সাদিয়ার ড্রেনে মৃত্যু কর্তৃপক্ষের অবহেলায়: হাইকোর্টে প্রতিবেদন

42

চট্টগ্রামে ড্রেনে পড়ে মারা গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়া। তার মর্মান্তিক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল বলে জেলা প্রশাসকের দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টিও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চে সম্প্রতি প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনের অনুলিপি  হাতে এসেছে।

প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে, সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কেউই দায় স্বীকার করেনি। উভয় কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে যে, ওই মেয়ে অসাবধানতাবশত গার্ডারের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পা পিছলে নালায় পড়ে মারা যান। পাশাপাশি এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে।

ঘটনাস্থলে নালার অবস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্ঘটনাস্থলে নালা সংলগ্ন রাস্তায় ইতোপূর্বে সিটি করপোরেশন কর্তৃক নির্মিত ডাস্টবিন ও দেওয়াল ছিল। তা নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছিল। কিন্তু লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ’ প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ডাস্টবিন ভেঙে ফেলা হয় এবং রাস্তা ও ফুটপাত সংস্কার করা হয়।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সেখানে রাস্তার পাশে ফুটপাতের কাজ করা হলেও রাস্তা সংলগ্ন নালার উপরের অংশে ফুটপাতের কাজ করা হয়নি এবং কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়নি। ফুটপাত হয়ে হাঁটার জায়গায় শুধুমাত্র নালার উপরের অংশে কোনো স্ল্যাব বসানো বা কোনো সংস্কার কাজ না করার কারণে আনুমানিক ১১ ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট প্রস্থ আয়তনের জায়গা অনেকটা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, যা নালায় পরে যাওয়ার দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

এক্ষেত্রে ফুটপাত হয়ে কেউ সোজা হেঁটে এসে নালার অংশ খেয়াল না করলে বা অন্ধকারে ফুটপাত ধরে হাঁটলে সহজেই নালায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ডাস্টবিন ভেঙে ফেলার কারণে নালার সামনে শুধুমাত্র পূর্বে স্থিত দুই ফুট উচ্চতা ও এক ফুট প্রশস্থতা বিশিষ্ট হুইল গার্ড ব্যারিয়ারটি সুরক্ষা ও ফুটপাতের দুই অংশের সংযোগ হিসেবে সেটা করছিল, কিন্তু ফুটপাত হয়ে চলার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট ছিল না।

ফুটপাত হয়ে হাঁটার সময় নালার সামনাসামনি এসে ফুটপাত থেকে রাস্তায় নেমে হেঁটে যেতে হতো অথবা এক ফুট প্রশস্থ হুইল গার্ড ব্যারিয়ারের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হতো যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। হুইল গার্ড ব্যারিয়ারের উপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে ওই মেয়ে পা পিছলে নালায় পড়ে যান মর্মে জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট নালাটি আনুমানিক ১১ ফিট চওড়া এবং ১০ ফিট গভীর। এটি সড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এবং এ নালার প্রান্তে রাস্তা সংশ্লিষ্ট জায়গায় বক্স কালভার্ট থাকায় এখানে দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল এবং নালা সংলগ্ন জায়গা উঁচু দেয়ালের মাধ্যমে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জন্য প্রয়োজন ছিল।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এ ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও নালার অবস্থান ও পানি প্রবাহ বিবেচনা করে ঘটনাস্থলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। যেহেতু আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ের কাছে অবস্থিত হওয়ায় শেখ মুজিব রোডের ফুটপাত দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করে এবং রাস্তা সংলগ্ন নালাটি রাস্তার নিচ দিয়ে বক্স কালভার্টে মিলিত হয়েছে, তাই যে কেউ যাতে সহজে নালায় পড়ে বক্স কালভার্টে যেতে না পারে সেজন্য পূর্বের ডাস্টবিন ভেঙে ফেলার সময় নালাটিকে সুরক্ষিত করা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল মর্মে প্রতীয়মান হয়।

এ ছাড়া, নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে বর্ণিত স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। সর্বোপরি, নালার অবস্থান, প্রবাহ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ফুটপাত সংস্কারের সময় নালার উপরের অংশ সংস্কার করে অথবা নালাটির সামনের অংশ সুরক্ষিত করে দুর্ঘটনাটি এড়ানো সম্ভব ছিল।

প্রতিবেদনের বিষয়ে রিটের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসকের পাঠানো প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি আদালত নথিভুক্ত করেছেন। আদালত এ বিষয়ে পরে আদেশ দেবেন।

চট্টগ্রামে ড্রেনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি কোনো উন্নয়নমূলক কাজ চলাকালীন পথচারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়। একইসঙ্গে যেখানে সাদিয়া মারা গেছেন, সেখানকার প্রকৃত অবস্থা কেমন, কর্তৃপক্ষের অবহেলা ছিল কি না, এ বিষয়ে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক তার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার তানভীর হাসান চৌধুরীকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

এর আগে, সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে ২৫ নভেম্বর হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও সিসিবি ফাউন্ডেশনের পক্ষে ব্যারিস্টার অনীক আর হক এ রিট দায়ের করেন।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ‘চট্টগ্রামে নালায় পড়ে মৃত্যু : দায় কার?’ এই শিরোনামে একটি নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সবজি ব্যবসায়ী সালেহ আহমদের পর চট্টগ্রাম নগরীতে নালায় পড়ে সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার মৃত্যুতেও দায় নিতে চাইছে না সিটি করপোরেশন কিংবা সিডিএ (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)।

সরকারি দুটি সংস্থাই একে অন্যকে দোষ দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বলছে, দুদিকে ফুটপাত করলেও খালের মুখটি অরক্ষিত রেখেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তাই এর দায় তাদের।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, খালের মালিকানা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। তাই খালের মুখে সুরক্ষা নিশ্চিতের দায়িত্বও তাদের।

নালা-খালে একের পর এক মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ নগরবাসী। তারা বলছেন, দায় এড়ানোর এ প্রবণতা প্রমাণ করে সেবা সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তে নগরবাসীর ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট মুরাদপুর এলাকায় খালে পড়ে তলিয়ে যান সালেহ আহমদ। তার খোঁজ আর মেলেনি। তার আগে ওই বছরের ৩০ জুন ষোলশহর চশমা হিল এলাকাতেও এমন দুর্ঘটনায় মারা যান দুজন। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদে নবী টাওয়ারের কাছাকাছি নাছিরছড়া খালে পড়ে তলিয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাদিয়া। পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় কয়েক টন আবর্জনার স্তূপ সরিয়ে ১৯ বছর বয়সী সাদিয়ার লাশ উদ্ধার হয়।