‘আশুলিয়া ও নড়াইলের ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে অশনি সংকেত’

52

সাভারে শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা এবং নড়াইলে এক কলেজ অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তার ঘটনাকে শিক্ষাঙ্গনের জন্য ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।

বুধবার এক বিবৃতিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই মোর্চা শিক্ষকদের ওপর এ ধরনের আক্রমণ বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের বিচার দাবি করেছে।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮১ জন শিক্ষকের স্বাক্ষর রয়েছে সেখানে।

শনিবার দুপুরের দিকে সাভারের হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্র। তাকে স্টাম্প বেধড়ক পেটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে তিনি মারা যান।

অপরদিকে গত ১৮ জুন নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন ‍কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে তাকে হেনস্থা করে কলেজের ছাত্র ও স্থানীয়রা।

বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সমালোচনায় থাকা ভারতের বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে ফেইসবুকে এক ছাত্রের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নড়াইলেনর ওই ঘটনার সূত্রপাত হয়।

এসব ঘটনাকে ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে বর্ণনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, “পদ্মা সেতু উদ্বোধন-উৎসবের ডামাডোলে ঢাকা পড়ে গেছে অন্তত দুটি ঘটনা। এই দুটি ঘটনায় শিক্ষক হিসেবে আমরা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।


“শিক্ষকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনও উচ্ছৃঙ্খল জনতার বা কখনও বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের হাতে আক্রান্ত ও অপমানিত হচ্ছেন, মৃত্যুবরণ করছেন। শিক্ষকদের যে সম্মান এই সমাজ দিত একসময়, আজকাল তা তো উপেক্ষিতই, সঙ্গে জুটছে সহিংসতা এমনকি মৃত্যুও।”

বর্তমান সমাজ-রাষ্ট্র বাস্তবতায় শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, “শিক্ষা ব্যবস্থাকে যেনতেন রকমে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তা দিয়ে কেরানি-আমলা হবে; কিন্তু শিক্ষার যে মূল লক্ষ্য, জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধের লালন, সেসবের অস্তিত্ব যেন নেই সেখানে। শিক্ষকদের প্রাপ্য মূল্য-মর্যাদা দিচ্ছে না আজকের সমাজ।”

হিন্দু শিক্ষকদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধের দাবি জানিয়ে নেটওয়ার্ক বলছে, “লক্ষণীয় বিষয় হল, আক্রান্ত শিক্ষকরা হিন্দু সম্প্রদায়ের। অন্তত প্রথম ঘটনাটিকে আক্রমণকারী ‘সংখ্যাগরিষ্ঠরা’ দেখেছে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে।”

মুন্সীগঞ্জের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়, “এ বছরের এপ্রিল মাসে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের ক্লাসের আলোচনাকে গোপনে ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছিল তারই ছাত্র। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি ইসলাম অবমাননা করেছেন। ফলে ওই শিক্ষককে কারাবাস করতে হয়।”

২০১৬ সালে একটি ঘটনা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, “নারায়ণগঞ্জে সেসসময় এক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সবার সামনে কান ধরে উঠ-বস করান স্থানীয় সংসদ সদস্য। স্পষ্টভাবে বলা ভালো, সারা দেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অনুভূতি নিয়ে কতিপয় গোষ্ঠীর অসহিষ্ণুতা বিস্তারের অপচেষ্টা ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছে।

“এর মাধ্যমে ক্লাসরুম থেকে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। অল্পতেই তাদের অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু অনুভূতি যতই নাজুক হোক, তার প্রতিক্রিয়া খুবই আগ্রাসী।”


‘সংখ্যাগুরুর দাপটে’ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে না মন্তব্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, “তারা যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। দেশের সংবিধান-আইন-কানুনে যাই লেখা থাক, প্রশাসন ও রাজনীতিবিদরা ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের’ পক্ষেই কাজ করে চলেছে।”