চা, নড়াইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সংগঠনটির ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা করা হয়।

এ সময় সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্ব এবং দীর্ঘ পথচলায় যুক্ত নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের অবদান স্মরণ করা হয়।

পটগান ও ‘নিজের ডাক’ নাটক
আলোচনা সভার পর সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত হয় পটগান। লোকজ সংস্কৃতির এই পরিবেশনা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে যোগ করে ভিন্নমাত্রা।

এরপর সন্ধ্যা ৭টায় চিত্রা থিয়েটারের শিল্পীরা মঞ্চস্থ করেন নাটক ‘নিজের ডাক’। নাটক দেখতে সুলতান মঞ্চ চত্বরে উপস্থিত হন দর্শক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

নাট্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজন। পরে রাত ৮টায় শেষ হয় চিত্রা থিয়েটারের ৩১ বছর পূর্তি ও ৩২তম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি।

তিন দশকের বেশি সময়ের নাট্যচর্চা
চিত্রা থিয়েটারের ৩১ বছরের পথচলা নড়াইলের স্থানীয় নাট্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে সংগঠনটি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

প্রতিষ্ঠাতা কচি খন্দকার পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ের নাট্য ও অভিনয় অঙ্গনেও পরিচিতি লাভ করেন। নড়াইলে তাঁর নাট্যচর্চার সময়েই চিত্রা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ করে।

সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত নাট্যব্যক্তিত্ব সৈয়দ ওসমান আলীসহ বিভিন্ন নাট্যকর্মী দীর্ঘদিন ধরে নড়াইলের নাট্যচর্চায় ভূমিকা রেখেছেন। ২০২২ সালের একটি নাট্য কর্মশালার সংবাদেও চিত্রা থিয়েটারের সঙ্গে সৈয়দ ওসমান আলীসহ সংগঠনটির বিভিন্ন কর্মীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
সামনে আরও দীর্ঘ পথ

১৯৯৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ৩১ বছর পূর্ণ করেছে চিত্রা থিয়েটার। এই দীর্ঘ সময়ে সংগঠনটি নড়াইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নাট্যচর্চার একটি ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

৩১ বছর পূর্তি এবং ৩২তম বছরে পদার্পণের এই আয়োজন তাই শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নয়, বরং সংগঠনটির অতীতের পথচলা স্মরণ এবং ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন প্রত্যয়েরও উপলক্ষ।

নাট্যচর্চা, লোকজ সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা—এই তিনের সমন্বয়ে আয়োজিত এবারের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে চিত্রা থিয়েটার তাদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পথচলাকে স্মরণ করেছে।

বিজ্ঞাপন