ইউক্রেন দাবি মেনে নিলেই দূর হবে ভোগান্তি : ক্রেমলিন

3

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট, রাজনীতিক ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা যদি রাশিয়ার দাবি মেনে নেন, তাহলে শিগগিরই দেশটির জনগণের ভোগান্তি দূর হওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে মনে করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিন।

ক্রেমলিনের প্রেস সচিব ও মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে বুধবার কিয়েভের বিদ্যুৎ সরবরাহে ক্ষেপণাস্ত্র হামালার ব্যাপারটি প্রায় অস্বীকারও করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার মস্কোতে ক্রেমলিন কার্যালয়ে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা আগের দিন ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তার ফলে এই শীতের হিমশীতল ঠাণ্ডায় মধ্যে সাধারণ ইউক্রেনীয়দের ভোগান্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করেন পেসকভকে।

উত্তরে পেসকভ বলেন, ‘আমার জানামতে, ইউক্রেনে আমাদের সেনাসদস্যরা কেবল সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা করছে। তাদেরকে সে রকমই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি তারপরও বেসামরিক কোনো স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে থাকে, সেক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তার উত্তর দিতে পারবে।’

‘তবে সাধারণ ইউক্রেনীয়দের ভোগান্তির ব্যাপারে আপনারা যা বললেন, তা সত্য। এক্ষেত্রে আমি বলব— ইউক্রেনে নেতৃত্বের আসনে যারা আসীন, তারা চাইলে শিগগিরই এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন। যদি তারা মস্কোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী হন এবং আমাদের যেসব দাবি রয়েছে, সেসব মেনে নেন— তাহলে যুদ্ধ থেমে যাবে, সার্বিক পরিস্থিতিও আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।’

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম অঙ্গরাজ্য ইউক্রেন ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ সরাসরি রুশ বংশোদ্ভূত এবং রুশভাষী। সোভিয়েত আমলে রুশ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ইউক্রেনীয় জনগোষ্ঠীর মোটামুটি সদ্ভাব বজায় থাকলেও ইউক্রেন স্বাধীন হওয়ার পর দ্বন্দ্ব শুরু হয় এই দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে।

ইউক্রেনের রুশভাষী লোকজন বরাবরই নিজেদের রাশিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ইউক্রেনীয়রা সবসময় নিজেদের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জাতি মনে করতে অভ্যস্ত। এটিই মূলত দুই জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের মূল কারণ। স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনে এই ইস্যুতে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই ছিল। ১৯৯১ সালের পর গত ৩ দশকে ইউক্রেনে জাতিগত সংঘাতে নিহত হয়েছেন ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় রাশিয়া। এক্ষেত্রে ক্রিমিয়ার রুশভাষী জনগোষ্ঠী রাশিয়ার সেনাবাহিনী ও সরকারকে সরাসরি সহায়তা করেছিল।

তবে ইউক্রেন এখনও ক্রিমিয়াকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে বিবেচনা করে।

এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই রাশিয়ার প্রধান বৈরীপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাজনৈতিক বলয়ে ঢুকতে দেন-দরবার করছিল ইউক্রেন। রাশিয়ার কাছে ক্রিমিয়া হারানোর পর এই তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পায়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করে ইউক্রেন।

ইউক্রেনের এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয় মস্কো এবং ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন প্রত্যাহার করে নেওয়ার আহ্বান জানায় তারা। কিন্তু কিয়েভ তাতে কান দেয়নি।

প্রায় চার বছর এই ইস্যুতে ‍দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলার পর অবশেষে এ বছরের (২০২২) ২৬ ফেব্রুয়ারি রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন ভ্লাদিমির পুতিন।

গত ৯ মাসের অভিযানে ইউক্রেনের চার প্রদেশ খেরসন, ঝাপোরিজ্জিয়া, দনেৎস্ক ও লুহানস্ক দখল করে নিজের সীমানভুক্ত করেছে রাশিয়া। হাজার হাজার সামরিক-বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এ অভিযানে। ইউক্রেনের ছোট-বড় প্রায় সব শহর গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে।

অভিযানে অবশ্য রাশিয়ারও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৬ হাজারেরও বেশি রুশ সেনা। এছাড়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাশিয়ার ওপর। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে রাশিয়ার অর্থনীতি।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পর, ৭ মার্চ বেলারুশের গোমেল শহরে প্রথম দফা শান্তি আলোচনা শুরু করেন রাশিয়া ও ইউক্রেনের সরকারি প্রতিনিধিরা। সেই বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধে কিয়েভের উদ্দেশ্যে ৪টি দাবি জানায় মস্কো। সেসব দাবি হলো—

১. বাস্তবে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে চায় রাশিয়া এবং তারা সেটি বন্ধ করবেও। তবে ইউক্রেনকেও সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং সামরিক অভিযান বন্ধের পর কোনোভাবেই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যাবে না।

২.  নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ইউক্রেনের সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে।

৩. ক্রিমিয়াকে রাশিয়ান ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে স্বীকৃতি দিতে হবে।

৪. দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, ঝাপোরিজ্জিয়া ও খেরসনকে রুশ ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।