ভাষার টানে দুই বাংলার মানুষ একই মঞ্চে গাইলেন বাংলার জয়গান

84

ভাষা দিবস মিলিয়ে দিল ‘এপার-ওপার’। বাঁশের বেড়া উপেক্ষা করে ভাষার দাবিতে আন্দোলনে শহীদদের সম্মিলিত শ্রদ্ধা জানাল ভারত-বাংলাদেশ। ভৌগোলিক সীমারেখা ভুলে কেবল ভাষার টানে দু’বাংলার মানুষ একই মঞ্চে গাইলেন বাংলার জয়গান। নেতারা হাতে হাত রেখে উর্ধে তুলে ধরলেন বাংলাকে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে যশোরের বেনাপোল চেকপোস্ট নো-ম্যান্সল্যান্ডে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশ মঞ্চে’ বুধবার এভাবেই কাটালেন দুই বাংলার ‘বাংলা ভাষাভাষী’ মানুষ। একই আকাশ একই বাতাস, দু’বাংলার মানুষের ভাষা এক। আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি বলে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমাদের প্রাণ কাঁদে। তাই তো বারবার ছুটে আসি দুই দেশের বাঙালী বাংলাভাষী মানুষের পাশে। সীমান্তের নো-ম্যান্সল্যান্ডে শহীদ বেদি ঢাকল ফুলের চাদরে। বেনাপোল চেকপোস্ট নো-ম্যান্সল্যান্ডে স্থাপিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হলো। মিষ্টি বিতরণ, আলোচনা আর গানে গানে মাতোয়ারা হলো দু’বাংলার একই আকাশ একই বাতাস। উভয় দেশের জনপ্রতিনিধিরা বলেন, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কথা। এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষ। নেতাদের কণ্ঠে ছিল ভবিষ্যতে আরও বড় করে এক মঞ্চে একুশসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান উদযাপনের প্রত্যাশা। উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় এ অনুষ্ঠানে। দুদেশের জাতীয় পতাকা, নানা রঙের ফেস্টুন, ব্যানার, প্লে-কার্ড, আর ফুল দিয়ে বর্ণিল সাজে সাজানো হয় নো-ম্যান্সল্যান্ড এলাকা। দু’বাংলার মানুষের এ মিলনমেলায় উভয় দেশের সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয়। প্রতি বছরই দুই বাংলার সীমান্তবর্তী এ অংশের বাসিন্দারা এক সঙ্গে মিলিত হয়ে দিবসটি পালন করেন। তখন দুদেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ওই স্থানে আবেগাপ্লুত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একে অপরকে আলিঙ্গন করে সকল ভেদাভেদ যেন ভুলে যায় কিছু সময়ের জন্য। ফুলের মালা ও জাতীয় পতাকা বিনিময় করে উভয় দেশের আবেগপ্রবণ অনেক মানুষ বাঙালীর নাড়ির টানে একজন অপরজনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। দুই বাংলার মানুষের মাঝে বসে এক মিলনমেলা। এ সময় পেট্রাপোল ও বেনাপোল চেকপোস্টে ঢল নামে হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষের। ক্ষণিকের জন্য হলেও স্তব্ধ হয়ে যায় আন্তর্জাতিক সীমারেখা।

সকাল ১০টায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী শ্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, লোকসভার বনগাঁ অঞ্চলের সাংসদ মমতা ঠাকুর, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদের সভাপতি রেহেনা খাতুন, শ্রী কৃষ্ণ গোপাল ব্যানার্জী, বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস, সুরজিত কুমার বিশ্বাস ও শ্রী গোপাল শেঠ’র নেতৃত্বে ভারত থেকে আসা শত শত বাংলাভাষী মানুষ বাংলাদেশীদের ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে ও মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নেয় একে অপরকে। নো-ম্যান্সল্যান্ডে অস্থায়ী শহীদ বেদিতে প্রথম ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান উভয় দেশের জনপ্রতিনিধিসহ সরকারী কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য, সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুজিদ, শিক্ষাবিয়ষক সম্পাদক আসিফ উদ-দৌলা অলোক, বেনাপোল কাস্টম্স কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী, ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডার লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল হক, বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মিন্নু, বেনাপোল সিএন্ডএফ এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন, বেনাপোল পোর্ট থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অপূর্ব হাসান, ইমিগ্রেশনের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তরিকুল ইসলাম প্রমুখ।

এ সময় উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অংশ নেয় এ অনুষ্ঠানে। ভাষা দিবসের মিলনমেলায় বিজিবি-বিএসএফকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। এরপর দুদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী মানুষ দিবসটি উদযাপন করে যৌথভাবে। এ সময় ভাষার টানে বাঙালীর বাঁধনহারা আবেগের কাছে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় দু’বাংলার মানুষ। এর মধ্য দিয়ে বোঝা গেল রফিক, শফিক, বরকত ও সালামের তরতাজা রক্ত বৃথা যায়নি। ভাষার আকর্ষণ ও বাঙালীর নাড়ির টান যে কতটা আত্মিক ও প্রীতিময় হতে পারে তাও বুঝিয়ে দিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। সেই সঙ্গে এপার-ওপার দুই বাংলার গণমানুষের ঢল ফের প্রমাণ করে দিল দেশ ভাগ হলেও ভাগ হয়নি ভাষার। উভয় দেশের মধ্যকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি এখনও যে অটুট রয়েছে তাও বোঝা গেল অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুই বাংলার অতিথিদের বক্তৃতায়। এরপর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একুশ মঞ্চে’ উঠেন দুদেশের নেতৃবৃন্দ।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন আমাদের অধিকার বোধের জন্ম দিয়েছিল। রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষার যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা বিশ্বে বিরল। অন্য জাতির এই গৌরব নেই। সেই চেতনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অগণিত মানুষের অংশগ্রহণে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জনগণ ও সরকার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সঙ্গে আমাদের আত্মার সম্পর্ক, নাড়ির সম্পর্ক। এদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র বিকশিত হতে শুরু করেছে। ভাষা ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের দুদেশের মধ্যে উপস্থিত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিতকে আরও শক্ত করবে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, আপনারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। ভাষা আর স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগের নজির পৃথিবীতে অন্য কারও নেই। এজন্য আপনারা গর্বিত জাতি। ভাষার টানে আমরা বাংলাদেশে ছুটে এসেছি একুশ উদযাপন করতে। দু’বাংলার মানুষ একসঙ্গে মাতৃভাষা দিবস পালন করছে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আপনারা ভাল থাকলে আমরাও ভাল থাকব। দু’বাংলার মানুষ আমাদের খুব কাছের মানুষ। আমাদের পূর্ব পুরুষরা এপার বাংলারই মানুষ ছিল। দু’বাংলার মানুষের মিলনমেলার মধ্য দিয়ে দুদেশের বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। আমার এসেছি অন্তরের টানে। বার বার ছুটে আসি। দেশ বিভক্তি হলেও ভাষার পরিবর্তন হয়নি। আমরা ওপারে থাকলেও শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ সকল ভাষা সৈনিকের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। তিনি আরও বলেন, সীমান্তের গেটে ভাষা শহীদদের ছবি টাঙিয়ে দেয়া হবে। বনগাঁতে শহীদদের স্মরণে ব্লাড ব্যাংক তৈরি করা হবে।
মঞ্চে একুশের কবিতা আবৃতি, ছড়া, গীতিনাট্য, আলোচনা আর সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে পশ্চিম বাংলার কবি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী অনুপম রায়, নাট্যকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায় ও ফাতেমাতুজ্জোহরা সঙ্গীত পরিবেশন ও আবৃতি করেন। ভাষা শহীদদের স্মরণে দু’বাংলার মানুষের সম্প্রতি আর ভালবাসার বাঁধনকে আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে শেষ হয় ভাষাপ্রেমীদের মিলনমেলা। সমগ্র অনুষ্ঠানে নেয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা। কড়াকড়ি আরোপ করা হয় দুই সীমান্তে। বেনাপোল-পেট্রাপোল চেকপোস্টে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বিজিবি ও বিএসএফ অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে দুই সীমান্তে। সীমান্ত টপকে যাতে কেউ অবৈধভাবে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য বিজিবি ও বিএসএফ বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ২০০২ সাল থেকে দেশের সর্ববৃহত স্থলবন্দর বেনাপোল চেকপোস্টের জিরো পয়েন্টে মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছে দু’বাংলার মানুষ। প্রতিবার দুটি মঞ্চ করা হলেও এবার একই মঞ্চে অনুষ্ঠান করা হয়।