সম্পদ ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে কুমার-কুমারী ভাইবোনের ব্যতিক্রমী জীবন

57

আশেপাশে নেই জনজীবন ও কোলাহল। পাখিদের কিচির-মিচির, সবুজ প্রকৃতির সমারোহে মাঝে মধ্যে দেখা মেলে অচেনা পাখিদের। কিছুটা ভূতুরে ও গা ছমছমে এই পরিবেশের মাঝেই বাস করেন দুই ভাই-বোন আকাশ কলি দাস ও ঝর্ণা দাস।

আকাশের বয়স ৮৬ বছর, আর বোন ঝর্ণা দাসের ৬১ বছর। এই ভাই-বোনের জীবনযাপন বেশ রহস্যেঘেরা মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কেননা জীবনের প্রায় শেষ সময়ে এসে পৌঁছেছেন দুইজন, তবে এখনো বিয়ে করেননি কেউ। গড়েননি নতুন পরিবার,আগ্রহ নেই সামাজিক জীবনে।

পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে আগ্রহ না থাকলেও ভালোবাসেন প্রকৃতি ও পশু-পাখি। আকাশ কলি দাস প্রায় তার সাড়ে ৬ বিঘার বসতভিটার পুরোটাই মুক্ত করে দিয়েছেন পাখিদের জন্য। পাখিদের অবাধ বিচরণের জন্য জায়গাটি সরকারের পক্ষ থেকে পাখির অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। ইট-পাথরের নগরায়ণের ফলে পাখিরা যখন আপন নিবাস হারাচ্ছেন ঠিক তখন আশ্রয় নেয়া পাখিদের নিরাপদে থাকার জন্য নিজের বসত ভিটা মুক্ত করে দিয়েছেন তিনি। কেউ সেখানে পাখি শিকারের চেষ্টা করলেও শক্তভাবে প্রতিরোধ করেন।

পাবনার বেড়া উপজেলার কৈটোলা ইউনিয়নের কৈটোলা গ্রামের বাসিন্দা আকাশ কলি দাস ও ঝর্ণা দাস। বাবা চন্দ্র কুমার দাস পাবনার নগরবাড়ির শ্রী নিবাস দিয়ার জমিদার বাড়ির নায়েব ছিলেন। ১৬-১৭ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু হলে সংসারের হাল ধরেন আকাশ। তিন ভাই-তিন বোনের সংসারে তিনিই ছিলেন অভিভাবক। ছোট বেলাতে এক ভাইয়ের মৃত্যু হয়। বাকি একভাই ও দুইবোনকে স্বাধীনতার আগেই ভারতে বিয়ে দেন। বিয়ের পর তাদের মধ্যে আজও পর্যন্ত দেখা হয়নি। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তারা দুইজন ছাড়া আত্মীয়-স্বজন সবার বসবাস ভারতে। এখানে নিকট আত্মীয় বলতে কেউ নেই। বয়সের ভারে পারকিনসন্সেও আক্রান্ত আকাশ দাসের একাকিত্বতই বেশি পছন্দ বলে জানান তিনি।

প্রায় সাড়ে ৬ বিঘার জমির উপর ছোট্ট চার চালা ঘরে দুই ভাইবোনের বসবাস। ঘরটিও দুই শত বছরের পুরনো। আরেকটি ছোট দু’চালা ঘরে চলে ভাই-বোনের রান্নাসহ আনুসাঙ্গিক কাজ। পাশে দুইটি গোয়াল ঘরও রয়েছে। বসতভিটায় সাড়ে ৬ বিঘার সম্পত্তির পাশাপাশি মাঠে অর্ধ শতাধিক বিঘা জমি থাকলেও খুব অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন তারা। সম্পত্তি নিয়ে তার কোনও চিন্তা নেই।

সাদামাটা জীবনযাপন নিয়ে তারা জানান, পৃথিবীতে এসেছেন একা, যাবেন একা। তারা সম্পত্তি নিয়ে জন্ম নেননি, সম্পত্তি নিয়েও যাবেন না। তাই ভাবনা নেই সম্পদ নিয়ে। ঝড়-বৃষ্টির মাঝেও দুই ভাই-বোনের চিন্তাহীন জীবন। অসুখ-বিসুখ নিয়েও তাদের নেই কোনো ভাবনা।

কুমার জীবন নিয়ে আকাশ দাস জানান, বিয়ে দেয়ার মতো দায়িত্বশীল অভিভাবকের অভাবে আজও কুমার তিনি। বোনকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু ঝর্ণা দাসও রাজি না হওয়ায় তাকেও আর বিয়ে দেয়া হয়নি বলে জানান।

এখন নিরিবিলি জীবন কাটাতেই বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তারা। একাকিত্বই তাদের ভালো লাগে। বোন ঝর্ণা দাস বেশিরভাগ সময় কাটান বই পড়ে। ভাই আকাশ কলি দাস বইয়ের পাশাপাশি পশু-পাখি ও প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান। তার একাকিত্বের কিছু সময় লাঘব করেন পশু-পাখি ও প্রকৃতির সাথে।

তিনি বলেন, পাখিরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। ফসল উৎপাদনেও অবদান রাখে। কিন্তু মানুষ এই পাখিগুলোকে নির্বিচারে হত্যা করছে। শিক্ষিত ও ধনীরা পাখিগুলোর কিনে খান বলেই অনেকে পাখি শিকার করতে উৎসাহী হন। আমাদের দেশে যত পাখি আসে সব পাখি ফিরে যায় না। তাদেরকে হত্যা করা না হলে আমাদের দেশেও সারা বছরই এমন পাখিদের বসবাস থাকতো।

একসময় গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করলেও নিজেকে দাবি করেন স্বল্পশিক্ষিত আকাশ দাস। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন অনেক আগেই। সামাজিকতায় সম্পৃক্ত থাকলেও এখন আর সেভাবে যান না।

আকাশ দাসের ব্যতিক্রমী জীবযাপন নিয়ে বেড়া উপজেলার কৈটোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহসিন উদ্দিন পিপল বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত দানশীল ও আদর্শিক মানুষ। উনার দানে অনেক ছেলে-মেয়ে শিক্ষিত হয়েছেন। উনাকে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হয় এবং ভবিষ্যতেও দেয়া হবে। দেশের প্রতি ভালোবাসায় তিনি পরিবারের সঙ্গে ভারতে যাননি। সব ধরণের পাখির প্রতি তার ভালোবাসা রয়েছে।’

পাবনার বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহা. সবুর আলী বলেন, ‘আমি তার বিষয়ে কিছু জানি না। আপনাদের কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। আমি অবশ্যই তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেব।’