দেশে প্রথম মরণোত্তর কিডনি প্রতিস্থাপন, যে মৃত্যু গৌরবের, কিছু অজানা কথা..

44

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক : জয়িতা ফাউন্ডেশন পরিচালিত জয়িতা ফুডকোর্টের সম্মানিত নারী উদ্যোক্তা মিজ শবনমের একমাত্র সন্তান সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য মাত্র বিশ বছর বয়সে মর্মান্তিক এক মৃত্যুকে সত্যি সত্যিই বরণ করে নিয়েছেন। যে মৃত্যু একই সঙ্গে অবর্ণনীয় বেদনার এবং অলংঘনীয় গৌরবের। সারাহর মৃত্যুতে জয়িতা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। দুআ করছি মহান আল্লাহ তাআলা যেন সারাহকে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দান করেন।

তাঁর মা এবং সকলের অলৌকিক কিছু ঘটে ঐশ্বর্যের সুস্থ হওয়ার আশা পূর্ণ হয়নি। শেষ পর্যন্ত মিরাকল ঘটেনি। আমাদের সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য আর ফিরে আসেনি। তবে সে তার মৃত্যুটাকেই অলৌকিক উচ্চতায় নিয়ে রেখে গেল।

বুধবার, ১৮ জানুয়ারি রাত ১০টায় তার লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদে জানাজা শেষে আজিমপুর নতুন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

মৃত্যুর আগে সারাহ ঐশ্বর্য অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে, নাম লিখিয়ে গেছে ইতিহাসে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মৃত ব্যক্তির দান করা কিডনি অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে গত রাতে। এই কিডনি দান করে গেছে সারাহ। লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার পর রাত সাড়ে ১০টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার ভোররাত ৪টা পর্যন্ত দুটি কিডনির একটি প্রতিস্থাপন করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ); অন্যটি প্রতিস্থাপন করা হয় কিডনি ফাউন্ডেশনে। সারাহ দান করে গেছে কর্নিয়াও।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত রাতে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপনে অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেন বিএসএমএমইউর রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, সারাহর মা জানিয়েছিলেন, সারাহ মৃত্যুর আগে তার দেহের সবকিছুই দান করে দিতে বলেছিল। তবে তাঁর শুধু কিডনি ও কর্নিয়া নেওয়া হয়েছে। হাবিবুর রহমান আরও বলেন, ‘সারাহকে বীরের মর্যাদা দেওয়া উচিত। মরণোত্তর কিডনি দানে উদ্বুদ্ধ করতে এই দান মানুষের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

করোনার কারণে কিশোর আলোর অফলাইন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সারাহ ঐশ্বর্য কিশোর আলোর নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবক ছিল। সে আঁকতে ভালোবাসত। অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি আর হলি ক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি দেওয়ার পর সারাহ তাই ভর্তি হয়েছিল ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের চারুকলা বিভাগে। টিউবেরাস স্ক্লেরোসিস নামক খুব জটিল ও ‘রেয়ার’ একটি রোগে আক্রান্ত ছিল সে। এই রোগ ভালো করার কোনো উপায় এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে যন্ত্রণাদায়ক এই রোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হতো সারাহকে। তারপরও নিজের ভালো লাগার কাজগুলো করতে করতে ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছিল সে। কিন্তু ১০ জানুয়ারি তার মস্তিুষ্কের টিউমার অপসারণের জন্য একটি সার্জারি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে।

এই সোমবার হাসপাতালে সারাহর মা আমাকে বলছিলেন, ‘সারাহ বাসা থেকে যে টাকা নিত, তা নিজের জন্য খরচ করত না। খরচ করত অন্যকে উপহার দিতে। সারাহ ‘স্যান্টা ক্লজ’ হতে চাইত।’

উপহার দিতে সত্যিই খুব পছন্দ করত সারাহ। আর সেজন্যই বোধহয় মৃত্যুর সময়ও উপহার দিয়ে যেতে ভুলে যায়নি সে। সারাহ চলে গেলেও তার দেওয়া কিডনি নিয়ে নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ পাচ্ছেন দুজন মানুষ। আর সারাহর দান করা কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পর আরও এক বা দুজন পৃথিবীটাকে দেখতে পারবেন নতুন করে।

পৃথিবীর জন্য, পৃথিবীর মানুষের জন্য এর চেয়ে সুন্দর উপহার আর কী হতে পারে!

সারাহর জন্য সালাম, সারাহর জন্য ভালোবাসা