ঈদের আমেজে ব্রিটেনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত বারায় নির্বাচনী হাওয়া

3

ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে রোজা শেষে ঈদের আমেজ বিরাজ করলেও বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় মেয়র ও কাউন্সিল নির্বাচনের প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। এ বারা থেকেই ২০১০ সালে ব্রিটেনের বাংলাদেশিরা তাদের প্রথম নির্বাহী মেয়র পান। ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশিরা ছড়িয়ে থাকলেও পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করে। আর তাই এই এলাকার মেয়র ও কাউন্সিল নির্বাচন নিয়ে এখানকার বাংলাদেশিদের মধ্যে আগ্রহ বেশি।

বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসে কাউন্সিল ও নির্বাহী মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ আবার সরগরম হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দলের বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কাউন্সিলার প্রার্থী এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। কে হবেন টাওয়ার হ্যামলেটসের নতুন নির্বাহী মেয়র এ নিয়ে চলছে চারিদিকে ব্যাপক আলোচনা।

ত্রিমুখী লড়াইয়ে জন বিগস, লুৎফর রহমান নাকি রাবিনা খান মেয়র হচ্ছেন তা জানা যাবে আগামী ৫ মের নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পরে। তবে এবার টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র পদে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন বর্তমান মেয়র লেবার দলীয় জন বিগস, সাবেক মেয়র আসপায়ার পার্টির প্রার্থী লুৎফর রহমান, বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (লিবডেম) থেকে লড়ছেন সাবেক মেয়র প্রার্থী কাউন্সিলার রাবিনা খান। এছাড়া কনজারভেটিভ থেকে এলিয়েট ওয়েভার্স, স্বতন্ত্র অ্যান্ড্রু উড, পামেলা এ্যান হোমস, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট ও সোশালিস্ট কোয়ালিশনের প্রার্থী হয়েছেন হোগো পিয়ার।

প্রধান তিন মেয়র প্রতিদ্বন্দ্বী ও তাদের কাউন্সিলর প্রার্থীরা অধিকাংশ বাংলাদেশি ও মুসলমান হওয়ায় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ইফতার পার্টিতে অংশ নিচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে। তারা রোজার মধ্যেই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে লিফলেট নিয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি পৌঁছে দিচ্ছেন। রোজা শেষে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ঈদের আমেজ বিরাজ করলেও টাওয়ার হ্যামলেটসে নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে।

টাওয়ার হ্যামলেটসের ২০টি ওয়ার্ডে ৪৫টি কাউন্সিলর পদে দুই শতাধিক প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। এরমধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশি। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন নির্বাচনে। লুৎফুর রহমানের আসপায়ার পার্টির সব কাউন্সিলর প্রার্থীই বাংলাদেশি এবং লেবার পার্টির অধিকাংশ প্রার্থীও বাংলাদেশি।

সিলেটের বালাগঞ্জের সিকান্দরপুরে জন্ম নেওয়া লুৎফুর রহমান লেবার দলে ছিলেন। ২০১০ সালে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে বিরোধের জেরে তিনি লেবার দল থেকে বহিষ্কৃত হন। ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে তিনি লেবার দলের প্রার্থীকে পরাজিত করে ওই বারার প্রথম বাংলাদেশি মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট দলের ব্যানারে নির্বাচন করে আবারো বিজয়ী হন। ওই নির্বাচনে টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট দলের প্রচার-প্রচারণা নিয়ে নানা বিতর্ক ওঠে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার, বর্ণবাদ, পোস্টাল ভোটে জালিয়াতি, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আর্থিক প্রভাবের অভিযোগ এনে নির্বাচন বাতিল চেয়ে আদালতে পিটিশন দাখিল করেন সেখানকার চারজন বাসিন্দা।

২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওই পিটিশনের শুনানি শুরু হয়। উভয় পক্ষের অর্ধ শতাধিক সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। পরে ব্রিটেনের নির্বাচন সংক্রান্ত আদালত ওসব অভিযোগ নাকচ করে দেয়। ফৌজদারি অভিযোগগুলোও পরে পুলিশি তদন্তে ভিত্তিহীন হিসেবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ততদিনে লুৎফুর রহমানের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।

সাবেক মেয়র লুৎফর রহমান আদালত কর্তৃক নির্বাচনের জন্য নিষিদ্ধ থাকায় গত নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। যদিও লুৎফর সমর্থিত টাওয়ার হ্যামলেটস ফার্স্ট নামে একটি পার্টি থেকে নির্বাচন করেন কাউন্সিলর রাবিনা খান। কিন্তু জনগণের কাছে লুৎফরের গ্রহণযোগ্যতা রাবিনার চেয়ে বেশি। তাই অনেকটা ফাঁকা মাঠেই গোল দিয়েছেন লেবার সমর্থিত জন বিগস।

কিন্তু এবারের নির্বাচনে নিজের গড়া এস্পেয়ার পার্টি থেকে লুৎফর রহমান ও লিবডেম থেকে রাবিনা খান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় লেবারের দুর্গ ভেঙে যেতে পারে। আবার লুৎফর রহমান ও রাবিনা খান দুজনই বাংলাদেশি প্রার্থী হওয়ায় বারার ৩৭ শতাংশ বাংলাদেশিদের ভোট ভাগাভাগি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে লেবারের ওপর ক্ষুব্ধ ভোটাররা লুৎফর ও রাবিনাকে পছন্দ করতে পারেন। এই হিসেবে সাবেক মেয়র লুৎফর রহমান ও তার সমর্থকরা জয়ের জন্য আশাবাদী। তবে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য সবাইকে ৫ মের নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

ব্রিটেনের নির্বাচনে প্রতিটি ভোটারের তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প থাকে। অর্থাৎ কোনো ভোটার দুজন প্রার্থীকে পছন্দ করলে সে একজনকে প্রথম পছন্দের এবং অপরজনকে দ্বিতীয় পছন্দের তালিকায় রাখাতে পারেন। নির্বাচনের ব্যালেট পেপারে সে সুযোগ রয়েছে। তাই কোনো প্রার্থী ৫১ শতাংশ ভোট না পেলে সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় পছন্দের ভোটারের সংখ্যা গণনা করা হবে। টাওয়ার হ্যামলেটসের বিগত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, দ্বিতীয় পছন্দের বেশিরভাগ সাদা (কনজারভেটিভ, লিবডেম ও গ্রিন পার্টির) ভোটাররা লেবার পার্টিকে পছন্দ করে। তাই টাওয়ার হ্যামলেটসের ৫ মের নির্বাচনে কে মেয়র হবেন আর কারা কারা কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ফলাফল ঘোষণার দিনের জন্য।