চিন্তা বাড়াচ্ছে প্লাটিলেটের অপ্রতুলতা

36

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপে পা ফেলার জায়গা নেই। যে ডেঙ্গু রোগীরা হাসপাতালে আসছেন, তাদের অধিকাংশেরই প্লাটিলেট লেভেল অনেক নিচে নেমে গেছে। যার কারণে দেখা দিচ্ছে নানা জটিলতা। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

রক্তদাতা সংগঠনগুলো বলছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত বাড়ায় প্লাটিলেটের চাহিদা বেড়েছে দ্বিগুণ। প্রয়োজন অনুসারে মিলছে না রক্তদাতাও। এ অবস্থায় প্লাটিলেটের অপব্যবহার রোধ করা জরুরি।

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার কারণে মানুষের রক্তনালী আক্রান্ত হয়। রক্তনালীতে যেসব ছোট ছিদ্র থাকে সেগুলো বড় হয়ে যায়। এমনকি, তা দিয়ে রক্তের জলীয় উপাদান বের হয়ে আসে। ফলে রক্তচাপ কমতে থাকে।

গাইডলাইনে বলা হয়েছে, প্লাটিলেট যদি ১০ হাজারে নেমে যায়, তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর ৫ হাজারের নিচে নেমে গেলে বলা হয়েছে, আপনি ট্রান্সমিশন দিতে পারবেন। তবে, যদি কারও স্পেসিফিক ব্লিডিং হয় বা অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, এরকম কিছু ক্রাইটেরিয়া দেওয়া আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন প্লাটিলেটের অপব্যবহার বেড়েছে, রোধ জরুরি।

বিশিষ্ট ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিশেষজ্ঞ এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, আমরা যারা রক্ত নিয়ে কাজ করি, দেশের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে প্লাটিলেটের চাহিদাটা গভীরভাবে উপলব্ধি করি। কিন্তু যখন দেখি, এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও এর অপব্যবহার হচ্ছে, সেটি আমাদের জন্য খুবই কষ্টদায়ক।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্লাটিলেটের ডোনার কিন্তু সহজলভ্য না। এই মুহূর্তে আমাদের ডোনারের তীব্র সংকট রয়েছে। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ঠিক মতো ডোনার পাচ্ছি না। এমন পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী প্লাটিলেটের অযাচিত ব্যবহার। সুতরাং অবশ্যই প্লাটিলেটের অপব্যবহার রোধ করতে হবে।

ডা. আশরাফুল হক বলেন, সাধারণত সরকারি হাসপাতালগুলোতে খুব বেশি অপব্যবহার হয় না। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আমরা অপব্যবহারের মাত্রাটা খুব বেশি দেখতে পাই। আমার মনে হয়, ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা চিন্তা করে এসব হাসপাতালে প্লাটিলেট দিয়ে দেওয়া হয়। যদিও রোগীর তেমনটা প্রয়োজন পড়ে না।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রিদম ব্লাড ব্যাংকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফ মাহমুদ বলেন, গত এক মাসে প্লাটিলেটের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। বেশিরভাগই আসছে জরুরি অবস্থায়। আমরাও রোগীর ব্যাপারে একটু খোঁজখবর নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্লাটিলেট দিচ্ছি।

তিনি বলেন, এখন প্রতিদিন আমাদের প্লাটিলেট যাচ্ছে ৩০-৩৫ ব্যাগ। এক মাস আগেও যা ছিল ১০-১৫ ব্যাগ। অনেক ক্ষেত্রে আমরা চাহিদা অনুযায়ী প্লাটিলেট দিতে পারছি না।

বর্তমানে প্লাটিলেটের ডোনার কিন্তু সহজলভ্য না। এই মুহূর্তে আমাদের ডোনারের তীব্র সংকট রয়েছে। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ঠিক মতো ডোনার পাচ্ছি না। এমন পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী প্লাটিলেটের অযাচিত ব্যবহার।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক রক্তের চাহিদা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হানিফ মাহমুদ বলেন, ডেঙ্গু তো আছেই। এছাড়াও নানা কারণে রক্তের চাহিদা আছে।

 

মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের পরিচালিত স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী প্রতিষ্ঠান সন্ধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ সভাপতি আমির হোসাইন সিয়াম বলেন, গত দুই-তিন মাস ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে। গত এক মাসে ডেঙ্গু রোগী অনেকাংশেই বেড়েছে। আগে আমাদের হাসপাতাল শাখায় প্রতিদিন ১০-১২টি কল ধরতে হতো, এখন ২০-২৫টা কল ধরতে হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশই ডেঙ্গু রোগীর জন্য ডোনার আর প্লাটিলেট চেয়ে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেটের জন্য অনেকে আমাদের কল দেন। আমরা তখন শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ডোনার সংগ্রহ করে জানাই। পরে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে প্লাটিলেট দিয়ে আসেন।

আমির হোসাইন সিয়াম বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্লাটিলেট সংগ্রহ দুই ভাবে হয়। প্রথমত, আট জন ব্যক্তি থেকে এক ব্যাগ প্লাটিলেট সংগ্রহ করা হয়। দ্বিতীয়ত, শক্ত-সামর্থ্য মানুষ হলে এবং প্লাটিলেট বেশি থাকলে এক ব্যক্তির কাছ থেকেও এক ব্যাগ প্লাটিলেট নেওয়া যায়।

 

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, কারও যদি ২০ হাজারের নিচে প্লাটিলেট নেমে যায় তাহলে তাকে দেওয়া যেতে পারে। তবে, আমরা অনেক সময় ১০ হাজার পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এর নিচে নেমে গেলে ব্রেইনসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যেগুলো রয়েছে, সেগুলোতে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। তখন রোগী অচেতন হয়ে যাওয়ার একটা ঝুঁকি থাকে। তবে ১০ হাজারের আগে কাউকে প্লাটিলেট দেওয়ার খুব বেশি প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায় যে প্লাটিলেট ২০ হাজার বা ৩০ হাজারে এলেই নতুন করে প্লাটিলেট দিয়ে দেওয়া হয়। এতে কিন্তু রোগের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। আমার দৃষ্টিতে ১০ হাজার পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারি, এর আগে প্লাটিলেট দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু একজন রোগী যখন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, অনেক সময় ব্যবসায়িক স্বার্থ চিন্তা করেই জোর করে ট্রান্সমিশন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এখন প্রতিদিন আমাদের প্লাটিলেট যাচ্ছে ৩০-৩৫ ব্যাগ। এক মাস আগেও যা ছিল ১০-১৫ ব্যাগ। অনেক ক্ষেত্রে আমরা চাহিদা অনুযায়ী প্লাটিলেট দিতে পারছি না
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রিদম ব্লাড ব্যাংকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফ মাহমুদ

প্রচুর পানি খেতে হবে

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে জটিল পরিস্থিতি এড়াতে করণীয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিশেষজ্ঞ বলেন, সর্বপ্রথম করণীয় হলো আমাদের প্রচুর পরিমাণ পানি খেতে হবে। দিনে কমপক্ষে তিন থেকে চার লিটার পানি খেতে হবে, যাতে করে আমাদের শরীরে পানিশূন্যতা না হয়। এই পানিশূন্যতার কারণেই কিন্তু রক্তের প্লাটিলেটগুলো আমাদের শরীর থেকে হারিয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরা যদি পানিশূন্যতা রোধ করতে পারি তাহলে কিন্তু প্লাটিলেট দ্রুত কমবে না, আর কমলেও বিপজ্জনক মাত্রায় যাবে না।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার যে ঝুঁকিটা, সেটি কিন্তু হয় এই পানিশূন্যতার কারণেই। সবমিলিয়ে আমাদের আসলে এই সিজনটায় বেশি করে পানি খাওয়া উচিত আর এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

প্লাটিলেট প্রয়োগে গাইডলাইন অনুসরণ করুন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, প্লাটিলেট জিনিসটা আসলে চেয়ে নেওয়ার বিষয় না। এটা নিয়ে আমাদের একটা ন্যাশনাল গাইডলাইন আছে, সেখানে সুনির্দিষ্ট করে বলা আছে কখন প্লাটিলেট প্রয়োজন হবে, কখন দিতে হবে। এখন যদি সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালগুলো গাইডলাইন অনুসরণ না করে, তাহলে তো এক কথায় তারা নিজেদের মতো চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। এমনটা তো হতে পারে না। আমি এটা চাই না।

তিনি বলেন, আমাদের কথা হলো আপনারা গাইডলাইন অনুসরণ করুন। গাইডলাইনে বলা হয়েছে, প্লাটিলেট যদি ১০ হাজারে নেমে যায়, তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আর ৫ হাজারের নিচে নেমে গেলে বলা হয়েছে, আপনি ট্রান্সমিশন দিতে পারবেন। তবে, যদি কারও স্পেসিফিক ব্লিডিং হয় বা অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, এরকম কিছু ক্রাইটেরিয়া দেওয়া আছে। এই ক্রাইটেরিয়াগুলো পরিপূর্ণ হলেই তো প্লাটিলেট দেবে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্লাটিলেট আইডিয়াল ট্রিটমেন্ট নয়।

বেসরকারি কিছু হাসপাতালে ব্যবসায়িক স্বার্থে আগেই প্লাটিলেট দেওয়া হচ্ছে— এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রাইভেট-পাবলিক তো আলাদা কিছু না। দুটোই হেলথ ফ্যাসিলিটি। আর ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট করার জন্য সবাইকেই গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে।

চলতি বছর ডেঙ্গুতে ১৬১ জনের মৃত্যু

বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) সারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের নিয়মিত ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে নতুন করে ৮৮২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৭৬ জনে।

অন্যদিকে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৯ জনের। এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ প