রাশিয়া কি পিছু হটছে?

22

৬ মাসের বেশি সময় ধরে চলছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। সম্প্রতি খারকিভে পাল্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছে ইউক্রেনের সেনারা। ইউক্রেনের দাবি, ক্রেমলিনের সেনারা পিছু হটছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ইউক্রেন। দেশটির উত্তর-পূর্বে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বেড়াজালকে ভেঙে ফেলেছে তারা।

১১ সেপ্টেম্বর সকালে ইউক্রেনের সামরিক প্রধান ভ্যালেরি জালুঝনি ঘোষণা করেন যে দেশটির সেনা বাহিনী ১১ দিনে তিন হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে। এই এলাকা গত এপ্রিল থেকে রাশিয়া দখল করে রেখেছিল। অন্য একটি পরিসংখ্যান বলছে, ৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে ইউক্রেন, যেটি প্রায় সাইপ্রাসের আয়তনের সমান।

রাশিয়ার সেনারা আতঙ্কিত এবং পিছু হটছে। একই সঙ্গে ব্যাপক হারে সামরিক সরঞ্জাম পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, এমন খবর ছড়িয়েছে সম্প্রতি। দুটি লজিস্টিক্যাল হাব, ইজিয়াম ও কুপিয়ানস্ক পুনরুদ্ধারের ফলে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় সমগ্র ডনবাসের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য রাশিয়ার মহাপরিকল্পনা নস্যাৎ হয়েছে। এটি ইউক্রেনের সেভেরোডোনেটস্কের মতো শহর পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত করছে। যেখানে কয়েক মাস ধরে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পরে রাশিয়ার হাত থেকে একটি অংশ চলে যায় ইউক্রেনের দখলে।

রাশিয়ার রসনা ইউনিটের বিচ্যুতি, যাকে ক্রেমলিন অপ্রত্যাশিতভাবে ‘পুনরায় দলবদ্ধকরণ’ বলে অভিহিত করেছে। তারা বলছে, যে সাত মাস পুরোনো যুদ্ধ সম্ভবত একটি টার্নিং পয়েন্টে পৌঁছেছে।

খারকিভ অঞ্চলে পাল্টা আক্রমণ নিশ্চয়ই রাশিয়ান হাইকমান্ডকে আশ্চর্য করেছিল। বালাকলিয়া শহর ঘেরাও পর দুই দিনের তীব্র আর্টিলারি ফায়ার ব্যবহার করে ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয় আসল অভিযান। পরে তিন দিনের মধ্যে ইউনিটগুলো পূর্ব দিকে কুপিয়ানস্ক, একটি বড় রেল জংশন ও রাস্তা দখলে নেয়, যেগুলো দিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর সামরিক সরঞ্জামাদি নেওয়া হতো।

১০ সেপ্টেম্বর ইজিয়াম যেটি কাছাকাছি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বেশিরভাগ রুশ সেনা পূর্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরে সেটি ঘেরাও করা হয়। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, এরই মধ্যে ইজিয়াম শহরটি পরিত্যক্ত করা হয়েছে। শুধু সেখানকার শহর থেকে নয়, অঞ্চল থেকেও সাধারণ রাশিয়ানরা পিছু হটছে বলে দাবি ইউক্রেনের।

১১ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত ছিল দু’পক্ষের মধ্যে। কিন্তু সেদিনের পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্বারা প্রকাশিত একটি মানচিত্র থেকে বোঝা যায় যে রুশ বাহিনী কার্যত খারকিভ প্রদেশের সম্পূর্ণ অংশ থেকে অসকিল নদীর ধারে একটি নতুন প্রতিরক্ষা লাইনে চলে গেছে। ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলো এখনো পূর্ব দিকে অগ্রসর হলে এই নতুন লাইনটি কতক্ষণ স্থায়ী হতে পারে তা স্পষ্ট নয়।

ইউক্রেনের গোপন পাল্টা আক্রমণে রাশিয়ান বিমানের অবাধ চলাচল চিহ্নিত হতে পারে। একটি সামরিক সূত্র বলছে, আমেরিকার সরবরাহ করা নতুন অ্যান্টি-রাডার ক্ষেপণাস্ত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিমান প্রতিরক্ষা অস্ত্রের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে।

এদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তারা নিজেরাই ইজিয়াম ও কুপিয়ানস্ক থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। দোনেৎস্কে লড়াইরত বাহিনীর শক্তি বাড়াতে বালাকলিয়া শহর থেকে সেখানে সেনা সরিয়ে নেওয়ার কথাও নিশ্চিত করে তারা। শুক্রবার বালাকলিয়া শহরে ১৫টি ট্যাঙ্ক নিয়ে প্রবেশ করে ইউক্রেনীয় বাহিনী।

প্রকৃতপক্ষে, এটি ইউক্রেনের এমন একটি কৌশল ছিল যে মনে হয়েছিল আক্রমণটি বিভ্রান্তিকর, যার উদ্দেশ্য ছিল শুধু রাশিয়ান বাহিনীকে প্রতিরোধ করা এবং খেরসন অঞ্চলে পাল্টা আক্রমণের বিরুদ্ধে রুশ সেনা মোতায়েন বিরত রাখা।

একপর্যায়ে, ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলো দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনিশ্চিত ছিলেন যে তারা কতদূর পৌঁছেছে। ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চলের গভর্নর সের্হি হাইদাই বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে ইউক্রেনীয় সেনারা ডোনেট নদী পেরিয়ে লুহানস্ক অঞ্চলের উত্তরাঞ্চলের স্যাতোভ, রুবিঝনে, লিসিচানস্ক এবং সেভেরোডোনেটস্ক শহরে চলে যাওয়ার আগে এটি কেবল ‘সময়ের ব্যাপার’ হবে। যা রাশিয়া জুলাইয়ের শুরুতে সম্পূর্ণরূপে দখল করার গর্ব করেছিল।

তিনি বলেন, রাশিয়ান সেনারা এরই মধ্যে পিছু হটছে। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। তবে ইউক্রেনের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো ক্ষতি এড়াতে হিসেব কষে নিতে হবে।

ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের এক সাবেক অপারেশনাল অফিসার ওলেহ ঝদানভ বলেন, ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্ব ধীর গতিতে হামলা চালানোর চেষ্টা করবে। ‘আমাদের পেছনে সমর্থন লাইন একত্রিত করতে হবে। খুব দ্রুত যাওয়া বিপজ্জনক’।

ইউক্রেন এখন অন্য কোথাও আঘাত হানার জন্য রাশিয়ার অস্থিরতাকে কাজে লাগাতে পারে কিনা তা নিয়ে কিছু জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। হয় খেরসনে পাল্টা আক্রমণ জোরদার করতে পারে, যদিও ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, অথবা অন্য কোথাও আক্রমণের তৃতীয় পথ খোলার মাধ্যমে।

ইউক্রেনের তৃতীয় সম্পূর্ণরূপে গঠিত সেনা ইউনিট প্রস্তুত আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনার করার জন্য শুরুতে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমারা পর্যাপ্ত সরঞ্জাম দিয়েছে কিনা তা এখন খোলামেলা প্রশ্ন।

রাশিয়া কি পিছু হটছে?

কেউ কেউ অনুমান করছেন যে ইউক্রেন জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধফ্রন্ট খুলতে পারে। কিছু ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা শেষ পর্যন্ত খেরসন আক্রমণের জন্য আগে চাপ দিয়েছিলেন।

যুদ্ধপন্থী রাশিয়ান সামরিক ব্লগাররা রাশিয়ার অপমানে ক্ষুব্ধ। তারা রাশিয়ার জেনারেলদের দোষ দিচ্ছে এমন পরিস্থিতির জন্য। প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং পুতিন নিজেও দায়ী এতে বলছেন তারা। কারণ ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনীর পিছু হটার হওয়ার পরেও নিশ্চুপ রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ইগর গিরকিন, একজন অতি-জাতীয়তাবাদী যিনি ২০১৪ সালে ডনবাসে রাশিয়ার আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, রাশিয়ান সেনাদের সম্পূর্ণ পরাজয়ের পূর্বাভাস দিয়েছেন।

‘আমরা ইতিমধ্যে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছি, বাকিটা সময়ের ব্যাপার’। তিনি টেলিগ্রামে তার প্রায় অর্ধ মিলিয়ন গ্রাহককে এমনটি বলেছিলেন। রাশিয়ান সামরিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এটি।

সিএনএ, একটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের একজন বিশেষজ্ঞ মাইকেল কফম্যান উল্লেখ করেছেন যে ‘রাশিয়ান বাহিনীর গুণমান হ্রাস পাচ্ছে এবং যারা যুদ্ধে রয়েছে তাদের ক্লান্তি এড়াতে প্রায়শই ঘোরানো হচ্ছে না। তাদের এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার মতো জনবল নেই’।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে উদাসীন বলে মনে হচ্ছে। ১০ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনীয়রা ইজিয়ামে যাওয়ার পথে লড়াই করার সময়, তিনি মস্কোতে স্তালিন-যুগের থিম পার্ক এ একটি গ্র্যান্ড ফেরিস হুইল খোলার পরিকল্পনা চালিয়ে যান। ফেরিস হুইলটি ছিল ইউরোপে সবচেয়ে বড়, পুতিন বলেন, পারিবারিক অবসরের জন্য উপযুক্ত জায়গা।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসার আশা মস্কো কখনও পরিত্যাগ করেনি। তবে রাশিয়া বিশ্বাস করে আলোচনায় বসতে যত দেরি হবে তা থেকে সুফল পাওয়া তত বেশি দুরূহ হয়ে পড়বে। রাশিয়ার একটি নিউজ চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

আপাতত, ইউক্রেনের নেতারা বিশ্বাস করেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে আলোচনা সর্বোত্তমভাবে পরিচালিত হয়। তবে ১০ সেপ্টেম্বর ইয়াল্টা ইউরোপীয়ান নিরাপত্তা ফোরামে এক বক্তব্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বিরক্ত প্রকাশ করেন যে ‘কিছু পশ্চিমা নেতা আমাদের অতিরিক্ত আলিঙ্গনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন’। তিনি আরও বলেন, না, আমরা নিজেদেরকে বিরত রাখতে পারি না’।

সূত্র: দ্যা ইকোনমিস্ট